Print Date & Time : 25 April 2026 Saturday 2:47 am

তীব্র তাপপ্রবাহ রক্ষা কৌশল বনাম লোডশেডিং

আলকামা সিকদার: বাংলাদেশ ষড় ঋতুর দেশ। ঋতুর ব্যবধানে বর্তমানে বাংলাদেশের বুক চিরে এখন চলছে গ্রীষ্মকাল। এ সময়ে তীব্র গরম বা তাপপ্রবাহ প্রকট আকার ধারণ করে সময়ে-অসময়ে। তাই সে অনুসারে এখন চলছে দেশজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ।
আবার মাঝে মাঝে আকাশে ঘুরে বেড়ায় কালো মেঘের ঘনঘটা। তাই কোনো কোনো সময় আকাশে ফেরে তাপের সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টির ঝনঝনানিও। তাই এ সময়ে রোদ ও বৃষ্টির মিশেলে তাপপ্রবাহ আরও বেশি তীব্র হয়। অসহ্য হয়ে ওঠে জনজীবন। আর এরই মাঝে আবার উপদ্রব হয়ে দেখা দিয়েছে মাত্রহীন বৈদ্যুতিক লোডশেডিং। মানুষ বেঁচে থাকার জন্য নানা ধরনের উপাদান ব্যবহার করে। নিত্যদিনের ব্যবহার্যের মাধ্যে বিদ্যুৎও একটি। আর ইসরাইল-ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ত্রিদেশীয় যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সময়ে বাংলাদেশে এমন বৈদ্যুতিক লোডশেডিং জনজীবন বিপর্যস্ত করে তুলেছে। তাই অসহ্য এই লোডশেডিং ও তীব্র দাবদাহ থেকে আমাদের রক্ষা পেতে হলে এখনই সচেতন হতে হবে। তা না হলে ঘটবে দারুণ বিপর্যয়, যেমনটা ইতোমধ্যে লক্ষ করা যাচ্ছে।
চলমান তীব্র তাপপ্রবাহের ফলে প্রকৃতি ও পরিবেশের মাঝে আজ মানুষের নানাবিধ অত্যাচারে প্রকৃতি ও পরিবেশ দারুনভাবে রুদ্ররূপ ধারণ করেছে! অবাধে-নির্বিচারে বৃক্ষ কর্তন, প্রাকৃতিক বন অবাধে ধ্বংস আর পাহাড় টিলা নির্বিচারে কাটার ফলেই প্রকৃতি ক্ষেপে উঠেছে ব্যাপকভাবে! প্রকৃতির এই রুদ্র আচরণ থেকে আমাদের পরিত্রাণের জন্য ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণ করে ধরিত্রীকে আবার সবুজায়নে ফিরিয়ে আনা এখন অতীব জরুরি। তাহলেই হয়তো প্রকৃতি পাবে আপন পরিবেশ। দাবদাহ কমে আসবে ভূমণ্ডল থেকে।
খাদ্য, জ্বালানি, আসবাবপত্র তৈরি, গৃহনির্মাণ, ওষুধ, সৌন্দর্যায়ন প্রকৃতির জন্য আমরা গাছ লাগাই। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, গাছ থেকে নির্গত অক্সিজেন আমরা বেঁচে থাকার জন্য গ্রহণ করি। আর যখন আমাদের পরিবেশ থেকে এসব দিন দিন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, সে কারণে প্রতিনিয়ত তাপপ্রবাহ বাড়তে শুরু করেছে। আর বর্তমান সময়ে সেইসঙ্গে যোগ হয়েছে বাড়তি উপটৌকন হিসেবে অস্বাভাবিক লোডশেডিং।
বাংলাদেশেও জ্বালানির বৈশ্বিক পরিস্থিতি যখন মোকাবিলা করতে হচ্ছে, সে কারণে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতেও সেই প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তীব্র এই গরমে যখন সময়মতো পরিমিত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারছে না সংশ্লিষ্ট বিভাগ, তখন মেনে নিতেই হবে যে অবশ্যই জ্বালানির এই বৈশ্বিক প্রভাব পড়েছে এই পরিস্থিতিতে।
আমাদের দেশের পরিবেশ যদি সত্যি একটি সহনীয় পর্যায়ে থাকত তাহলে অবশ্যই আমাদের পরিবেশের ওপর এমন বৈরী অবস্থা বিরাজ করত না। আমরা জানি কোনো দেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য অন্তত পক্ষে ২৫ শতাংশ ভূমিতে বনজঙ্গল থাকা দরকার। সেই তুলনায় বাংলাদেশে গাছনিধন ও নির্বচারে বন ধ্বংসের কারণে পরিবেশ রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে বনভূমি নেই। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থা (এফএও) বনবিষয়ক এক প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের সাড়ে ১৩ শতাংশ বনভূমি রয়েছে। তবে এটা আমাদের দেশের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এই তথ্য মানতে নারাজ। মন্ত্রণালয়ের দাবি, দেশের মোট আয়তনের ১৭ শতাংশ বনভূমি রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এর লেশ মাত্রও খুঁজে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।
সত্যি যদি এমনটাই হতো তাহলে আজকে বাংলাদেশের পরিবেশ এতটা ঘোলাটে কিংবা এমন তীব্র দাবদাহ পরিলক্ষিত হতো না। আর এজন্য আমাদের গাছ অবাধে কর্তন ও নির্বচারে বন ধ্বংসকেই দায়ী করা হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির লীলাভূমি টিলা ও পাহাড় কেটে ধ্বংস করছে একশ্রেণির অসাধু ভূমিখেকোরা। এ ছাড়া সমতল ভূমির সয়েল যা পরিবেশের জন্য উর্বর, তা কেটে বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করার ফলে প্রকৃতি আরো লাজুক হয়ে পরছে দিন দিন। তাই মনে করা হচ্ছে, পরিবেশের ধ্বংসের জন্য আমাদের সমাজের একশ্রেণির অসাধু গাছ চোর, মাটিখেকোরা দায়ী।
বেশ কিছুদিন ধরে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তীব্র অসহনীয় দাবদাহ। কিছুদিন পরপর সামান্য বৃষ্টি হলেও তা হয় যৎ সামান্য, যা তীব্র গরমকে কমাতে সহায়ক হয় না; বরং এটাতে গরমের তীব্রতা না কমে আরও বৃদ্ধি পায়। এর ফলে মানুষের জীবনযাত্রা হয়ে ওঠে আরও অসহনীয়। দাবদাহের এ তীব্রতার কারণে দিনকে দিন সারা বিশ্বের তাপমাত্রা আরও বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা চলছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কেউ কেউ মনে করছেন, ইসরায়েল-ইরান-যুক্তরাষ্ট্রÑএ ত্রিদেশীয় যুদ্ধে ব্যবহƒত বিভিন্ন গ্যাস, ক্ষেপণাস্ত্রসহ নানাবিধ অস্ত্র ব্যবহারের ফলে তা থেকে নিঃসরিত গ্যাসের কারণেও তাপমাত্রা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এমনটা অমূলকও নয়। গ্যাস নিঃসরিত বিভিন্ন পদার্থ পরিবেশের জন্য সত্যি ক্ষতিকর। ক্ষতিকর এসব বস্তু সরাসরি পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলছে বলেই এমনটা হচ্ছে বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে, যা দিন দিন অসহনীয় পর্যায় চলে যাচ্ছে।
অসহনীয়ভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে। নাকাল পরিবেশ তৈরি হয়েছে খেটে খাওয়া মানুষের মাঝে। বিশেষ করে ঢাকা শহরের মতো জানবহুল শহরগুলোয় এর মাত্রা আরও ভয়াবহ। আর এর প্রতিক্রিয়া বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে নারী, বৃদ্ধ ও শিশুদের মাঝে। তীব্র এ গরমের
কারণে শিশুরা রোগাগ্রস্ত হয়ে হাসপাতালমুখী
হয়ে পড়ছে অহরহ।
তীব্র অসহ্য এ গরমের কারণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে কর্মজীবী মানুষও। শিশুরা পড়েছে গরম থেকে ঠান্ডাজনিত নানা রোগের কবলে। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিকগুলোয় এর প্রভাব পড়েছে। এছাড়া বেড়েছে নানা ধরনের জটিল রোগ।
পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি এবং অস্বাভাবিক হারে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এর মূল কারণ বলে বিশেষজ্ঞরা চিহ্নিত করেছেন। অধিক হারে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পকারখানা স্থাপন, যত্রতত্র ইটভাটা স্থাপন, পাহাড় কাটা, ইট ভাটাগুলোয় অবাধে বনের গাছ কেটে পোড়ানো প্রভৃতি কারণে একাধারে যেমন বায়ু ও পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, তেমনি বনের গাছ কেটে বন ও জীববৈচিত্র্যকেও ধ্বংস করা হচ্ছে।
এ ছাড়া বিষাক্ত গ্যাস কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ, ক্লোরোফ্লোরো গ্যাস নিঃসরণ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, অধিক হারে গাছ কর্তন, নির্বিচারে বন নিধনসহ পাহাড়-টিলা কেটে ধ্বংস, পরিবেশের রক্ষাকবচ বিভিন্ন উপাদান, যেমন নির্বিচারে বিভিন্ন পশু-পাখিকে হত্যা করা, পরিবেশের ক্ষতিকারক বৃক্ষ রোপণ এবং জমির উর্বর ও পরিবেশের সহায়ক সয়েল কর্তন করাও এর অন্যতম কারণ। আর এসব ক্ষেত্রে যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়, তাহলে আমাদের এ পৃথিবীতে বসবাস করা খুবই মুশকিল হয়ে পড়বে।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে বৃক্ষরাজি শব্দদূষণ ও পরিবেশ দূষণ রোধ করে। এক হেক্টর পরিমাণ মাঝারি বন ১০ ডেসিবল শব্দ হ্রাস করতে পারে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ও বিভিন্ন উন্নয়নকাজে বনের জমি ব্যবহƒত হচ্ছে। তাই সরকারের উচিত বর্তমানে বনভূমি রক্ষা করার পাশাপাশি বনের বাইরে বৃক্ষরোপণ করে পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা।
তাছাড়া আরও বলা হচ্ছে, পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোয় অতি মাত্রায় কার্বন নিঃসরণের ফলে ইউরোপের দেশগুলোয় বরফ গলতে শুরু করেছে। এ ছাড়া কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেশি হওয়ার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠ ধীরে ধীরে উপরে উঠে আসাও তাপমাত্রা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
গাছ পৃথিবীর এ ক্ষতিকর কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে অক্সিজেন নিঃসরণ করে। এর ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি কিছুটা ধীরগতি হয় এবং বরফ গলা কমে আসে। তাই এখন এই অক্রিজেন ফ্যাক্টরিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমাদেরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে পৃথিবীটা একটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। পরিবেশের ক্ষতিকারক বিদেশি প্রজাতির আকাশিয়া ও ইউকিলিপটাস গাছের চারা উৎপাদনম বিক্রি, বিপণনসহ সবকিছুই নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যার ফলে হয়তোবা আশা করা যেতে পারে, কিছুটা হলেও পরিবেশের উপকার হবে।
তাই পরিবেশকে রক্ষা করতে হলে অবশ্যই আমাদের গাছ লাগানোর কোনো বিকল্প নেই। কেননা অনেক প্রাণী গাছ খেয়ে বেঁচে থাকে, আবার গাছই তাদের একমাত্র আবাসস্থল। বন উজাড়ের কারণে এসব প্রাণী যেমন তাদের খাদ্যের চাহিদা মেটাতে পারছে না, তেমনি আবাসহীন হয়ে পড়ছে। ফলে এসব প্রণী দিনকে দিন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বন উজারের দরুন নানা জাতের গাছগাছালি ও নানা জাতের প্রাণী
আজ বিলুপ্তির পথে।
তাই পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষার্থে গাছ নিধন বন্ধ করতে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ, কঠোর আইন প্রণয়ন এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া একান্ত প্রয়োজন। সেই সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য অক্সিজেন ফ্যাক্টরি গাছ লাগাতে জনগণকে দারুণভাবে উৎসাহ-উদ্দীপনা জোগাতে সরকারি-বেসরকারি পদক্ষেপ গ্রহণ করা অতীব জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে এবং এ নিয়ে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ব্যাপকভাবে প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। তাহলেই হয়তো পরিবেশ রক্ষা পাবে আমাদের এই ধ্বংসলীলা থেকে। একই সঙ্গে রক্ষা পাব আমরা মানবজাতি এবং পরিবেশের সঙ্গে মিশে থাকা প্রাণিকুল।
কমে আসবে পৃথিবী থেকে তীব্র এ দাবদাহ এবং বাড়বে অক্সিজেন।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী