Print Date & Time : 16 January 2026 Friday 4:45 am

দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান ভূরাজনীতি ও বাংলাদেশের কৌশলগত চ্যালেঞ্জ

মো. আকিক তানজিল জিহান : ভূরাজনীতি বা বৈশ্বিক কূটনীতিতে দক্ষিণ এশিয়া এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশই এখানে বসবাস করে, যা প্রায় দুই বিলিয়ন মানুষ। তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অঞ্চলটির অবদান এখনো সীমিত; আঞ্চলিক বাণিজ্য মাত্র পাঁচ শতাংশের নিচে সীমাবদ্ধ। অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিপুল হলেও রাজনৈতিক অবিশ্বাস, সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং দুর্বল আঞ্চলিক কাঠামো এই সম্ভাবনাকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে বাধা সৃষ্টি করছে। এদিকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং ইন্দো-প্যাসিফিক নীতি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিকে জটিল করে তুলছে। এই জটিলতায় অঞ্চলটি কেবল প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বৈশ্বিক শক্তির অংশ হিসেবে কার্যকর হচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে প্রধান প্রভাব ফেলছে ভারতের উত্থান, চীনের অর্থনৈতিক প্রসারণ, পাকিস্তানের সামরিক কৌশল এবং মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্ত সমস্যা ছাড়াও একাধিক সংকট। প্রথমত, ভারত ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা অঞ্চলটির শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণ করছে। ২০২৪-২৫ সালে চীনের সামরিক বাজেট প্রায় ২৯৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যেখানে ভারতের বাজেট ৮৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। চীনের সক্রিয় সেনা প্রায় ২০ লাখ, ভারতের প্রায় ১৪ দশমিক ৫ লাখ। নৌবহরের দিক থেকে চীনের ৩৭০টির বেশি যুদ্ধজাহাজ রয়েছে, ভারতের নৌবহর প্রায় ১৫০টি।

অন্যদিকে চীনের প্রতিরক্ষা খাতে গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয় ভারতের তুলনায় প্রায় পাঁচগুণ বেশি, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, হাইপারসনিক মিসাইল, স্যাটেলাইট নজরদারি এবং সাইবার যুদ্ধ সক্ষমতায় চীনের অগ্রগতি নিশ্চিত করছে। এদিকে পাকিস্তান সরাসরি ভারত-চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সমতা রাখতে না পারলেও চীনের সহায়তায় সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। পাকিস্তানের সামরিক বাজেট ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার হলেও চীনের সরবরাহকৃত জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান, সাবমেরিন এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির কার্যকারিতা বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে। একইসঙ্গে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) এই সহযোগিতার সবচেয়ে দৃশ্যমান রূপ। মোট বিনিয়োগ ৬০-৬৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে, যার মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার। এটি পাকিস্তানের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ২০ শতাংশের সমতুল্য।

তবে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক বাণিজ্য সীমিত হচ্ছে প্রতিনিয়তই। সার্কে আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্যের হার মাত্র পাঁচ শতাংশের নিচে। বিমসটেকের মোট জিডিপি ৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার হলেও নিরাপত্তা ও কাঠামোগত সহযোগিতা এখনো সম্পূর্ণ নয়। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও ট্রানজিট রুট এই সীমাবদ্ধতার মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এদিকে কোয়াড ও ইন্দো-প্যাসিফিক নীতি ভারতের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার করছে। দ্বিপক্ষীয় কূটনীতি এবং ক্ষুদ্র জোটগুলো অঞ্চলের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর চাপ মোকাবিলায় বেশ জরুরি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের উপকূল, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবেশদ্বার এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ট্রানজিট করিডোর হিসেবে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু অর্থনীতি ও বাণিজ্য খাতে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্য ২০২৪ সালে প্রায় ১২০ বিলিয়ন ডলার। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ২৪ বিলিয়ন ডলার এবং ভারতের সঙ্গে ১৬ বিলিয়ন ডলার। মোট আমদানি প্রায় ২৭ শতাংশ চীনের কাছ থেকে আসে। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যে ঘাটতি বছরে প্রায় ১০-১২ বিলিয়ন ডলার। এদিকে চীনা বিআরআই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশে ২৫টির বেশি অবকাঠামোগত প্রকল্প চলমান বা সম্পন্ন, যার মোট মূল্য প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পপার্ক এবং বন্দর উন্নয়নে এই বিনিয়োগ সরাসরি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে। তবে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের প্রায় ২৫ শতাংশ চীনের সঙ্গে যুক্ত, যা ভবিষ্যতে ঋণঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়। এদিকে বাংলাদেশ বর্তমানে ভারতের কাছ থেকে বছরে প্রায় ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করছে, যা মোট সরবরাহের প্রায় সাত শতাংশ। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য ১০টির বেশি কার্যকর ট্রানজিট রুট বাংলাদেশে চালু রয়েছে।

নিরাপত্তা ও মানবিক বিষয় বিবেচনায় নিলে রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মানবিক ও ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ, যার ব্যয় বছরে প্রায় ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসায় চাপ আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের ২৭১ কিলোমিটার সীমান্ত মিয়ানমারের সঙ্গে স্পর্শকাতর, যা নিরাপত্তা ও মানবিক ব্যবস্থাপনায় জটিলতা সৃষ্টি করছে। এদিকে বাংলাদেশিদের সীমান্তে হত্যা, ভারতের চিকেন নেক অঞ্চলের কাছাকাছি লালমনিরহাটে চীনের অর্থায়নে বিমানবন্দর পুনঃসচল, করিডোর, ট্রানজিটসহ একাধিক চুক্তি নিয়ে দুই দেশের ভূরাজনৈতিক সমীকরণ অনেকটা জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব অপরিসীম। বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের ২৫ শতাংশ এই অঞ্চলের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়, যা ২০৩৫ সালে প্রায় ৩০ শতাংশ ছাড়াতে পারে। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার। সম্ভাব্য প্রাকৃতিক গ্যাস, মৎস্য ও নীল অর্থনীতি কয়েক দশকে শত শত বিলিয়ন ডলারের সমমানের হতে পারে। তবে লক্ষ করা যাচ্ছে, ভারত-চীন প্রতিযোগিতা বঙ্গোপসাগরে ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। চীনের পিএলএ নেভি বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম। ভারত নৌ-সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, বিশেষ করে আন্দামান-নিকোবার দ্বীপ ও বঙ্গোপসাগরে উপস্থিতি জোরদার করছে। বাংলাদেশের নৌবাহিনী সামুদ্রিক নিরাপত্তা, মৎস্য রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুট রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বঙ্গোপসাগরের নীল অর্থনীতি প্রাকৃতিক গ্যাস, জ্বালানি, মৎস্য এবং সমুদ্রবন্দর বাংলাদেশের কৌশলগত শক্তি হিসেবে বিবেচিত।

অপরদিকে পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ বিবেচনার ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তন, নদী বিভাজন এবং বন্যা—এসব দীর্ঘমেয়াদি সংকটের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে যেতে হচ্ছে। নদী বিভাজন ও বন্যার কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের প্রায় ১৫-২০ শতাংশ জনসংখ্যা জলবায়ু ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধি কৃষি উৎপাদনেও প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশ এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সীমান্ত নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং পরিবেশগত অভিযোজনকে কেন্দ্রীয় কৌশল হিসেবে গ্রহণ করছে। একইসঙ্গে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিবেচনায় রেখে করণীয় এই যে, দ্বিপক্ষীয় কূটনীতি ও বৈদেশিক নীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখা, বঙ্গোপসাগর ও নীল অর্থনীতিকে কৌশলগত শক্তিতে রূপান্তর করা, রোহিঙ্গা ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা, চীনের সঙ্গে ঋণনির্ভরতা সুষম রাখা এবং বহুপক্ষীয় জোটে অংশগ্রহণ করা। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির মধ্যে বাংলাদেশের ভৌগোলিক সুবিধা ব্যবহার করাও অপরিহার্য।

শিক্ষার্থী, পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়