Print Date & Time : 29 April 2026 Wednesday 11:09 am

দুদকের শীর্ষ পর্যায়ে রদবদল আসন্ন!

রাশেদ রুবেল : সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) শীর্ষ পর্যায়ে সম্ভাব্য রদবদল। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে।

জানা যায়, ২০০৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি সাবেক সেনাপ্রধান হাসান মশহুদকে দুদক চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয় তৎকালীন ফখরুদ্দীন সরকার। তিনি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন।

এর আগে ২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর তৎকালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরো বিলুপ্ত করে কমিশন গঠন করা হয়। এই কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে বিচারপতি সুলতান হোসেন খান এবং কমিশনার পদে নিয়োগ পান অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞা ও মনিরউদ্দিন আহমেদ। তবে হাসান মশহুদের পদায়ন বিচারপতি সুলতান হোসেন খানকে পদচ্যুত করে বসানো হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে সেই হাসান মশহুদকেও দুদকের চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করতে হয়।

ফখরুদ্দীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হলে ২০০৯ সালে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ২ বছর ১ মাসের মাথায় চাপের মুখে পদত্যাগ করেন হাসান মশহুদ চৌধুরী। একইভাবে অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আবদুল্লাহ তিন বছরের পরই পদত্যাগ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠেছেÑবর্তমান দুদকের পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্ব পালনের সময়সীমা নিয়ে।

তবে আইন বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিকদের মতে, দুদক এখন স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত অধ্যাদেশের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া এখন দেশ পরিচালিত হবে নির্বাচিত সরকারের অধীনে। তারাও স্বচ্ছভাবে কাজ করার চেষ্টা করবে সে ক্ষেত্রে বর্তমান চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন পর্ষদের পরিবর্তন নাও হতে পারে বলে মন্তব্য অনেকের।

তবে নতুন সরকার গঠনের পর প্রতিটি নির্বাচিত সরকার তাদের পছন্দের ও দক্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদায়ন করেন বিভিন্ন দপ্তরে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও তাদের পছন্দের যোগ্য প্রার্থীদের পদায়ন করেছেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেছেন। তাদের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। আর এক্ষেত্রে সরকারের সব প্রতিষ্ঠানকেই সর্বোচ্চ সক্ষমতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। তাই সরকার যোগ্যদের পদায়ন করবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর সরকারের সঙ্গে যদি বর্তমান দুদকের পরিচলনা পর্ষদের কোনো ধরনের দূরত্ব থাকে তাহলে পবির্তন অনস্বীকার্য হিসেবে দেখছেন অনেকে।

তবে ইতোমধ্যে দুদককে স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত করার লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সংশোধিত অধ্যাদেশ জারি হয়েছে। নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, দুদক হবে একজন চেয়ারম্যানসহ অনধিক পাঁচ সদস্যের কমিশন। কমিশনারদের মেয়াদ কমিয়ে চার বছর করা হয়েছে। কমিশনে অন্তত একজন নারী কমিশনার এবং একজন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইটি) বিশেষজ্ঞ থাকা বাধ্যতামূলক। এছাড়া প্রতি ছয় মাস অন্তর কার্যক্রমের প্রতিবেদন অনলাইনে প্রকাশ করতে হবে। নতুন কাঠামো অনুযায়ী দুদককে উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতি ও মানি লন্ডারিং তদন্তে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন এবং বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে তদন্তের ক্ষমতাও প্রদান করা হয়েছে। এসব ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আইন এবং কাঠামোগত সংস্কার থাকলেও বাস্তব রাজনীতিতে শীর্ষ নেতৃত্বের প্রভাব এখনও কমে যায়নি। অতীত অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, সরকার পরিবর্তনের পর গুরুত্বপূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব পরিবর্তনের নজির রয়েছে। নতুন সরকারও প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক আস্থা যাচাই করতে চাইলে পদত্যাগ, বা পুনর্গঠনের মাধ্যমে শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তন করতে পারে।

বর্তমানে দুদকের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান ও মামলার অগ্রগতি নিয়ে সরকার ও প্রশাসনের দৃষ্টি কেন্দ্রীভূত রয়েছে। উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির অভিযোগ, পূর্ববর্তী সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক অনিয়মের তদন্তে কমিশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, নতুন সরকার যদি দুদকের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা জোরদার করার বার্তা দিতে চায়, তাহলে বর্তমান নেতৃত্ব বহাল রাখার সম্ভাবনাও আছে। আবার আস্থা বা কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য নতুন নেতৃত্ব আনার সিদ্ধান্তও অস্বাভাবিক নয়।

নতুন আইনি কাঠামো স্বায়ত্তশাসন, কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা এখনও বড় প্রভাবশালী।

এদিকে ২০২২ সালে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দুর্নীতি দমনের জন্য গঠিত দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নিজেই পুরোপুরি দুর্নীতিগ্রস্ত। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘দুর্নীতি দমন কমিশনের যে কর্মকর্তা অনেকগুলো দুর্নীতির মামলা দেখেছেন তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ সেই সময় আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, এ দেশের মানুষের স্বপ্ন ভেঙেচুরে শেষ করে দিয়েছে সরকার। আওয়ামী লীগ সরকার পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের যে আলাদা সত্তা, আলাদা পরিচিতি সেটা ধ্বংস করে ফেলেছে।

তবে নতুন আইন দুদককে স্বায়ত্তশাসিত ও স্বাধীন করার চেষ্টা করেছে; তবে বাস্তব রাজনীতির প্রভাবকে পুরোপুরি অতিক্রম করতে পারেনি। শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তন হবে কি না এখনও নিশ্চিত নয়। স্বাধীনতা, জবাবদিহিতা এবং কার্যকারিতার ভারসাম্য বজায় রেখে সরকার কী সিদ্ধান্ত নেবেÑসেটাই এখন দেখার বিষয়।

বর্তমান দুদক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন সাংবাদিকদের সঙ্গে একাধিক মতবিনিময় সভায় বলেছেন, দুদক স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করে চলেছে। দুদক রাজনৈতিক উদ্দেশে ব্যবহƒত হয় না বলে তিনি দাবি করেন।

এদিকে আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক শেয়ার বিজকে বলেন, বিগত দিনে যে পরিবর্তনের ঘটনাগুলো আমরা দেখতে পাচ্ছি তা কোনো নির্বাচিত সরকারের হাতে হয়নি। এখন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসছে। তারা গণতান্ত্রিকভাবে সরকারের অরগানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত ও স্বাধীনতা প্রদান করবেন। দুদকে এখনই পরিবর্তন আসবে বলে তিনি মনে করেন না বলে মন্তব্য করেন এই আইন বিশেষজ্ঞ।

দুদক সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে এবং ড. ইফতেখারুজ্জামানের নেতৃত্বে গঠিত কমিশনের পরামর্শ অনুযায়ী ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করেছে। ৫ সদস্যের কমিশন গঠন, আমূল আইনি পরিবর্তন এবং অনুসন্ধান ও তদন্তের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে সুপারিশে সংস্কার কমিশন ৪৭টি সুপারিশ জমা দিলেও, অধ্যাদেশে সম্পূর্ণ সুপারিশ বাস্তবায়িত না হওয়ায় এবং ‘সিলেকশন অ্যান্ড রিভিউ কমিটি’র মতো গুরুত্বপূর্ণ নজরদারি ব্যবস্থা বাদ পড়ায় টিআইবি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।