আনোয়ার হোসাইন সোহেল : পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত ফার্মাসিউটিক্যাল খাতের কোম্পানি এমবি ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসির ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের আর্থিক হিসাব বিবরণীর ওপর বহির্নিরীক্ষকের প্রতিবেদনে বিভিন্ন দুর্বলতা উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে শর্তসাপেক্ষ এসব মতামত (কোয়ালিফাইড ওপিনিয়ন) দেওয়া হয়েছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে কোম্পানিটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় প্রভিডেন্ট ফান্ডে বকেয়া, বিনিয়োগের তথ্য গোপন করা, ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড বিতরণের ক্ষেত্রে শ্রম আইন লঙ্ঘন করাসহ একাধিক দুর্বলতা ও অসংগতি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে কোম্পানিটির আয় কমেছে প্রায় ৫৯ দশমিক ২৩ শতাংশ।
নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানের ভাষ্য অনুযায়ী, আর্থিক বিবরণীতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অনিয়ম ও তথ্যগত ঘাটতি থাকায় তারা পূর্ণাঙ্গ ইতিবাচক মতামত দিতে পারেননি।
এমবি ফার্মাসিউটিক্যাল নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, স্বীকৃত প্রভিডেন্ট ফান্ডে প্রদেয় ১৯ লাখ ১৬ হাজার ৩৫৮ টাকা নিরীক্ষা বছরে পরিশোধ করা হয়নি। বিষয়টি শ্রম আইন ও আর্থিক বিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কোম্পানির বেঙ্গল মিট প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে মোট ৫ কোটি ২৬ লাখ ৪ হাজার ৬০৩ টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে অধিগ্রহণ করা ৪৬ লাখ ১০ হাজার টাকার শেয়ার পূর্ববর্তী কোনো আর্থিক বিবরণীতে রেকর্ড বা প্রকাশ করা হয়নি। তারপরও নিরীক্ষাধীন বছরে কোম্পানিটি ৬ লাখ ৫০ হাজার ৪৬০টি রাইট শেয়ার ইস্যুর বিপরীতে ৬৫ লাখ ৪ হাজার ৬০৩ টাকা পরিশোধ করেছে, কিন্তু এসব শেয়ার এখনো ইস্যু করা হয়নি। শেয়ার বিনিয়োগ, বিশেষ করে রাইট শেয়ার-সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্রও দেখানো হয়নি; কেবল বেঙ্গল মিট প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড কর্তৃক ইস্যুকৃত একটি সার্টিফিকেটের ফটোকপি নিরীক্ষক দলকে প্রদান করা হয়েছে।
চলতি বছরে কোম্পানি এই শেয়ারগুলোকে স্বীকৃতি দিয়েছে ইনভেস্টমেন্ট ইন শেয়ারস ডেবিট করে এবং লায়েবলিটিজ ফর আদার ফাইন্যান্স এমবি লিমিটেড ক্রেডিট করে। কিন্তু এভাবে বিলম্বে স্বীকৃতি দেওয়া আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান (আইএফআরএস) অনুযায়ী আর্থিক সম্পদের সময়মতো স্বীকৃতি ও পরিমাপের বিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এছাড়া বিনিয়োগকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা না হওয়ায় এখন পর্যন্ত কোম্পানি কোনো ডিভিডেন্ড আয় স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে এই বিনিয়োগের পুনরুদ্ধার করা ও মূল্যায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পূর্ববর্তী বছরগুলোয় এই বিনিয়োগ আর্থিক বিবরণীতে প্রকাশ না করার বিষয়ে নিরীক্ষক দলের কাছে এমবি ফার্মাসিউটিক্যাল কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।
এদিকে শ্রম আইন অনুযায়ী, ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড (ডব্লিইউপিপিএফ) বিতরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়নি বলে নিরীক্ষকরা জানিয়েছেন। তহবিলের একটি অংশ এখনো বিতরণ না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কোম্পানির নির্দিষ্ট প্রাপ্য ও প্রদেয় হিসাবের যথার্থতা যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় কনফার্মেশন সংগ্রহ করতে পারেননি নিরীক্ষকরা। ফলে পর্যাপ্ত নিরীক্ষা প্রমাণ পাওয়া সম্ভব হয়নি এবং কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোম্পানির বিরুদ্ধে একাধিক দাবি ও মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটি মামলা এখনো শ্রম আদালতে চলমান। দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিষ্ঠানে শ্রম অসন্তোষও দেখা দিয়েছে। এসব মামলার সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাব নির্ধারণ অনেকাংশে ব্যবস্থাপনার বিবেচনার ওপর নির্ভর করছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে রাজস্ব স্বীকৃতি, সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেন, মজুত মূল্যায়ন, স্থায়ী সম্পদ ব্যবস্থাপনা, আইএফআরএস ১৬ অনুযায়ী লিজ হিসাব, স্থগিত কর দায় এবং তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে।
এদিকে প্রতিবেদনে উত্থাপিত অনিয়ম ও দুর্বলতার বিষয়ে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী তানজিনা ফেরদৌস শেয়ার বিজকে বলেন, স্বীকৃত প্রভিডেন্ট ফান্ডের পরিশোধযোগ্য ১৯ লাখ ১৬ হাজার ৩৫৮ টাকা নিরীক্ষা বছরে একটি সাময়িক প্রক্রিয়াগত বিলম্বের কারণে পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। ওই অর্থ পরিশোধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ইতোমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে কোম্পানি পূর্ণ আইনানুগ কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এছাড়া ভবিষ্যতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিয়মিত পরিশোধ নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণ তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
গত পাঁচ বছরের ডিএসইর তথ্যমতে, কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) এবং নেট অ্যাসেট ভ্যালুতে (এনএভি) উল্লেখযোগ্য ওঠানামা দেখা গেছে। ২০২১ সালে কোম্পানিটি লোকসানে ছিল। ওই বছর শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ছিল ঋণাত্মক ৫ দশমিক ৪২ টাকা। একই সময়ে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) ছিল ১৮ দশমিক ৬৮ টাকা এবং কোম্পানির মোট ক্ষতি দাঁড়ায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
২০২২ সালে কোম্পানিটি ঘুরে দাঁড়ায়। এ বছর শেয়ারপ্রতি আয় হয় ৩ দশমিক ৩৬ টাকা, শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য বেড়ে দাঁড়ায় ২১ দশমিক ৯৬ টাকা এবং কোম্পানির মুনাফা হয় ৮০ লাখ টাকা।
২০২৩ সালে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় আরও বেড়ে ৩ দশমিক ৭৯ টাকা হয়। তবে এ সময় শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য কমে ৯ দশমিক ৭৩ টাকা দাঁড়ায়। এ বছর কোম্পানির মুনাফা ছিল ৯০ লাখ টাকা।
২০২৪ সালে শেয়ারপ্রতি আয় বেড়ে ৪ দশমিক ০৩ টাকা হয় এবং শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য দাঁড়ায় ১২ দশমিক ২৬ টাকা। একই সময়ে কোম্পানির মুনাফা হয় ৯৬ লাখ টাকা।
সর্বশেষ ২০২৫ সালে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় কমে ২ দশমিক ২১ টাকা হয়েছে। তবে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য বেড়ে ১৩ দশমিক ৪৭ টাকা দাঁড়িয়েছে। এ বছর কোম্পানির মুনাফা হয়েছে ৫৩ লাখ টাকা। সে হিসাবে গত পাঁচ বছরে এমবির আয় কমেছে ৫৯ দশমিক ২৩ শতাংশ।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এমবি ফার্মাসিউটিক্যালসে উদ্যোক্তা বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ৭৭ দশমিক ২৫ শতাংশ, প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী রয়েছেন ৫ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং ১৭ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে।
এমবি ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসির চেয়ারম্যান আজিজ মোহাম্মদ ভাই আশি ও নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রজগতের একজন আলোচিত ব্যক্তি ছিলেন। তার প্রযোজিত চলচ্চিত্রের চাইতেও তিনি ব্যক্তি হিসেবে বেশি আলোচিত-সমালোচিত ছিলেন। বিশেষ করে চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলায় অভিযুক্ত আসামিদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন তিনি। ২০২৪ সালে সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলার রায়ে আদালত আজিজ মোহাম্মদ ভাইকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। বর্তমানে তিনি পলাতক, দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। সম্প্রতি তিনি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্লক মার্কেটের মাধ্যমে পলাতক অবস্থায় অলিম্পিক কোম্পানির পাঁচ শতাংশের বেশি ১৫৫ কোটি টাকার শেয়ার ক্রয় করেছেন। এ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, কম দামে এসব শেয়ার ক্রয়ের মাধ্যমে গ্যাম্বলিং হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এমবি ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসির এসব অনিয়মের বিষয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসির) মুখপাত্র ও পরিচালক মো. আবুল কালাম শেয়ার বিজকে বলেন, যদি কোম্পানিটি শ্রম আইন লঙ্ঘন করে ও বিনিয়োগকারীদের থেকে কোনো তথ্য লুকিয়ে অন্যত্র বিনিয়োগ করে, সেক্ষেত্রে কমিশন তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেবে।
এদিকে গতকাল সোমবার কোম্পানির প্রতিটি শেয়ারদর ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৭৩ টাকা ২০ পয়সা। গত এক বছরের মধ্যে কোম্পানিটির শেয়ারদর সর্বোচ্চ উঠেছিল ৯৪৭ দশমিক ৯০ টাকা।
১৯৮৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন ৩০ কোটি টাকা। পরিশোধিত মূলধন ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এমবি ফার্মাসিউটিক্যালসের মোট শেয়ারসংখ্যা ২৪ লাখ।
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post