Print Date & Time : 21 May 2026 Thursday 12:43 am

তিন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্তে নামছে ডিএসই-বিএসইসি

রামিসা রহমান: পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত একটি বাস্তবতা হলো দুর্বল ও লোকসানি কোম্পানিগুলোর অস্বাভাবিক শেয়ারদর বৃদ্ধি। বিশেষ করে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে থাকা কোম্পানিগুলো—যেগুলো নিয়মিত লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ, আর্থিকভাবে দুর্বল কিংবা পরিচালনাগত সংকটে রয়েছে । সেগুলোর শেয়ারদরের অস্বাভাবিক উত্থান বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। এই প্রেক্ষাপটে তিনটি কোম্পানির কার্যক্রম ও আর্থিক সক্ষমতা খতিয়ে দেখতে অনুসন্ধানমূলক পরিদর্শনে নামছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), যার অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

পরিদর্শনের আওতায় এসেছে অ্যাকটিভ ফাইন কেমিক্যালস লিমিটেড, এএফসি অ্যাগ্রো বায়োটেক লিমিটেড এবং লিব্রা ইনফিউশন লিমিটেড। তিনটি কোম্পানিই দীর্ঘ সময় ধরে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে এবং তাদের আর্থিক দুর্বলতা নিয়ে বাজারে আগে থেকেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই তদন্ত কেবল তিনটি প্রতিষ্ঠানের সীমায় আটকে থাকবে না; বরং এটি পুরো পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ‘জেড’ ক্যাটাগরির

কোম্পানিগুলোর বড় অংশই কার্যত দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। অনেক ক্ষেত্রে বছরের পর বছর লভ্যাংশ না দেওয়া, উৎপাদন বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে স্থবিরতা, আর্থিক প্রতিবেদনে অস্পষ্টতা এবং পরিচালনা পর্ষদের অদক্ষতা—সব মিলিয়ে এই কোম্পানিগুলো বিনিয়োগের জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু এর বিপরীতে প্রায়ই দেখা যায়, এসব কোম্পানির শেয়ারদর হঠাৎ করেই ১০০ শতাংশের বেশি লাফিয়ে বাড়ছে। যা স্বাভাবিক বাজার আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় ।

সূত্র জানিয়েছে, আলোচিত তিন কোম্পানির ওপর ডিএসই কর্তৃপক্ষ একাধিকবার অনুসন্ধানমূলক পরিদর্শনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছিল। পরে বিষয়টি যাচাই- বাছাই করে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। কমিশনের মার্কেট ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা ইতোমধ্যে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠানো হয়েছে।

এই পরিদর্শনের মূল লক্ষ্য – কোম্পানিগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা ও ব্যবসায়িক সক্ষমতা যাচাই করার পাশাপাশি তাদের শেয়ার লেনদেনের ধরন, সম্পদের বাস্তবতা, পরিচালনা কাঠামো এবং বিনিয়োগকারীদের

স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হবে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে সম্প্রতি শেয়ারদরের অস্বাভাবিক ওঠানামার পেছনে কোনো ধরনের কারসাজি বা কৃত্রিম প্রভাব রয়েছে কি-না। বাজার-সংশ্লিষ্টদের মতে, অ্যাকটিভ ফাইন কেমিক্যালস এবং এএফসি অ্যাগ্রো বায়োটেক দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক সংকটে রয়েছে। কোম্পানি দুটি টানা কয়েক বছর ধরে তাদের শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি । শুধু তাই নয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করার যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেটিও তারা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই বিষয়টি সাধারণত কোম্পানির প্রতি উদ্যোক্তাদের আস্থার ঘাটতি এবং পরিচালনাগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, আর্থিকভাবে দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানি দুটির শেয়ারদর উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ—এই অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের শেয়ারের দাম বাড়ার ঘটনাকে বাজার বিশ্লেষকরা অস্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, ব্যবসায়িক ভিত্তি দুর্বল থাকা অবস্থায় শেয়ারদরের এমন উল্লম্ফন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য বিভ্রান্তিকর এবং ঝুঁকিপূর্ণ ।

অন্যদিকে লিব্রা ইনফিউশন লিমিটেডের অবস্থাও খুব একটা ভিন্ন নয়। কোম্পানিটি গত চার বছর ধরে শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি। যদিও উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার ধারণের হার নির্ধারিত সীমার মধ্যে রয়েছে, তারপরও শেয়ারদরের ধারাবাহিক বৃদ্ধি বাজারে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে অল্প সময়ের মধ্যে দামের অস্বাভাবিক উত্থান বাজারে নানা গুঞ্জনের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পুঁজিবাজারে প্রায়ই দেখা যায়—একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে দুর্বল কোম্পানির শেয়ারদর বাড়িয়ে তোলে। প্রথমে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা হয়। এরপর দাম যখন

একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছে যায়, তখন সেই চক্র শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে বেরিয়ে যায়। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা, যারা উচ্চ দামে শেয়ার কিনে পরে বড় লোকসানের মুখে পড়েন।

এমন পরিস্থিতিতে বিএসইসির এই উদ্যোগকে সময়োপযোগী বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ‘জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলোকে ঘিরে যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে কার্যকর তদন্ত অত্যন্ত জরুরি ছিল। এ ধরনের অনুসন্ধানমূলক পরিদর্শন যদি নিয়মিত করা যায়, তাহলে বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে । এদিকে ডিএসইর এই পরিদর্শন কার্যক্রম বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও নতুন আগ্রহ তৈরি করেছে । অনেকেই আশা করছেন, এই তদন্তের মাধ্যমে কোম্পানিগুলোর প্রকৃত আর্থিক চিত্র সামনে আসবে। যদি কোনো ধরনের অনিয়ম, তথ্য গোপন বা বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এমন প্রত্যাশা বাজারে জোরালো হচ্ছে।

এ নিয়ে বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম জানিয়েছেন, ডিএসইর আবেদনের ভিত্তিতেই সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এই পরিদর্শনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে বোঝা যায়, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এখন বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে চায় ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু এই তিনটি কোম্পানির তদন্তই যথেষ্ট নয়। ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে থাকা অন্যান্য কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের নজরদারি প্রয়োজন। কারণ পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে একটি অভিযোগ রয়েছে—দুর্বল কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি হলেও কার্যকর তদন্ত খুব কমই হয়। ফলে বাজারে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, যা বিনিয়োগের পরিবেশকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। তাই এটি কেবল তিনটি কোম্পানির তদন্ত নয়; বরং পুরো বাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনের একটি বড় পরীক্ষা। এই উদ্যোগ সফল হলে ভবিষ্যতে পুঁজিবাজার আরও স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব হয়ে উঠবে।