Print Date & Time : 31 January 2026 Saturday 12:09 pm

দুই দিনের ধর্মঘটের ডাক চট্টগ্রাম বন্দরে

নূর হোসেন মামুন, চট্টগ্রাম  : চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা (লিজ) দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বন্দরে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল এবং সাবেক বন্দর সিবিএ। শনি ও রোববার আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করা হবে। এ সময়ের মধ্যে বিষয়টির সমাধান না হলে বন্দর অচল করে দেওয়া হবে।

সংবাদ সম্মেলন করে সম্ভাব্য চুক্তি থেকে সরকারকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন সংগঠনটির নেতারা। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নেতা মো. হুমায়ুন কবীর, মোজাহের হোসেন শওকত, আনোয়ারুল আজিম রিংকু, আবুল কালম আজাদ, আবদুর রউফ লিটন, শেখ ছানুয়ার মিয়া, শামসুর রহমান স্বপন, আকতার হোসেন, মঞ্জুরুল পারেভজ সুমনসহ অনেকে।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি প্রক্রিয়া বৈধ বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে বিচারপতি জাফর আহমেদের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দিয়েছেন। এতে চুক্তিপ্রক্রিয়ার চলমান কার্যক্রম চালাতে আইনি কোনো বাধা থাকল না।

আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক।

এর আগে গত বছরের ৪ ডিসেম্বর বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের হাইকোর্ট বেঞ্চে এই বিষয়ে করা রিট আবেদনের ওপর  বিভক্ত রায় দিয়েছিলেন। বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ফাতেমা নজীব চুক্তি-সম্পর্কিত প্রক্রিয়া অবৈধ ঘোষণা করলেও এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ার রিট আবেদন খারিজ করে রায় দেন। পরে তখনকার প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য বিচারপতি জাফর আহমেদের একক বেঞ্চে পাঠিয়ে দেন।

রায়ের পর গতকাল দুপুরে বন্দর ভবনের সামনে বিক্ষোভ মিছিল করেন শ্রমিক দলের বিক্ষোভকারীরা। ওই মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচিতে কয়েকশ শ্রমিক কর্মচারী অংশ নেয়।

কর্মসূচি নিয়ে শ্রমিক দলের নেতা হুমায়ুন কবীর বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যদি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লিজ দিতে চুক্তি করার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা বাতিল না করে তাহলে আমরা শনিবার অপারেশনাল কার্যক্রম এবং রবিবার অফিস ও অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ রাখার কর্মসূচি ঘোষণা করেছি।

এর আগে সকালে এনসিটি ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা ও চুক্তি করার উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিবাদে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শ্রমিক দলের নেতা ইব্রাহীম খোকন বলেন, আগামী ১৩ দিন পরে আমরা একটা নির্বাচিত সরকার পাচ্ছি। কেন তড়িঘড়ি করে ১৩ দিন আগে আমাদের বন্দর দিয়ে দিতে হবে। আমরা নির্বাচিত সরকারের হাতে ছেড়ে দিই। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে যা করবে, আমরা তখন দেখব। নিশ্চয় একটি গণতান্ত্রিক সরকার গণমানুষের পক্ষে সিদ্ধান্ত দেবে। দেশের স্বার্থ চিন্তা করবে।

তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আরও বলেন, তড়িঘড়ি করে এটা করা আপনাদের কাজ না। আপনারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, রুটিন কাজ করে চলে যাবেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো বিদেশি কোম্পানি কাছে দিয়ে আপনারা কি বুঝাতে চান আমরা জানি না। আমরা বুঝি না।

বন্দর নিয়ে সরকারকে সতর্ক করে তিনি বলেন, তবে বলতে চাই, যা করেছেন করেছেন। বন্দর নিয়ে আর কিছু করবেন না। যদি করতে যান চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক কর্মচারীরা তাদের স্বার্থ রক্ষায়, বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষায় যে কোনো পদক্ষেপ নিব ইনশাল্লাহ। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনাগুলো এই এনসিটির আশেপাশেই। এই এনসিটিটাকে আমরা কেন বিদেশিদের কাছে দিয়ে দিতে চাই? আমরা যেটা দেখতে পাচ্ছি, সরকার পিপিপির অধীনে এ-জাতীয় চুক্তি করতে চায়। পিপিপির অধীনে কোনো বিদ্যমান স্থাপনা চুক্তি করা যায় না। এটা বিদ্যমান স্থাপনা, এটা চুক্তি করার কোনো বিধি সরকারের হাতে নেই।

তিনি অভিযোগ করেন, ‘সরকার গায়ের জোরে বিদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার জন্য চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দিতে চায়। এতে অর্থনৈতিকভাবে যেমন আমরা নিরাপত্তার দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হব, সার্বভৌমত্বও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সমুদ্রপথে শক্তি প্রদর্শনের যে বিষয়টা। চায়না, ইন্ডিয়া ও আমেরিকার যে সামরিক একটা অবস্থান তৈরি করা ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশের ওপর তাদের যে প্রচেষ্টা সেটার কারণেই বন্দর বিদেশিদের দিতে চায় সরকার। কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে নানাভাবে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছি। কোনোভাবেই আমাদের কথা তারা কর্ণপাত করছেন না। আদালতে মামলা চলছে। আদালতের ওপর প্রভাব বিস্তার করে তারা গায়ের জোরে চুক্তি করার সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছে। এই ধরনের পদক্ষেপ যদি আর এগিয়ে নেওয়া হয় চট্টগ্রাম বন্দরকে বন্ধ করে যে কোনো কর্মসূচি হাতে নিতে আমরা বাধ্য হব।’

বিক্ষোভকে ঘিরে চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কারশেড, প্রশাসনিক ভবন ও প্রবেশপথগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা গেছে। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং সরকারিভাবে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।