নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় তাকে শপথবাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। পরে রাষ্ট্রপতি ৪৯ সদস্যের মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করান। এ শপথের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো নতুন সরকারের পথচলা। দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর দেশ পেল গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকার। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র রহমানের নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রিসভায় ২৫ জন মন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন।
শপথ গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীগণ শপথ বইয়ে স্বাক্ষর করেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গণি শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন।
দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশের মানুষ এবার অবাধ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায়। দীর্ঘদিন ধরে মানুষ এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ উৎসবমুখর নির্বাচনের স্বপ্ন দেখেছিল। অবশেষে এ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে তাদের সেই স্বপ্নপূরণ হয়।
শপথ গ্রহণকারী মন্ত্রীরা হলেন-মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ (টুকু), মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, ড. খলিলুর রহমান (টেকনোক্র্যাট), আবদুল আউয়াল মিন্টু, কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, মিজানুর রহমান মিনু, নিতাই রায় চৌধুরী, খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর, আরিফুল হক চৌধুরী, জহির উদ্দিন স্বপন, মোহাম্মদ আমিন-উর রশীদ (টেকনোক্র্যাট), আফরোজা খানম, শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, আসাদুল হাবিব দুলু, মো. আসাদুজ্জামান, জাকারিয়া তাহের, দীপেন দেওয়ান, আ ন ম এহছানুল হক মিলন, সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, ফকির মাহবুব আনাম ও শেখ রবিউল আলম।
প্রতিমন্ত্রীরা হলেন-এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, মো. শরিফুল আলম, শামা ওবায়েদ ইসলাম, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, ফরহাদ হোসেন আজাদ, আমিনুল হক (টেকনোক্র্যাট), মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, হাবিবুর রশীদ, মো. রাজিব আহসান, মো. আব্দুল বারী, মীর শাহে আলম, জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, ইশরাক হোসেন, ফারজানা শারমিন, শেখ ফরিদুল ইসলাম, নুরুল হক নূর, ইয়াসের খান চৌধুরী, এম ইকবাল হোসেইন, এম এ মুহিত, আহম্মদ সোহেল মঞ্জুর, ববি হাজ্জাজ ও আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম।
বাংলাদেশের ইতিহাসের দীর্ঘ ঐতিহ্য ভেঙে নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান বঙ্গভবনের পরিবর্তে জাতীয় সংসদ ভবন কমপ্লেক্সের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হয়।
কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, চীন, ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপ এবং ভুটানসহ ১৩টি দেশের বিশ্বনেতাদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা নয়াদিল্লির প্রতিনিধিত্ব করেন।
এছাড়া জমকালো এ আয়োজনে উপস্থিত অতিথিদের মধ্যে ছিলেন- অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যবৃন্দ, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, তিন বাহিনীর প্রধান, কূটনৈতিক কোরের সদস্য, সিনিয়র সাংবাদিক এবং উচ্চপদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা।
অনুষ্ঠানে তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান এবং তাদের মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। সাদা জামা ও কোট-প্যান্ট পরিহিত তারেক রহমানকে এ সময় অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী এবং প্রাণবন্ত দেখাচ্ছিল। ঐতিহাসিক স্থানটি প্রায় ১ হাজার ২০০ আমন্ত্রিত অতিথিতে উপচে পড়েছিল এবং তাদের মধ্যে অনেকেই সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
সরকারপ্রধান হিসেবে নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও তাদের মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে বিকাল ৩টা ৫৮ মিনিটে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রবেশ করলে তাকে দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হয়।
১২ ফেব্রুয়ারি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনের সময় ২৯৯টি আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি ‘ধানের শীষ’ প্রতীক নিয়ে ২০৯টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসন নিয়ে জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা পালন করবে। অন্যান্য দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বাকি আসনগুলোতে জয়ী হয়েছেন। এর আগে রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ মিছিল করে তরুণদের নেতা তারেক রহমানের প্রশংসা করে স্লোগান দিতে থাকে।
উল্লেখ্য ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের সময়ই দলের ভেতরে সক্রিয় হয়ে উঠতে থাকেন তারেক রহমান। সেবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি জোট। তবে তারেক রহমান নির্বাচনে অংশ নেননি। পরে ২০০২ সালের ২২ জুন দলের মধ্যে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদ তৈরি করে তাকে ওই পদে অধিষ্ঠিত করা হয়। তারেক রহমানকে এক-এগারোর সরকারের সময় একাধিক মামলা, ১৮ মাসের কারাবরণ ও নির্যাতনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় সতেরো বছর লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকতে হয়। ’২৪-এর ৫ আগস্টের পট-পরিবর্তনের পর আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ায় দীর্ঘ প্রবাস জীবনের ইতি টেনে দেশে ফেরেন তারেক রহমান। পরে গত ডিসেম্বরে ঢাকায় ফিরে বিএনপির পক্ষ থেকে বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা পান তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে অবশেষে সরাসরি নেতৃত্বে আসীন হন তিনি।
দলের চেয়ারপারসন তথা তারেক রহমানের মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তখন সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন। এ অবস্থায় বাংলাদেশের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের তৈরি করা দলটি প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সংগঠিত ও জনপ্রিয় হওয়ার পর আবার একটি সমস্যা-সংকুল পথ পাড়ি দিতে থাকে। এ সময় তাদের বড় সন্তান তারেক রহমান দরটির নেতৃত্ব দেন। এর কয়েক দিন পর খালেদা জিয়ার মৃত্যু এবং সংসদ নির্বাচনের মতো দুটি ঘটনা সামলাতে হয় তারেক রহমানকে।
মায়ের মৃত্যুতে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পেয়ে নির্বাচনী-যুদ্ধে মূল নেতৃত্ব দেন তারেক রহমান। এতে সফল তিনি। ছিনিয়ে আনেন নিরঙ্কুশ বিজয়।
এদিকে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পরেই ভারত সফরের আমন্ত্রণ পান তারেক রহমান। গতকাল তাকে এ আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা।
