হাসান শিরাজি: বেলা ১টা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির এক কোণে বসে কপালে ভাঁজ নিয়ে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে আছে তানিয়া। সে রোবোটিকস বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। জার্মানির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবের সঙ্গে যৌথ গবেষণার অংশ হিসেবে তাকে একটি ত্রিমাত্রিক সিমুলেশন রান করতে হবে। কিন্তু ক্যা¤‹াসের সাধারণ ইন্টারনেট সংযোগের যে গতি, তাতে ফাইল আপলোড হতেই কেটে গেল আধা ঘণ্টা, মাঝপথে গিয়ে সংযোগও বিচ্ছিন্ন!
তানিয়ার মতো হাজারো শিক্ষার্থীর এই চেনা ছবিটা আমাদের দেশের প্রায় প্রতিটি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের। অথচ এই তরুণরাই কিন্তু আগামী দিনের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’-এর মূল কারিগর।
এই স্থবিরতা ভাঙতে পারে যে প্রযুক্তি, তা হলো ফাইভ-জি। তবে পুরো দেশে একযোগে ফাইভ-জি ছড়িয়ে দেওয়া যেমন বিশাল ব্যয়বহুল, তেমনি সময়সাপেক্ষ। এই সমস্যার একটি দারুণ এবং বাস্তবসম্মত সমাধান লুকিয়ে আছে একটি কৌশলী উদ্যোগেÑ‘ক্যা¤‹াস ক্লাস্টার’ বা দেশের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ এলাকাগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে ফাইভ-জি নেটওয়ার্কের আওতায় আনা।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু পড়াশোনার জায়গা নয়, এগুলো হলো নতুন আইডিয়া আর উদ্ভাবনের কারখানা। চিকিৎসাবিদ্যার শিক্ষার্থী যখন অগমেন্টেড রিয়ালিটি দিয়ে দূর দেশের জটিল অস্ত্রোপচার লাইভ দেখবে, কিংবা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র যখন ড্রোন ও রিয়েল-টাইম ডেটা দিয়ে ফসলের রোগ নির্ণয় করবে, তখন ফাইভ-জির উচ্চগতি আর জিরো-ল্যাটেন্সি (বিলম্বহীন) নেটওয়ার্ক অপরিহার্য। তাই দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ফাইভ-জি হাব হিসেবে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
আমাদের নীতিনির্ধারকেরা প্রায়ই তরুণদের মেধার প্রশংসা করেন। কিন্তু সেই মেধাকে বিকশিত করার জ্বালানি বা অবকাঠামো যদি আমরা দিতে না পারি, তবে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আমরা পিছিয়ে পড়ব। এ-জাতীয় ফাইভ-জি ক্যা¤‹াস ক্লাস্টার পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে নীতিনির্ধারকদের কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ বা গাইডলাইন মাথায় রাখা প্রয়োজনÑ
পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ: সরকার একা সব খরচ বহন করবে, এমন সনাতন ভাবনার বাইরে আসতে হবে। দেশের শীর্ষস্থানীয় টেলিকম অপারেটরদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যৌথ চুক্তি করাতে হবে। অপারেটররা ক্যা¤‹াসে টাওয়ার ও অবকাঠামো বসাবে, বিনিময়ে সরকার তাদের কর ছাড় বা স্কেকট্রাম ফি-তে বিশেষ আর্থিক সুবিধা দিতে পারে। ‘শিক্ষা প্যাকেজ’ ও সাশ্রয়ী ট্যারিফ: ফাইভ-জি প্রযুক্তির খরচ সাধারণত বেশি হয়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ‘এডুকেশন ডেটা প্যাক’ চালু করতে হবে। কোনো শিক্ষার্থী যেন শুধু টাকার অভাবে এই প্রযুক্তির সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিটিআরসি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের।
স্মার্ট ল্যাব ও ইনকিউবেশন সেন্টার: শুধু নেটওয়ার্কের টাওয়ার বসালেই হবে না, তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি বড় শিক্ষা ক্লাস্টারে ‘ফাইভ-জি ইনোভেশন ল্যাব’ তৈরি করা হোক, যেখানে বসে শিক্ষার্থীরা আইওটি, এআই এবং আধুনিক প্রযুক্তির প্র্যাকটিক্যাল কাজ করতে পারবে।
আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণ: ঢাকার বাইরের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলো যেন কোনোভাবেই অবহেলিত না হয়। ঢাকা বা চট্টগ্রামের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গ, দক্ষিণাঞ্চল কিংবা সিলেটের ক্যা¤‹াসগুলোকেও প্রথম ধাপের পরিকল্পনাতেই যুক্ত করতে হবে, যাতে বৈষম্যহীন ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হয়।
প্রযুক্তির এই নতুন বিপ্লব কোনো বিলাসী আয়োজন নয়, এটি আমাদের টিকে থাকার লড়াই। আজ যদি আমরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ফাইভ-জির শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তুলতে পারি, তবে আগামী দিনের বৈশ্বিক প্রযুক্তি জায়ান্টদের সঙ্গে টক্কর দেওয়ার মতো ফ্রিল্যান্সার, গবেষক ও উদ্যোক্তা তৈরি হবে এই বাংলার মাটিতেই।
নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে, যানজটে আটকে থাকা গাড়িতে বসে ফাইভ-জি দিয়ে বিনোদন নেওয়ার চেয়ে, ক্যা¤‹াসের ল্যাবে বসে একজন শিক্ষার্থীর নিরবচ্ছিন্ন গবেষণার মূল্য অনেক বেশি। আসুন, তরুণদের হাতে সেই গতি তুলে দিই, যা তাদের স্বপ্নকে ছোঁয়ার ডানাকে আরও শক্তিশালী করবে। সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখনই সময়।
