ইমতিয়াজ আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ : গার্মেন্টস শিল্পে সুখবর নেই। গত এক বছরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জসহ সারাদেশ থেকে এই খাতে পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৩৮ বিলিয়ন ৮২৪ দশমিক ৭০ মিলিয়ন ডলার; যা গত ২০২৪ সালের চেয়ে ৪ বিলিয়ন ডলার কম। ২০২৪ সালে পোশাক খাতে দেশের মোট রপ্তানি ছিল ৪২ বিলিয়ন ডলার। দেশের গার্মেন্টস শিল্পের অবস্থা ভালো নয়। প্রতিমাসেই পোশাক রপ্তানি কমছে। চরম হুমকির মধ্যে রয়েছে নারায়ণগঞ্জের গার্মেন্টস শিল্প। অধিকাংশ ফ্যাক্টরি আইসিইউ রোগীর মতো ধুঁকে ধুঁকে ভুগছে-এমন একটা অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।
সরকার পলিসিগত সাপোর্ট দিলে পোশাক শিল্পের অবস্থা ভালো হতে পারেÑজানিয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সরকার সাপোর্ট না দিলে আগামী অর্থবছরে রপ্তানি আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ শিল্পাঞ্চলে বর্তমানে ৪০০ গার্মেন্টস চালু রয়েছে। বন্ধ হয়েছে ১০০ কারখানা।
বিকেএমইএর পরিসংখ্যান মতে, গেল বছর জানুয়ারি মাসে দেশ থেকে রপ্তানি হয়েছে ৩ বিলিয়ন ৬৬৪ মিলিয়ন ডলার। ফেব্রুয়ারি মাসে একটু কমে রপ্তানি নেমে আসে ৩ বিলিয়ন ২৪৪ মিলিয়ন ডলারে। মার্চ মাসে রপ্তানি হয় ৩ বিলিয়ন ৪৪৯ মিলিয়ন ডলার। এপ্রিল মাসে রপ্তানি হয় ২ বিলিয়ন ৩৯৩ মিলিয়ন ডলার। মে মাসে রপ্তানি ৩ বিলিয়ন ৯১৯ মিলিয়ন ডলার। জুন মাসে ২ বিলিয়ন ৭৮৭ মিলিয়ন ডলার। জুলাই ৩ বিলিয়ন ৯৬২ মিলিয়ন ডলার। আগস্টে ৩ বিলিয়ন ১৬৮ মিলিয়ন ডলার। সেপ্টেম্বর মাসে ২ বিলিয়ন ৮৩৯ মিলিয়ন ডলার। অক্টোবর মাসে ৩ বিলিয়ন ১৯ মিলিয়ন ডলার। নভেম্বর মাসে রপ্তানি ৩ বিলিয়ন ১৪০ মিলিয়ন ডলার। বছর শেষে ডিসেম্বর মাসে রপ্তানি হয় ৩ বিলিয়ন ২৩৪ মিলিয়ন ডলার।
চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) রপ্তানির পরিমাণ নেমে এসেছে সাড়ে ৭ বিলিয়ন ডলারে। অথচ গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) নারায়ণগঞ্জ থেকে ৯ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পোশাক বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়েছে। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরে দেশের পোশাক রপ্তানি খাতে লোকসান হয়েছে দেড় বিলিয়ন ডলার।
বিকেএমইএর তথ্যমতে, নিট পোশাক রপ্তানি খাতে সারাদেশের ৪০ শতাংশ পোশাক রপ্তানি হয় নারায়ণগঞ্জ থেকে। তবে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক সহিংসতা, ডলারের মূল্য বৃদ্ধি, ডলার সংকট, দেশের পটপরিবর্তন ও ব্যাংক ঋণের অভাবে গত দুই বছরে নারায়ণগঞ্জে বিকেএমইএ ও বিজিএমইএর অন্তর্ভুক্ত অন্তত শতাধিক রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে কর্মহীন হয়ে পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন লক্ষাধিক শ্রমিক।
বিকেএমইএর পরিসংখ্যান বলছে, চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) রপ্তানির পরিমাণ নেমে এসেছে সাড়ে ৭ বিলিয়ন ডলারে। অথচ গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) নারায়ণগঞ্জ থেকে ৯ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পোশাক বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়েছে। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরে দেশের পোশাক রপ্তানি খাতে লোকসান হয়েছে দেড় বিলিয়ন ডলার। সাড়ে ৫-এর ওপরে থাকা জিডিপিও হ্রাস পেয়ে নেমে এসেছে সাড়ে ৪ শতাংশে। ফলে এর প্রভাব পড়ছে দেশের মূল অর্থনীতিতে। পোশার রপ্তানি খাতের সংকট মোকাবিলায় এই মুহূর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা কামনা করছেন বিকেএমইএর শীর্ষ কর্মকর্তারা।
ফতুল্লার রপ্তানিমুখী একটি পোশাক কারখানা নিট রেডিক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ আহমেদ এই সংবাদদাতাকে বলেন, ‘বিকেএমইএ ও বিজিএমইএর মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি, গত দুই বছরে প্রায় ২০০ গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এখন আমরা যারা মাঝারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছি, আমরাও নানা আশঙ্কায় রয়েছি। বায়াররা আমাদের আগের মতো অর্ডার দিচ্ছে না। পাশের দেশগুলোয় তারা চলে যাচ্ছে। আমাদের অর্ডারের পরিমাণ প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠান কতদিন চালিয়ে রাখতে পারব, সেটা নিয়ে আশঙ্কায় আছি।’
গার্মেন্ট ও সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি এম এ শাহীন বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি গত দুই বছর ধরে একের পর ছোট-বড় মাঝারি বিভিন্ন ক্যাটেগরির অন্তত দুই থেকে আড়াইশ গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে গেছে। পোশাক কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লক্ষাধিক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। জীবন-জীবিকার তাগিদে তাদের কেউ অটোরিকশা চালাচ্ছেন, কেউ ফুটপাতে হকারগিরি করছেন। সেখানেও নানা বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন বেকার শ্রমিকরা। তারা নানা ধরনের অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়বেন। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও চরম অবনতি ঘটবে।’
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জ জেলা উপমহাপরিদর্শক রাজীব চন্দ্র ঘোষ জানান, ‘কারখানা বন্ধ হওয়ার পূর্বে আমাদের অবহিত করা হয় না। শ্রমিকরা যখন আন্দোলন শুরু করেন, তখন আমরা বিষয়টি জানি।’
ব্যাংকের অসহযোগিতা, কাস্টমস জটিলতা, বিদেশি বায়ারদের অনাগ্রহ, শ্রমিক অসন্তোষ ও জ্বালানি সংকটসহ নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে নারায়ণগঞ্জে গত দুই বছরে বন্ধ হয়ে গেছে রপ্তানিমুখী শতাধিক পোশাক কারখানা। এতে কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন লক্ষাধিক শ্রমিক। চলতি অর্থবছরে এ অবস্থায় চালু কারখানা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকরা। অবিলম্বে বন্ধ কারখানাগুলো চালু করে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধসহ তাদের কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনা না গেলে অপরাধ প্রবণতা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের।
একে একে শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জের গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ সেক্টরের বিরূপ প্রভাব পড়েছে সুতার ব্যবসার ওপর। ব্যাংকের সাহায্য না পাওয়া, কাস্টমসের জটিলতা, বিদেশি ক্রেতাদের আগ্রহের অভাব, শ্রমিকদের অসন্তোষ এবং জ্বালানি সংকটের মতো নানা প্রতিবন্ধকতার ফলে নারায়ণগঞ্জে গত দুই বছরে রপ্তানিমুখী শতাধিক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে লক্ষাধিক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।
নিট পোশাক রপ্তানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিকেএমইএ সূত্রে জানা যায়, সারাদেশে মোট পোশাক রপ্তানির ৪০ শতাংশ নারায়ণগঞ্জ থেকে হয়। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ডলারের মূল্য বৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের অভাব ও অন্যান্য কারণে গত দুই বছরে শতাধিক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে লক্ষাধিক শ্রমিক কর্মহীন জীবন কাটাচ্ছেন। অন্যদিকে, শ্রমিকদের নানা কার্যকলাপের মধ্যে অটোরিকশা চালানো, ফুটপাতে হকারি করতে দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
গার্মেন্ট ও সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ জেলার নেতারা বলেন, ‘বিগত দুই বছরে শতাধিক গার্মেন্টস বন্ধ হয়েছে। কতক্ষণ এভাবে চলবে? সরকারকে বন্ধ কারখানাগুলো খুলে শ্রমিকদের ফেরত আনা উচিত। তা না হলে অপরাধ কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাবে।’ তবে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি মোকাবিলার আশ্বাস দিয়েছে জেলা কলকারখানা অধিদপ্তর ও বিকেএমইএ কর্তৃপক্ষ।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post