Print Date & Time : 24 April 2026 Friday 4:04 am

তামিলনাড়ুতে জয়ললিতার পথেই কি এগোতে পারবেন বিজয়?

শেয়ার বিজ ডেস্ক: ভারতের তামিলনাড়ুতে বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন চলচ্চিত্র তারকা থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া সি জোসেফ বিজয়। তার অংশগ্রহণে বহুদিনের দ্বিমুখী লড়াই এবার রূপ নিয়েছে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। খবর: আল জাজিরা
দক্ষিণাঞ্চলের শহর তিরুনেলভেলিতে এক নির্বাচনী সমাবেশে বিজয় দাবি করেন, তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা একজোট হয়ে তাকে ক্ষমতায় আসা থেকে ঠেকাতে চাইছে। বিপুল জনসমাগমে তার বক্তব্যে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস দেখা যায়।
রাজ্যের ক্ষমতাসীন দল ডিএমকে’র নেতৃত্বে রয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিন। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরে রয়েছে এআইএডিএমকে।
বিজয়ের দল টিভিকে এই দুই জোটের বাইরে নতুন বিকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তামিলনাড়ুতে চলচ্চিত্র তারকাদের রাজনীতিতে সাফল্যের ইতিহাস রয়েছে। এমজি রামচন্দ্রারান ও জয় ললিতার মতো নেতারা দীর্ঘদিন রাজ্য শাসন করেছেন এবং এখনো জনমনে প্রভাবশালী।
বিশ্লেষকদের মতে, বিজয়ের জনপ্রিয়তা বিশেষ করে তরুণ ও নারী ভোটারদের মধ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি সংখ্যালঘু ও দলিত ভোটের একটি অংশও তার দিকে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, সমাবেশে জনসমাগম মানেই ভোট নয়। শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো ও স্পষ্ট রাজনৈতিক আদর্শের অভাব বিজয়ের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজয়ের উপস্থিতি দুই প্রধান জোটের জন্যই দ্বিমুখী প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি যেমন ক্ষমতাসীন দলের ভোট কমাতে পারেন, তেমনি বিরোধী ভোটও বিভক্ত করতে পারেন।
সব মিলিয়ে বিজয় রাজনৈতিক যাত্রা তামিলনাড়ুর নির্বাচনে নতুন উত্তেজনা তৈরি করলেও তাকে ঘিরে সাফল্যের পথ এখনো অনিশ্চিত। জনপ্রিয়তা থাকলেও বাস্তব রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে তাকে আরও বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
২০২৪ সালে ‘তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম’ নামে দল গঠন করে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন বিজয়। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা দ্রাবিড়া মুন্নেত্রা কাজাগাম (ডিএমকে) ও প্রধান বিরোধী দল অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড়া মুন্নেত্রা কাজাগামের (এআইএডিএমকে) আধিপত্যের অবসান ঘটাবেন।
বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্টালিন ১৪ দলীয় জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যা অন্যতম শরিক ভারতীয় কংগ্রেস। অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা এদাপ্পাড়ি কে পালানিস্বামী ১০ দলীয় জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যেখানে শরিক হিসেবে রয়েছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দল বিজেপি।
ডিএমকে ও এআইএডিএমকে এই দুই দলই নিজেদের দ্রাবিড় রাজনীতির ধারক বলে দাবি করেযা জাতপাত বৈষম্যের বিরুদ্ধে, সামাজিক সংস্কারের পক্ষে ও উত্তর ভারতের আধিপত্যের বিরোধিতায় গড়ে ওঠা একটি আন্দোলন।
১৯৬৭ সাল থেকে দ্রাবিড় দলগুলো তামিলনাড়ুর ক্ষমতায় রয়েছে। জাতীয় দলগুলো এখানে তুলনামূলকভাবে দুর্বল। বিজেপি ২৭টি আসনে ও কংগ্রেস ২৮টি আসনে লড়ছে নিজ নিজ জোটের অংশ হিসেবে। ২০১১ সালের সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী, তামিলনাড়ুর ৭ কোটি ২০ লাখ মানুষের মধ্যে ৮৭ শতাংশের বেশি হিন্দু, ৬ দশমিক ১ শতাংশ খ্রিষ্টান ও ৫ দশমিক ৮ শতাংশ মুসলিম।
হিন্দুদের মধ্যে অনগ্রসর শ্রেণি ৪৫ দশমিক ৫ শতাংশ, অতিপশ্চাৎপদ ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ এবং দলিত ২০ দশমিক ৬ শতাংশ। দলিতরা ঐতিহাসিকভাবে বৈষম্য ও সহিংসতার শিকার হয়ে আসছে।
খ্রিষ্টান বাবা ও হিন্দু মা থেকে জš§ নেওয়া বিজয় ‘ভেল্লালার’ সম্প্রদায়ের সদস্য, যা একটি সমৃদ্ধ কৃষিভিত্তিক গোষ্ঠী। শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় শুরু করা বিজয়ের ১৯৯২ সালের প্রথম চলচ্চিত্র ব্যর্থ হয়। পরে জনপ্রিয় অভিনেতা বিজয়কান্তের সঙ্গে অভিনয় করে তিনি সফলতা পান। ২০০৪ সালের ‘ঘিল্লি’ চলচ্চিত্র তাকে সুপারস্টার বানিয়ে দেয়।
২০১৩ সালের ‘থালাইভা’ চলচ্চিত্রে তিনি রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষার ইঙ্গিত দেন। পরবর্তী চলচ্চিত্রগুলোতেও রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট হয়। তার শেষ চলচ্চিত্র ‘জনা নায়াগান’-এর নামেও রাজনৈতিক ইঙ্গিত রয়েছে।
ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় লাখো মানুষকে আকৃষ্ট করলেও সমাবেশে বিশৃঙ্খলার অভিযোগ রয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে এক পদদলিত ঘটনায় ৪২ জন নিহত হন।
বিশ্লেষকদের মতে, তিনি দলিত ও খ্রিষ্টান ভোটের একটি অংশ পেতে পারেন এবং সরকারবিরোধী ভোটেও ভাগ বসাতে পারেন। তবে অভিজ্ঞ দুই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তার লড়াই সহজ নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আর কান্নান তাকে ‘একই সঙ্গে আশীর্বাদ ও অভিশাপ’ হিসেবে বর্ণনা করেন।