নিলুফা আক্তার: বাংলাদেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠান এখন একদিকে আনন্দের প্রতীক, অন্যদিকে অনেক তরুণের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি। কালো গাউন পরে ডিগ্রি হাতে হাসিমুখে ছবি তোলা হাজারো শিক্ষার্থীর চোখে থাকে স্বপ্নÑএকটি ভালো চাকরি, আর্থিক নিরাপত্তা এবং পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার আশা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট পেরোনোর কিছুদিন পরই বাস্তবতা অনেকের জন্য হয়ে ওঠে কঠিন। মাসের পর মাস, কখনও বছরের পর বছর চাকরির খোঁজে ঘুরেও কাক্সিক্ষত কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না অসংখ্য তরুণ।
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তার গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণও বেড়েছে। আগে যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ সীমিত ছিল, এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কিন্তু একইসঙ্গে বেড়েছে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও।
অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদদের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা বড় ধরনের কাঠামোগত সংকটের মধ্যে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিবছর হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েট তৈরি করলেও শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারছে না। ফলে ডিগ্রি থাকলেও চাকরি মিলছে না অনেকের।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, দেশের মোট বেকার জনগোষ্ঠীর বড় অংশই তরুণ। তাদের অনেকেই স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি সামাজিক ও মানসিক সংকটও তৈরি করছে।
ঢাকার একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক শেষ করা এক তরুণ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনজুড়ে তিনি ভেবেছিলেন ডিগ্রি শেষ করলেই চাকরি পাওয়া সহজ হবে। কিন্তু বাস্তবে চাকরির বাজারে এসে দেখেছেন, শুধু সনদ যথেষ্ট নয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেও তিনি কাক্সিক্ষত চাকরি পাচ্ছেন না। অনেক জায়গায় অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়, আবার কোথাও প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাব দেখানো হয়।
শুধু সরকারি চাকরির প্রস্তুতিই এখন অনেক তরুণের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ বেসরকারি খাতে অনিশ্চয়তা এবং সীমিত সুযোগের কারণে অধিকাংশ শিক্ষার্থী সরকারি চাকরিকে নিরাপদ ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখছে। ফলে লাখ লাখ তরুণ বছরের পর বছর বিসিএস কিংবা অন্যান্য নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সময় পার করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা দেশের অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগজনক। কারণ উৎপাদনশীল বয়সের তরুণদের বড় একটি অংশ কর্মজীবনে প্রবেশ করতে দেরি করছে। এতে ব্যক্তিগত হতাশার পাশাপাশি জাতীয় উৎপাদনশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার একটি বড় সমালোচনা হলো এটি এখনও অনেকাংশে তাত্ত্বিক। শ্রেণিকক্ষে মুখস্থভিত্তিক শিক্ষা ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়নের কারণে শিক্ষার্থীরা বাস্তব দক্ষতা অর্জনের সুযোগ কম পাচ্ছে। অথচ বর্তমান চাকরির বাজারে যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধান, প্রযুক্তি জ্ঞান, দলগত কাজ এবং সৃজনশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক নিয়োগদাতা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা অনেক শিক্ষার্থীর মৌলিক দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে ইংরেজিতে যোগাযোগ, উপস্থাপনা দক্ষতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে দুর্বলতা দেখা যায়। ফলে আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতায় তারা পিছিয়ে পড়ছে।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে বিশ্বব্যাপী চাকরির ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, সাইবার নিরাপত্তা, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট এবং ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মতো খাতে দক্ষ জনবলের চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম এখনও পুরোনো কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এখন দ্রুত শিল্প খাতের চাহিদার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। কোন খাতে ভবিষ্যতে চাকরির সুযোগ বাড়বে, সে অনুযায়ী কোর্স ও প্রশিক্ষণ চালু করা জরুরি।
কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার অভাবও বড় সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশে এখনও সাধারণ ডিগ্রির প্রতি সামাজিক আকর্ষণ বেশি। ফলে অনেক শিক্ষার্থী বাস্তব দক্ষতা অর্জনের পরিবর্তে শুধু সনদ অর্জনের দিকে ঝুঁকছে।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণার দুর্বলতাও কর্মসংস্থানের সংকটের সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ গবেষণা ও উদ্ভাবনভিত্তিক শিক্ষা নতুন শিল্প, নতুন প্রযুক্তি এবং নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি করতে সাহায্য করে। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা সংস্কৃতি এখনও সীমিত।
শিক্ষাবিদদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু চাকরিপ্রার্থী তৈরি করলে চলবে না; বরং উদ্যোক্তা তৈরির দিকেও জোর দিতে হবে। তরুণদের মধ্যে উদ্ভাবনী চিন্তা, স্টার্টআপ সংস্কৃতি এবং আত্মকর্মসংস্থানের মানসিকতা তৈরি করা প্রয়োজন।
তবে বাস্তবতা হলো, অনেক তরুণ উদ্যোক্তা হতে চাইলেও প্রয়োজনীয় সহায়তা পান না। সহজ ঋণ, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং ব্যবসায়িক পরামর্শের অভাবে অনেক উদ্যোগ শুরু হওয়ার আগেই থেমে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং ব্যবস্থাও দুর্বল। অধিকাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ না করা পর্যন্ত বুঝতে পারেন না কোন খাতে তাদের দক্ষতা বেশি কিংবা কীভাবে চাকরির বাজারে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর ক্যারিয়ার সেন্টার থাকা জরুরি। সেখানে শিক্ষার্থীদের চাকরির প্রস্তুতি, সিভি তৈরি, ইন্টারভিউ দক্ষতা এবং ইন্টার্নশিপের সুযোগ সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেওয়া উচিত।
বাংলাদেশে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগও এখনও দুর্বল। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাত একসঙ্গে কাজ করে। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সময়ই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পায়। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক শিক্ষার্থী বাস্তব কর্মপরিবেশ সম্পর্কে ধারণা ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করছে। ফলে চাকরির বাজারে এসে তারা হঠাৎ করেই বড় প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হচ্ছে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘদিন বেকার থাকার কারণে অনেক তরুণ মানসিক চাপ, হতাশা এবং আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভুগছেন। পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশাও তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। অনেক তরুণ নিজেদের ব্যর্থ মনে করতে শুরু করেন, যা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
অভিভাবকদের একটি বড় অংশও এখন উদ্বিগ্ন। সন্তানদের উচ্চশিক্ষার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও কাক্সিক্ষত ফল না পাওয়ায় তারা হতাশ হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট সমাধানে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, রাষ্ট্র, শিল্প খাত এবং সমাজÑসবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থাকে শ্রমবাজারের সঙ্গে সমন্বিত করতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা বাড়াতে হবে। গবেষণা, উদ্ভাবন এবং উদ্যোক্তা তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
একইসঙ্গে তরুণদের মানসিকতা পরিবর্তনের কথাও বলছেন বিশেষজ্ঞরা। শুধু সরকারি চাকরির পেছনে না ছুটে নতুন খাত, ফ্রিল্যান্সিং, প্রযুক্তি এবং উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
বাংলাদেশ এখন জনসংখ্যাগত সুবিধার একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে রয়েছে। দেশের বড় একটি অংশ তরুণ। এই তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা গেলে অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা ও দক্ষতা উন্নয়ন ছাড়া এ সম্ভাবনাই বড় সংকটে পরিণত হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া প্রতিটি তরুণের হাতে শুধু একটি সনদ নয়, বরং বাস্তব দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ গড়ার সক্ষমতা তুলে দেওয়াই এখন বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
