স্বরূপ ভট্টাচার্য, চট্টগ্রাম : ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন পরীক্ষায় অংশ না নেয়া এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে চাকরিচ্যুতির ঘটনায় ব্যাংকটির কর্মীদের কর্মবিরতি ও সড়ক অবরোধের আন্দোলন চলছে। এর মধ্যে দফায় দফায় ব্যাংকটির ফেসবুক পেজ হ্যাকের ঘটনা ঘটছে।
গতকাল শনিবার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন ইসলামী ব্যাংকের ‘বিশেষ যোগ্যতা মূল্যায়ন’ পরীক্ষার তালিকায় থাকা কর্মকর্তারা। মহসড়কের সীতাকুণ্ড উপজেলার ফৌজদারহাট এলাকায় ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিক্ষোভ কর্মসূচির কারণে ওই এলাকায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশের তৎপরতায় দুপুর ১টার পর মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
শনিবার ১১টার দিকে ফৌজদারহাট এলাকায় ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের একপাশে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তারা। প্রায় ৪৫ মিনিট পর পৌনে ১২টার দিকে তারা সড়কে বসে অবরোধ শুরু করেন। দুপুর প্রায় ১টা পর্যন্ত সড়কে অবস্থান করেন বিক্ষোভকারীরা।
অবরোধকারীরা অভিযোগ করেন, ইসলামী ব্যাংকের চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রায় ৪০০ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এছাড়া ৪-৫ হাজার কর্মকর্তাকে ওএসডি করে কর্মস্থলে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান। এছাড়া দ্রুত এসব কর্মকর্তাদের পুনর্বহাল এবং ন্যায্য সমাধানের জানান আন্দোলনকারীরা।
এর আগে শুক্রবার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তারা আজ রোববার থেকে টানা কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছিলেন। পাঁচ দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা এ কর্মবিরতি চালিয়ে যাবেন।
এদিকে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির অফিসিয়াল পেজ দ্বিতীয় দফায় ফের হ্যাকড হয়েছে। ১০ ঘণ্টা হ্যাকার গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকার পর শুক্রবার বিকালে ইসলামী ব্যাংকের আইটি টিম পেজের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনেন। এরপর ৫ ঘণ্টা না যেতেই শুক্রবার রাত ৯টায় পেজটি আবার একই হ্যাকার গ্রুপ নিয়ন্ত্রণে নেয়। এর আগে শুক্রবার ভোর ৫টা ৪২ মিনিটে হ্যাকাররা পেজটির প্রোফাইল ও কাভারের ছবি পরিবর্তন করে হুমকি সূচক বার্তা দেয়। হ্যাকাররা নিজেদের পরিচয় দিয়ে জানায়, শিগগিরই ব্যাংকের ফেসবুক পেজ ও ওয়েবসাইটে বড় ধরনের সাইবার হামলা চালানো হবে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পেজটি ফেসবুকের সার্চ অপশন থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়। ফলে গ্রাহকসহ ইসলামী ব্যাংকের লেনদেনকারী ও সংশ্লিষ্টরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরে বিকাল ৫টার দিকে ইসলামী ব্যাংকের আইটি টিম পেজের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়।
ইসলামী ব্যাংকের জনসংযোগ বিভাগের প্রধান নজরুল ইসলাম পেজ হ্যাক হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘শুক্রবার ভোরে আমাদের ফেসবুক প্যাজ হ্যাক হয়েছিল। পরে ব্যাংকের আইটি বিভাগের তৎপরতায় পেজটি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।’
এদিকে গতকাল শনিবারের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ সম্পর্কে সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান জানান, চাকরিচ্যুত ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তারা সড়কে অবস্থান করায় যান চলাচল কিছুটা ব্যাহত হয়। পরে পুলিশ তাদের সরিয়ে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
বারো আউলিয়া হাইওয়ে পুলিশের ওসি আবদুল মোমিন জানান, শনিবার পৌনে ১টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে আন্দোলনকারীরা উঠে গেছে। আমরা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে তাদের দাবির বিষয়ে অবহিত করব বলে আশ্বাস দিয়েছি।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের ইউজার আইডি, স্টাফ অ্যাকাউন্ট, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সবকিছু বন্ধ করে দিয়েছে। ২৫ তারিখে বেতন হওয়ার পরও তারা কেউ বেতন তুলতে পারছেন না।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এস আলম গ্রুপের হাত থেকে ইসলামী ব্যাংক মুক্ত হয়। এই গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকার সময় কোনো ধরনের পরীক্ষা ও যাচাই-বাছাই ছাড়াই মৌখিক নির্দেশে প্রায় ১০ হাজার জনকে নিয়োগ দেয়ার অভিযোগ করে বর্তমান কর্তৃপক্ষ। এর ফলে ব্যাংকটির জনবল বেড়ে দাঁড়ায় ২২ হাজারে, যা ২০১৬ সালে ছিল ১৩ হাজার। মৌখিক নির্দেশে নিয়োগ পাওয়াদের মধ্যে ৫ হাজার ৩৮৫ জনকে মূল্যায়ন পরীক্ষায় অংশ নিতে ২৭ সেপ্টেম্বর ডাকা হয়। তার মধ্যে মাত্র ৪১৪ জন অংশ নেয়। বাকিরা পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। ৫ হাজার ২০০ জনের বেশি কর্মীকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) এবং শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে।
এস আলম এই ব্যাংকটি দখল করে ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি। এরপর নিয়োগ পাওয়া ১০ হাজারের মধ্যে ৭ হাজার ২২৪ জন জন ছিল তার নিজ এলাকার। দখলের সময় ইসলামী ব্যাংকে চট্টগ্রামে বাড়ি এরকম কর্মী ছিল ৭৭৬ জন।
