ওয়ালিউর রহমান ফরহাদ : চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের ১১ মাস বয়সি শিশু আবদুর রহমানকে ঢাকার একাধিক হাসপাতালে এনআইসিইউ খুঁজতে খুঁজতে শেষ পর্যন্ত ১৫ মার্চ রাতে ভর্তি করা হয় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে। সেখানে চার দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৯ মার্চ আবদুর রহমানের মৃত্যু হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, পোস্ট-মিজলস নিউমোনিয়ায় তার মৃত্যু হয়েছে।
আবদুর রহমানের স্বজন মাসুম বিল্লাহ শেয়ার বিজকে জানান, জšে§র ৯ মাস পরও সে হামের টিকা পায়নি, কারণ সেই সময়ে হাজীগঞ্জে ভ্যাকসিন ছিল না।
এর আগে ১৬ মার্চ ইনফেকশাস ডিজিজেস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক রোগী আইসিইউ না পেয়ে মারা যান। তার ঠিক পরের দিনই স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের হস্তক্ষেপে সেখানে আইসিইউ বেড চালু করা হয়।
চলতি বছরের শুরু থেকেই দেশে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক হারে বাড়তে শুরু করেছে। প্রতিদিনই আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ছে, ঢাকায় ইতোমধ্যে ২২ শিশুর মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে রাজধানীর মহাখালীর সংক্রমণ ব্যাধি হাসপাতাল।
এদিকে রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন দেশের শিশু ও সংক্রমণ ব্যাধি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসক ও নার্সরা। হামের প্রকোপ বেড়েছে সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জেও। সেখানের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে হাম-আক্রান্ত শিশুদের বিশেষ ইউনিট চালু করা হয়েছে। সর্বশেষ সেখানে চার শিশুর মৃত্যু এবং নতুন করে আরও ৩০০ শিশু ভর্তি হওয়ার সংবাদ পাওয়া গেছে। মার্চ মাস পর্যন্ত রাজশাহী বিভাগের সবচেয়ে বেশি পাবনায় ৩৩ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২০ জন এবং রাজশাহীতে ১০ জন নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে। বরিশালেও হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শয্যা সংকটে একই বেডে দু-তিনজন শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং এ পর্যন্ত ২৫০ জন শিশুর হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তির খবর পাওয়া গেছে। সেখানকার চিকিৎসকরা বলছেন, গতবারের তুলনায় এবার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, গত বছর এক্সপ্যান্ডেড প্রোগ্রাম অন ইমিউনাইজেশনের (ইপিআই) ভ্যাকসিন সংকট, টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের আন্দোলনের কারণে সময়মতো টিকা না পাওয়াই বর্তমান প্রাদুর্ভাবের অন্যতম প্রধান কারণ।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে নতুন করে ইপিআই ভ্যাকসিন কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ডেডিকেটেড হাসপাতাল প্রস্তুত, আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর বাড়ানো এবং বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
টিকার ঘাটতি ও কর্মসূচির বিঘ্নে ঝুঁকি: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. নিজাম উদ্দিন শেয়ার বিজকে বলেন, এক বছর ধরে ইপিআইয়ের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কখনো ভ্যাকসিনের সরবরাহ ছিল না, আবার কর্মীদের আন্দোলনের কারণে মাঠপর্যায়ে টিকাদান ঠিকমতো হয়নি। ফলে বহু শিশু টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
ডা. নিজাম উদ্দিন আরও জানান, ইপিআই কর্মসূচিতে প্রায় ৩৫ শতাংশ পদ শূন্য থাকাও কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আরেকটি কারণ।
তার মতে, আগেও হামের প্রাদুর্ভাব দেখা গেলেও দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে, তবে এবারের পরিস্থিতি বেশি উদ্বেগজনক। বর্তমানে একাধিক টিকার সংকট রয়েছে, যার মধ্যে হামের টিকাও আছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে টিকা না পাওয়া শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।
ডা. নিজাম উদ্দিন বলেন, দ্রুত ‘মিজলস ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইন’ শুরু করতে হবে। যেসব এলাকায় সংক্রমণ বেশি, সেখানে সবাইকে টিকার আওতায় আনতে হবে। আগে টিকা নেওয়া হয়েছে কি না, তা বড় বিষয় নয়। প্রয়োজনে অতিরিক্ত ডোজ দিতে হবে। বিশেষ ক্ষেত্রে নয় মাসের আগেও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের টিকা দেওয়া যেতে পারে।
ইপিআই কর্মসূচির আওতায় প্রত্যেক শিশুকে ৯ মাস বয়সে এমএমআর১ এবং ১৫ মাসে এমএমআর২ টিকা দেওয়া হয়।
সংকটের পেছনের কারণ: খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার সেক্টর প্রোগ্রাম থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা নেয়। এর ফলে ইপিআইয়ের আওতায় ভ্যাকসিন কেনা বন্ধ থাকে এবং ২০২৫ সালে দেশে ভ্যাকসিন সংকট দেখা দেয়।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. কামরুজ্জামান শেয়ারবিজকে বলেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হওয়া এবং ত্বকে ফুঁসকুড়ির মাধ্যমে প্রকাশ পায় এবং শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে দ্রুত ছড়ায়।
তিনি বলেন, ‘হামের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। বিশ্রাম, তরল খাবার এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল বা আইবুপ্রোফেন দিয়ে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা হয়।’
তিনি আরও জানান, সময়মতো টিকা না নেওয়া এবং কম ইমিউনিটির কারণে শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। বর্তমানে পোস্ট-মিজলস
নিউমোনিয়ার রোগীর চাপও বেড়েছে, বিশেষ করে ছয় মাস থেকে তিন বছর বয়সি শিশুদের মধ্যে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম,বরিশাল ও খুলনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে।
ইপিআই-এর উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ শেয়ারবিজকে বলেন, ‘হামের সংক্রমণ এখন নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই; প্রায় সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়ছে। সাধারণত বসন্তকালে শুরু হওয়া এ ধরনের প্রাদুর্ভাব প্রায় দুই মাস স্থায়ী হতে পারে।’ তিনি জানান, আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ইতোমধ্যে ১৫০০ ছাড়িয়েছে, তবে মৃত্যুর সঠিক তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নয় মাসের কম বয়সি শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণ বাড়ছে যাদের এখনো টিকা নেয়ার বয়স হয়নি।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় আক্রান্ত এলাকাগুলো চিহ্নিত করে ব্যাপক রিভ্যাকসিনেশন চালানো হতে পারে, এমনকি আগে টিকা নেওয়া শিশুদেরও অতিরিক্ত ডোজ দেওয়া হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ‘যেসব শিশু টিকা নেয়নি, তারাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। তাই অভিভাবকদের সময়মতো টিকা নিশ্চিত করতে হবে।’
হামের টিকাদান কৌশল নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সোমবার ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি কমিটির (নিটাক) বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
সবচেয়ে বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে ইনফেকশাস ডিজিজেস হসপিটালে। ১০০ শয্যার এ হাসপাতালে বর্তমানে প্রায় ১৩০ জন রোগী ভর্তি রয়েছে, ফলে করিডোর ও বারান্দাতেও চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এখানেও হামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালসহ বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডেও রোগীর চাপ অনেক বেশি বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার এম সাখাওয়াত হোসেন সাংবাদিকদের জানান, দেশে হামের ভ্যাকসিনের সংকট ছিল এবং এখনোও কিছুটা রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে ভ্যাকসিন কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালকে হামের জন্য ডেডিকেটেড করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি কঠোরভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে। প্রয়োজনে ডিএনসিসি কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ঢাকার বাইরেও আইসিইউ সুবিধা প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘ভেন্টিলেটরের ঘাটতি ছিল। ব্যক্তিগত উদ্যোগে কয়েকটি ভেন্টিলেটরের অর্থের ব্যবস্থা করেছি, নতুন ভেন্টিলেটর কেনা হবে নবজাতকদের জন্য। শিশু হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ভ্যাকসিন বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে কাজ করা হবে।’
