নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি : বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। প্রফেশনাল প্রোডাকশন হাউসের ঘাটতির কারণে বেশিরভাগ সিনেমা নির্মিত হচ্ছে ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রযোজনা সংস্থার তত্ত্বাবধানে, যেখানে দক্ষতা নিশ্চিতে কোনো সুনির্দিষ্ট কাঠামো অনুসরণ করা হয় না। ফলাফল হিসেবে ঢাকাই সিনেমার মান যেমন নিম্নগামী হচ্ছে, তেমনি দর্শকের আগ্রহও কমে যাচ্ছে দিন দিন।
একসময় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে ছিল বেশ কিছু নামকরা প্রযোজনা সংস্থা, যাদের ছবি মানেই ছিল ‘ব্যবসা সফল’। সেই সময়ের প্রযোজকরা শুধু সিনেমা বানাতেন না, শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা ও নান্দনিকতা বজায় রাখতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সংস্থাগুলোর বেশিরভাগই হারিয়ে গেছে।
‘বেদের মেয়ে জোছনা’র মতো সফল সিনেমা তৈরি করেছিল আনন্দমেলা চলচ্চিত্র। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (বিএফডিসি) ছিল বহু ছবির কেন্দ্রবিন্দু। পরে কৃতাঞ্জলি ফিল্মস, ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও সাম্প্রতিক সময়ে জাজ মাল্টিমিডিয়া বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নতুন ধারার সংযোজন।
চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, দেশের প্রযোজনা ব্যবস্থায় এখনও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হয়নি। বিদেশে বড় বড় পেশাদার প্রতিষ্ঠান যেমনÑপ্যারামাউন্ট পিকচার, ডিজনি, ওয়ার্নার ব্রাদার্সের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠান থেকে বছরের পর বছর ধরে চলচ্চিত্র শিল্পে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ হচ্ছে। গত কয়েক বছরে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় নেটফ্লিক্স ও অ্যামাজন স্টুডিওর মতো ওটিটি প্ল্যাটফর্মও নিয়মিতভাবে সিনেমা, ওয়েব সিরিজ ও ডকুমেন্টারি প্রযোজনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিটি প্রজেক্টের জন্য আলাদা গবেষণা টিম, বাজেট পরিকল্পনা, মার্কেট বিশ্লেষণ এবং দর্শকচাহিদা মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকে। ফলে তারা এমন কনটেন্ট তৈরি করে, যা শুধু বাণিজ্যিক নয়, শিল্পমানেও উচ্চ পর্যায়ের। তাদের এই পেশাদারির কারণেই বিশ্বজুড়ে এসব প্ল্যাটফর্মের সিনেমা ও সিরিজের মান এতটা উন্নত।
বিদেশের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ ভারতের চলচ্চিত্র শিল্পও প্রফেশনাল প্রোডাকশন মডেলে এগিয়ে গেছে। সেখানে প্রতিটি বড় সিনেমা কোনো না কোনো প্রতিষ্ঠিত প্রযোজনা সংস্থার অধীনে নির্মিত হয়। যেমন বলিউডের নামি পরিচালক সঞ্জয় লীলা বানসালি তার ‘বাজিরাও মস্তানি’, ‘পদ্মাবত’, ‘গাঙ্গুবাই কাথিয়াওয়াড়ি’ কিংবা ‘দেবদাস’-এর মতো সিনেমাগুলো নির্মিত হয়েছে বানসালি প্রোডাকশনস ও অন্যান্য পেশাদার স্টুডিওর তত্ত্বাবধানে। প্রতিটি সিনেমায় আলাদা টিম কাজ করেছে গল্প উন্নয়ন, সেট ডিজাইন, পোশাক, সংগীত, আর্ট ডিরেকশন ও বাজার পরিকল্পনা নিয়ে। ফলে সিনেমাগুলো শুধু বিনোদন নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রশংসিত হয়েছে।
অন্যদিকে রাজকুমার হিরানী, যিনি ‘থ্রি ইডিয়টস’, ‘পিকে’, ‘মুন্না ভাই এমবিবিএস’ ও ‘ডানকি’-এর মতো জনপ্রিয় সিনেমা উপহার দিয়েছেন। তার চলচ্চিত্রগুলোও তৈরি হয়েছে বড় প্রযোজনা সংস্থা যেমনÑবিদু ভিনোদ চোপড়া ফিল্মস, রাজকুমার হিরানী ফিল্মস ও রেড চিলিজ এন্টারটেইনমেন্টের সহযোগিতায়। এসব প্রতিষ্ঠানে স্ক্রিপ্ট ডেভেলপমেন্ট থেকে শুরু করে দর্শক বিশ্লেষণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে থাকে পেশাদার দল। তাই তাদের সিনেমাগুলো যেমন মানসম্পন্ন, তেমনি বাণিজ্যিকভাবেও সফল হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোই মূল পার্থক্য তৈরি করে দিয়েছে ভারতের ও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের মধ্যে। ভারতে একজন পরিচালক শুধু সৃজনশীল কাজের দিকে মনোযোগ দেন, আর প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সামলায় আর্থিক, প্রযুক্তিগত ও মার্কেটিংয়ের দিকগুলো। ফলে সৃষ্টিশীলতা ও বাণিজ্যিকতাÑদুটোই একসঙ্গে এগিয়ে চলে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রযোজনা সংস্থা এখনও ব্যক্তি মালিকের ইচ্ছা ও সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। একজন প্রযোজক বা পরিচালক নিজ উদ্যোগে গল্প বাছাই থেকে শুরু করে পুরো নির্মাণ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেন। ফলে সিনেমা খারাপ হলেও দায়বদ্ধতা বা জবাবদিহির জায়গা থাকে না। এতে পুরো শিল্পের মান কমে যায় এবং শিল্পীদের পেশাগত নিরাপত্তাও অনিশ্চিত থেকে যায়।
জানা গেছে, দেশে কয়েকটি করপোরেট প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সক্রিয় থাকলেও তাদের কার্যক্রম সীমিত। যেমন জাজ মাল্টিমিডিয়া, একসময় ঢালিউডে বাণিজ্যিক সিনেমার নবজাগরণ ঘটালেও এখন বছরে অল্পসংখ্যক সিনেমা প্রযোজনা করে। জানা গেছে, তারা বছরে গড়ে কয়েক কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করে না; যা একটি পূর্ণাঙ্গ প্রোডাকশন হাউসের জন্য খুবই সীমিত।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কিছু নতুন উদ্যোগ আশার আলো দেখাচ্ছে। যেমন চরকি, আইফা প্রোডাকশনস এবং বেঙ্গল মাল্টিমিডিয়াÑএরা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট প্রযোজনায় এগিয়ে আসছে। বিশেষ করে চরকি তাদের ওয়েব ফিল্ম ও সিরিজের মাধ্যমে মানসম্মত গল্প ও অভিনয় তুলে ধরছে, যা তরুণ দর্শকদের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে যদি প্রফেশনাল প্রোডাকশন হাউস গড়ে ওঠে, তাহলে শুধু সিনেমার মান নয়, পুরো ইন্ডাস্ট্রির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে। বড় বিনিয়োগকারী ও করপোরেট প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলে শিল্পী ও টেকনিশিয়ানদের জন্য স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং আন্তর্জাতিক মানের সিনেমা নির্মাণের পথও প্রশস্ত হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন, ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক এসএম ইমরান হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, বাংলাদেশে একসময় সিনেমা একটা মানি মেকিং বিজনেস ছিল। আগে দেশে অনেক সিনেমা হল ছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে দেশের মানুষের হলে গিয়ে সিনেমা দেখার আগ্রহ কমে যাওয়ায় কয়েক বছরের তুলনায় হল কমে গেছে। ২০-১৫ থেকে বছর আগে দেশে শত শত সিনেমা হল ছিল। ওই হলকে কেন্দ্র করে অনেক প্রযোজনা সংস্থা গড়ে উঠেছিল। তবে হল কমে যাওয়ায় এখন প্রোডাকশন হাউসগুলো হয়তো বছরে একটা সিনেমা তৈরি করছে। টিকে থাকার জন্য নাটক বা ওটিটি প্লাটফর্মে নানা রকম প্রোডাকশন করে ঠিকে থাকছে। এই জন্য মার্কেট যদি বর্ধিত না হয় তবে ভালো কাজ পাওয়া একটু মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে।
তিনি আরও বলেন, ‘দেশে যদি আধুনিক ও মানসম্মত সিনেমা হলের সংখ্যা বাড়ে, তাহলে চলচ্চিত্র শিল্পে নতুন প্রাণ ফিরে আসবে। প্রযোজনা সংস্থাগুলো তখন বিনিয়োগে আগ্রহী হবে, বাড়বে পেশাদার প্রযোজকদের সংখ্যা। সরকার যদি এই খাতে একটু নজর দেয়, প্রণোদনা ও সুযোগ সৃষ্টি করে, তাহলে দেশীয় চলচ্চিত্র আবারও সোনালী সময় ফিরে পেতে পারে।’
উদীয়মান এক পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমরা এখনও ব্যক্তিগত সম্পর্ক আর আগ্রহের ওপর নির্ভর করে সিনেমা বানাই। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্ট্যান্ডার্ড নেই। বিদেশে একটা সিনেমা বানাতে বছরে কয়েক মাস পরিকল্পনা হয়, আমাদের দেশে সেটা এক সপ্তাহেই শেষ।’
চলচ্চিত্রপ্রেমীদের প্রত্যাশা, সরকার ও বেসরকারি খাত একসঙ্গে উদ্যোগ নেবেÑযাতে বাংলাদেশে প্রফেশনাল প্রোডাকশন হাউসের বিকাশ ঘটে এবং সিনেমা শিল্প নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়।
অন্যদিকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পে সরকারি সহায়তা থাকলেও তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। বিগত সরকারের আমলে অনেক সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত সিনেমা নির্মিত হয়েছে। তবে দুঃখের বিষয়, অধিকাংশ সিনেমাই বড় পর্দায় আলোর মুখ দেখেনি। ফলে দর্শক ও শিল্পীদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। প্রফেশনাল প্রোডাকশন হাউসের অভাবে সিনেমার মান বৃদ্ধিতে এবং শিল্পীদের স্বীকৃতিতে যথেষ্ট বাধা তৈরি হয়েছে।
এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা রহমান তানি শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করলে এফডিসিকে অচিরেই লাভজনক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। বিগত দিনের অনেক নেতৃত্ব এফডিসিকে ইচ্ছাকৃতভাবে পিছিয়ে দিয়ে দেশীয় সংস্কৃতির বিপরীতে প্রতিবেশী দেশের সংস্কৃতিকে বাজার ধরায় সহায়তা করেছেন। আমরা চেষ্টা করছি এফডিসির জৌলুস ফিরিয়ে আনার।’
পেশাদার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের ঘাটতি প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী মানসম্মত সিনেমা তৈরি করা গেলে দর্শকদের আগ্রহ যেমন বাড়বে, তেমনি প্রযোজকদেরও আস্থা ফিরবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি বছরে অন্তত ১০০টি ভালো মানের সিনেমা বানাতে পারি, তাহলে ইন্ডাস্ট্রির চাকা ঘুরবে। এখন যে সমস্যাগুলো আছে, সেগুলো একদিনে তৈরি হয়নি, তাই একদিনে সমাধানও হবে না। এজন্য দরকার একটি শক্তিশালী বোর্ড বা সমন্বয় কমিটি, যারা গল্প নির্বাচন, প্রযোজনা ও বিতরণে পেশাদারিত্ব আনবে।’
মাসুমা রহমান তানি আরও বলেন, ‘একসময় বাংলাদেশে প্রযোজনা সংস্থাগুলো ছিল সিনেমার মেরুদণ্ড। এখন অনেক সংস্থা টিকে নেই, কারণ বাজার ব্যবস্থাপনা ও প্রেক্ষাগৃহের অবস্থা দুইই নড়বড়ে। কিন্তু যদি সরকার, প্রযোজক ও পরিচালকরা মিলে একটি পেশাদার কাঠামো তৈরি করেন, তাহলে সিনেমা আবারও বড় পরিসরে ফিরতে পারে।’
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘মানসম্মত গল্প, দক্ষ টিমওয়ার্ক আর সঠিক তদারকি থাকলে আমাদের দর্শকরা দেশীয় সিনেমার দিকেই ফিরে আসবে। পেশাদার প্রযোজনা সংস্থা গড়ে উঠলে এই পরিবর্তন খুব দ্রুত দেখা যাবে।’
তরুণ পরিচালক শাহাজাদা ইসলাম শায়ক শেয়ার বিজকে বলেন, এখনকার অনেক প্রযোজকই মূলত ব্যক্তিগত সম্পর্ক মেইনটেইন করতেই বেশি মনোযোগ দেন। ফলে প্রযোজনার মান ও পেশাদারিত্ব অনেক সময় উপেক্ষিত হয়। আসলে আমাদের দেশে এখনও প্রডাকশনকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হয় না, অথচ সিনেমা শিল্পের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত এটি। যদি প্রযোজনাকে পেশাদারভাবে দেখা হয়, তাহলে ভালো গল্প, দক্ষ নির্মাতা আর নতুন শিল্পীরাও সামনে আসতে পারবেন।
এ প্রজšে§র জনপ্রিয় উপস্থাপক ও অভিনেতা ইভান সাইর শেয়ার বিজকে বলেন, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা হলো পেশাদার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের অভাব। আমরা অনেক সময় সিনেমাকে কেবল নির্মাণের জায়গা থেকে দেখি, কিন্তু এটি আসলে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প এবং ব্যবসা। যার প্রতিটি ধাপে পরিকল্পনা, গবেষণা ও বিপণন কৌশল দরকার।
তিনি আরও বলেন, একজন অভিনেতা হিসেবে আমি দেখি, অনেক সিনেমা ভালোভাবে নির্মিত হয়, কিন্তু পেশাদার প্রযোজনার অভাবে সেটি দর্শকের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছাতে পারে না। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান শুধু অর্থের জোগানদাতা নয়, বরং কনটেন্ট উন্নয়ন, প্রচার ও বাজার ব্যবস্থাপনার মস্তিষ্ক। আমাদের দেশে এখন সময় এসেছে এমন প্রযোজনা হাউস গড়ে তোলার, যারা সিনেমাকে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে তৈরি করবে। শক্তিশালী ও পেশাদার প্রযোজনা কাঠামো ছাড়া চলচ্চিত্র শিল্পের স্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব নয়।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post