আরিফুল ইসলাম রাজিন : আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশ গঠনে নিজেদের পরিকল্পনা ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নিয়ে হাজির হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। ২০ জানুয়ারি দেশের দুটি শীর্ষ রাজনৈতিক দল বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি জনগণের সামনে তুলে ধরেছে।
বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনায় কাঠামোগত সংস্কার গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণ, জনজীবনের মৌলিক সংকট মোকাবিলায় আটটি খাতভিত্তিক পরিকল্পনা করেছে। খাতগুলো হলোÑফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা, ক্রীড়া, পরিবেশ ও জলবায়ু সহনশীলতা এবং ধর্মীয় নেতাদের মর্যাদা ও কল্যাণ। অপরদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দেশ গঠনে তরুণ গ্র্যাজুয়েটদের এবং দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের সুদবিহীন ঋণ প্রদান, ১৫ লাখ ফ্রিলান্সার তৈরি, ৫০ লাখ জব অ্যাকসেস, মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ও পুষ্টির সামাজিক নিরাপত্তা প্রদান, বিশ্বের সবচেয়ে
বড় মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা, ৬৪ জেলায় ৬৪টি বিশেষায়িত হাসপাতাল তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
দল দুটির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি কতটুকু বাস্তবসম্মত এবং তা জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম কিনা তা নিয়ে জনমহলে চলছে আলোচনা-সমালোচনা।
দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক দল বিএনপি অসচ্ছল ও নিম্ন আয়ের দরিদ্র পরিবারকে স্বাবলম্বী করতে বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে ফ্যামিলি কার্ডের। দেশের প্রায় চার কোটি পরিবারের মধ্যে প্রথম ধাপে ৫০ লাখ পরিবারকে এই কার্ডের আওতায় আনতে চায় দলটি। প্রত্যেকটি পরিবারের একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর নামে এই কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে ২ হাজার বা ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যে খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হবে।
কৃষকদের জন্য প্রস্তাবিত কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সার বীজ ও কীটনাশকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করবে বিএনপি। পাশাপাশি প্রণোদনা, সহজ শর্তে ঋণ এবং বিমা সুবিধা থাকবে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শহর ও গ্রামের নাগরিকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য খাতে বিএনপি লাখ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দুর্নীতিমুক্ত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ২৪ ঘণ্টা বিনামূল্যে ওষুধ প্রদান এবং উন্নত বেসরকারি হাসপাতালে সরকারি সহায়তায় প্রাণঘাতি ও ব্যয়বহুল রোগের চিকিৎসা প্রদান করবে দলটি। তাছাড়া মাতৃকালীন সেবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ বিএনপি।
শিক্ষা খাতে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ পাঠ্যক্রম চালু এবং কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নিয়েছে দলটি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা প্রদান ও দক্ষ জনবল গঠনে বিদেশি শিক্ষা কার্যক্রমের পরিকল্পনা নিয়েছে দলটি।
ক্রীড়া খাতকে শক্তিশালী ও সমৃদ্ধিশীল করতে চতুর্থ শ্রেণি থেকে ক্রীড়া শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের মাধ্যমে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান, ৬৪ জেলায় ইনডোর সুবিধাসহ স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণ এবং প্রতিটি বিভাগে বিকেএসপির শাখা খোলার পরিকল্পনা তুলে ধরেছে দলটি।
পরিবেশ খাতে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, খাল খনন বা পুনঃখননের মাধ্যমে পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা, তিস্তা ও পদ্মা ব্যারাজের প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং ২৫ কোটি গাছ রোপণের অঙ্গীকার করেছে দলটি। এছাড়া প্রথমবারের মতো ধর্মীয় নেতাদের কল্যাণে মাসিক সম্মানী প্রদান ইমাম-মুয়াজ্জিন কল্যাণ ট্রাস্ট শক্তিশালী কারণসহ অন্যান্য ধর্মের উপাসনালয়ের প্রধানদের জন্য অনুরূপ সুবিধা প্রদান করবে দলটি।
দেশের আরেক শীর্ষ রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী দেশ গঠনে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে ঘোষণা করেছে, তারা ক্ষমতায় গেলে জনগণের সুবিধা ও সেবার মান বাড়াতে স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড চালু করবে। যার মাধ্যমে এনআইডি, টিআইএন, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা নিশ্চিত করবে। জনগণের ব্যয় কমাতে দীর্ঘমেয়াদে ভ্যাট ১৯ শতাংশ ও কর ১০ শতাংশে নিয়ে আসবে। শিল্পে স্থিতিশীলতা ফেরাতে তিন বছর গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির দাম না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।
বন্ধ থাকা কলকারখানা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে চালু এবং ১০ শতাংশ মালিকানা শ্রমিকদের দেওয়া, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের জন্য সুদমুক্ত ঋণ সুবিধা প্রদান, পাঁচ বছরের কম বয়সী ও ৬০ বছরের বেশি বয়সী নাগরিকদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং ৬৪ জেলায় ৬৪ বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে তরুণদের ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করার চেষ্টা চালিয়েছে জামায়াত।
ক্ষমতায় গেলে ৫ লাখ বেকার গ্র্যাজুয়েটকে এবং মেধা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে এক লাখ শিক্ষার্থীর জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা করে সুদবিহীন শিক্ষা ঋণ প্রদান, প্রতিবছর বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য ১০০ শিক্ষার্থীকে সুদমুক্ত শিক্ষা ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি।
দক্ষ জনশক্তি ও জব প্লেসমেন্টের জন্য নতুন মন্ত্রণালয় সৃষ্টি, ৫ বছরে এক কোটি তরুণকে বাজারভিত্তিক দক্ষতার প্রশিক্ষণ প্রদান, প্রত্যেক উপজেলায় গ্র্যাজুয়েটদের জন্য ‘ইয়ুথ টেক ল্যাব’ স্থাপন, প্রতিটি জেলায় ‘জব ইয়ুথ ব্যাংক’ গঠন করে ৫ বছরে ৫০ লাখ জব এক্সেস নিশ্চিত করা, ৫ লাখ উদ্যোক্তা তৈরি, ১৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার তৈরি এবং স্বল্পশিক্ষিত যুবকদের জন্য উপযোগী দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জামায়াত।
তথ্যপ্রযুক্তি বা আইটি খাত উন্নয়নে ভিশন ২০৪০ ঘোষণা করেছে দলটি। ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ লাখ আইসিটি-সংক্রান্ত কর্মসংস্থান, ফ্রিল্যান্সার ও ডিজিটাল রপ্তানির জন্য ন্যাশনাল পেমেন্ট স্থাপন, আইসিটি খাতে ৫০০ কোটি ডলার রপ্তানি আয় ও এই খাতে সরকারের ১৫০ কোটি ডলার ব্যয় সাশ্রয় করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে দলটি। জামায়াত শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্যমাত্রার কথা জানিয়েছে। দক্ষ জনশক্তির মাধ্যমে প্রবাসীর আয় দুই থেকে তিনগুণ বৃদ্ধি করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে দলটি।
শীর্ষ দুটি দলের এই প্রতিশ্রুতিগুলো দেশের উন্নয়নে ও জনগণের জীবনমানের কতটুকু পরিবর্তন করবে এবং প্রতিশ্রুতিগুলোর সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। তাছাড়া জনজীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ খাত স্থান করে পায়নি উভয় দলের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় অনেক স্বাবলম্বী পরিবারও এই কার্ডের জন্য আবেদন করবে। যার ফলে সরকারের ব্যয় বাড়বে। বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেলে তাদের উচিত দুর্নীতিবিরোধী কঠোর আইন প্রণয়ন করে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা। তাহলে একদিকে দেশের অসহায় পরিবারগুলো উপকৃত হতো, অন্যদিকে সরকারের বিপুল অর্থ সাশ্রয় হতো, যা দেশ গঠনের অন্যান্য পরিকল্পনায় ব্যয় করা যেত। বিএনপি কৃষক কার্ড প্রদানের যে পরিকল্পনা নিয়েছে তার মাধ্যমে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় হ্রাস এবং ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হলেও ফসল বিক্রি করার সময় ন্যায্য দাম পেতে এই কার্ড কীভাবে সহায়তা করবে তা নিয়ে কৃষকের মনে প্রশ্নের জš§ দিয়েছে।
বিএনপির ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খননের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তবে চরম বাস্তবতা হচ্ছে ঢাকার বেশির ভাগ খাল ভরাট করে দখলে রেখেছে প্রভাবশালীরা। যাদের মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিএনপির নিজ দলের নেতাকর্মী ও দেশের প্রভাবশালী শিল্পপতি গোষ্ঠী। এসব খাল দখল করে বস্তি, কারখানা গড়ে উঠেছে। যার মধ্যে অনেক মানুষের জীবিকা ও বাসস্থান নির্ভর করছে। এ অবস্থায় ঢাকার খালগুলো পুনরুদ্ধার বিএনপির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জিং বিষয়। বিএনপি এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সব খাল পুনরুদ্ধার করতে পারবে কিনা এই নিয়েও জনগণের ভিন্নমত রয়েছে।
অপরদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে তরুণদের প্রাধান্য দিয়েছে। তরুণ গ্র্যাজুয়েটদের সুদ মুক্ত ঋণ প্রদান, ফ্রিল্যান্সার তৈরি, ইয়ুথ টেক ল্যাব, জব ইউথ ব্যাংক গঠনের পরিকল্পনা নিয়েছে। তবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিস্তারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেনি দলটি। তাদের এই পরিকল্পনা কীভাবে তরুণদের কর্মক্ষেত্র নিশ্চিত করবে সেই পরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করেনি। ফলে তাদের পরিকল্পনা তরুণদের ভাগ্য বদলে সহায়ক হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে জনমনে।
ফ্যাসিবাদের আমলে পরপর তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের পর দেশের জনগণ আবারও নিজের ভোট নিজে দিতে পারবে। নিশ্চিতভাবেই মানুষ তাদের পছন্দের প্রার্থীকে বেছে নিতে আগ্রহী এবং এই নির্বাচনটি বিগত নির্বাচনে থেকে আলাদা। কারণ মানুষ দল নয়, পরিকল্পনা ও যোগ্য ব্যক্তি দেখে নিজের মত দানে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা ঠিক রাখা এবং মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে এবং নিরাপদভাবে ভোট দিতে পারে সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে।
শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post