নিজস্ব প্রতিবেদক : একীভূত পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীরা গত দুই বছরের আমানতের ওপর কোনো মুনাফা পাবেন না। অর্থাৎ এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংকের আমানতকারীরা ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত জমা থাকা আমানতের ওপর কোনো মুনাফা পাবেন না। কেবল সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে মূল টাকা ফেরত পাবেন তারা।
গতকাল বুধবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংক রেজ্যুলেশন ডিপার্টমেন্ট থেকে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা একীভূত পাঁচ ব্যাংককে পাঠানো হয়। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আরিফ হোসেন খান গতকাল শেয়ার বিজকে বলেন, ‘গত দুই বছরে এই ব্যাংকগুলো খুব খারাপ অবস্থার মধ্যে দিয়ে গেছে। এ কারণে অবসায়ন স্কিমের আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
জানা গেছে, গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর মুনাফা না দেয়ার এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক পাঁচটিকে গতকালই চিঠি দিয়ে অবগত করে ব্যাংক রেজ্যুলেশন ডিপার্টমেন্ট। চিঠিতে স্বাক্ষর করেন ওই বিভাগের একজন যুগ্ম পরিচালক।
চিঠিতে বলা হয়, ‘অবসায়ন স্কিমের সুষম বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে এবং গভর্নরের অনুমোদন অনুসারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, সব আমানত অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্স ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বরের অবস্থানের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত সব আমানতের ওপর কোনো মুনাফা নেই বিবেচনা করে পুনর্গণনা করা হবে। অধিকন্তু, অনুমোদিত সিদ্ধান্তের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমানতের ওপর ‘কাটছাঁট’ প্রয়োগ করা হবে এবং সে অনুযায়ী আমানতের চূড়ান্ত ব্যালেন্স নির্ধারণ করা হবে।’
বিষয়টি উল্লেখ করে সব আমানত অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্স পুনর্গণনা করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে এবং রেজ্যুলেশন স্কিমের সুষ্ঠু বাস্তবায়নের জন্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আলোচিত পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে সম্প্রতি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নামে চালু হয়। নতুন বছরের প্রথম দিন থেকেই ওই ব্যাংকের গ্রাহকরা সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন করতে পারছেন।
গত ৫ জানুয়ারি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানত ফেরতের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসময় গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, সাধারণভাবে একটি নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘ সময় লাগে। কিন্তু সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে মাত্র দুই মাসের মধ্যেই লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই), ক্যাপিটালাইজেশন, সাইনবোর্ড স্থাপন ও লেনদেন শুরু করা সম্ভব হয়েছে। নতুন করে প্রণীত ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশের আওতায় ধাপে ধাপে এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ অনুযায়ী এরই মধ্যে রেজুলেশন স্কিম জারি করা হয়েছে। সেই নির্দেশনা অনুসারে আমানতকারীদের সঙ্গে ব্যাংকের লেনদেন চলছে। নতুন বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। প্রাথমিকভাবে সরকারি প্রতিনিধিদের দিয়ে বোর্ড গঠন করা হয়েছে এবং শিগগিরই স্বতন্ত্র পরিচালকসহ একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, একজন ব্যাংকার ও একজন আইন বিশেষজ্ঞ যুক্ত হয়ে পূর্ণাঙ্গ বোর্ড গঠিত হবে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আগামী ১৯ জানুয়ারি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন অনুষ্ঠান হবে।
পাঁচটি ব্যাংকের অনেক শাখায় এরই মধ্যে সাইনবোর্ড পাল্টে নতুন গঠিত হওয়া সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নামে ব্যানার টানানো হয়েছে।
যেসব সাধারণ গ্রাহকের হিসাবে আমানত দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আছে, তাদের অর্থ সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকবে। এই অর্থ যেকোনো সময় একবারে পুরোটা তোলা যাবে। আর যাদের হিসাবে দুই লাখ টাকার বেশি রয়েছে, তারা প্রতি তিন মাস অন্তর সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা করে দুই বছর পর্যন্ত তুলতে পারবেন।
গত ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক এ-সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, যারা এখনই আমানত তুলবেন না, তারা বাজারভিত্তিক মুনাফা পাবেন এবং প্রয়োজনে আমানতের বিপরীতে ঋণ নিতে পারবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, পাঁচটি ব্যাংকের সব চলতি, সঞ্চয়ী ও স্থায়ী আমানত এখন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আওতায় চলে গেছে। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগে স্থায়ী আমানতের টাকা তোলা যাবে না। তবে আমানতকারীরা তাদের বর্তমান জমা করা অর্থের বিপরীতে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ বা বিনিয়োগ সুবিধা নিতে পারবেন। আর নতুন করে জমা দেওয়া আমানতের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ বা বিনিয়োগের সুযোগ থাকবে।
তবে ৬০ বছরের বেশি বয়সি গ্রাহক অথবা ক্যানসার ও কিডনি ডায়ালাইসিসের মতো গুরুতর রোগে আক্রান্ত আমানতকারীদের জন্য স্কিমে মানবিক বিবেচনায় বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। তারা তাদের চিকিৎসার প্রয়োজনে নির্ধারিত সীমা বা সীমার বাইরে গিয়েও আমানতের অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন।
এর আগে একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার আওতায় পাঁচটি ব্যাংকের সব ধরনের চলতি, সঞ্চয়ী ও স্থায়ী আমানতসহ তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ, দায়-দেনা এবং আগের সব চুক্তি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। পরিশোধিত মূলধনের মধ্যে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা প্রদান করেছে।
