Print Date & Time : 19 April 2026 Sunday 8:29 am

ধর্ম দেয় নৈতিক কাঠামো ও সংস্কৃতি দেয় আত্মপরিচয়

. মতিউর রহমান : একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের ঠিক মাঝপথে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ আজ এক অনন্য এবং জটিল মনস্তাত্ত্বিক পথ অতিক্রম করছে। ২০২৬ সালের এই বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা যদি আমাদের চারপাশের সমাজব্যবস্থার দিকে নিবিড়ভাবে লক্ষ করি, তবে দেখব আমাদের প্রতিদিনের যাপনে তিনটি সমান্তরাল ধারা—ধর্ম, সংস্কৃতি ও আধুনিকতা একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে এক অদ্ভুত অথচ অনিবার্য টানাপোড়েন তৈরি করছে। এই টানাপোড়েন কেবল পোশাক-আশাক বা খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি আমাদের জাতীয় পরিচয়, নৈতিক মানদণ্ড এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার মূলে আঘাত করছে। সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট থেকে এই বিবর্তনকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটি দেশ যখন অতি দ্রুত কাঠামোগত উন্নয়নের মহাসড়কে প্রবেশ করে, তখন তার চিরন্তন মূল্যবোধের সঙ্গে নতুন বিশ্বব্যবস্থার একধরনের সংঘাত তৈরি হয়, যাকে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় রূপান্তরকালীন সংকট হিসেবে অভিহিত করা যায়।

সমাজবিজ্ঞানী উইলিয়াম ওগবার্ন তার বিশ্বখ্যাত ‘সাংস্কৃতিক ব্যবধান’ বা ‘কালচারাল ল্যাগ’ তত্ত্বে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, একটি সমাজের বস্তুগত সংস্কৃতি যেভাবে রকেট গতিতে এগিয়ে যায়, অবস্তুগত সংস্কৃতি ঠিক সেভাবে তাল মেলাতে পারে না। ২০২৬ সালের বাংলাদেশে এই তত্ত্বের সার্থকতা আজ প্রদীপ্ত হয়ে উঠেছে। আমাদের হাতে আজ অত্যাধুনিক স্মার্টফোন আছে, ঘরে ঘরে উচ্চগতির ইন্টারনেট পৌঁছেছে, আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে আলোচনা করছি, আমাদের অর্থনীতি ক্যাশলেস হওয়ার পথে কয়েক ধাপ এগিয়ে গেছে। কিন্তু এই যে অভাবনীয় প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, এর সঙ্গে আমাদের মানসিকতা, বিশ্বাস ও আচার-আচরণ কি সমান্তরালভাবে আধুনিক হতে পেরেছে? ওগবার্নের মতে, যখন বস্তুগত উন্নতি এবং মানসিক চেতনার মধ্যে এই বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়, তখন সমাজে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অস্থিরতা দেখা দেয়। বর্তমান বাংলাদেশে আমরা যে অসহিষ্ণুতা বা পরিচয়ের সংকট দেখি, তা মূলত এই সাংস্কৃতিক ব্যবধানেরই এক চরম বহিঃপ্রকাশ।

আধুনিকতা সম্পর্কে ধ্রুপদী সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবারের একটি শক্তিশালী ধারণা ছিল, যাকে তিনি ‘জগতের মোহমুক্তি’ বা ‘ডিসেনচ্যান্টমেন্ট অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ বলে অভিহিত করেছিলেন। ওয়েবার মনে করেছিলেন, বিজ্ঞান ও যুক্তির অগ্রযাত্রার ফলে মানুষের জীবন থেকে অতিপ্রাকৃত বিশ্বাস বা ধর্মের প্রভাব ধীরে ধীরে হ্রাস পাবে এবং মানুষ প্রতিটি বিষয়কে কেবল যুক্তির মাপকাঠিতে বিচার করবে। তবে বাংলাদেশের বর্তমান সমাজচিত্র ওয়েবারের এই ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ দেয়। ২০২৬ সালের বাংলাদেশে আধুনিকতা এবং প্রযুক্তি তুঙ্গে থাকা সত্ত্বেও মানুষের মধ্যে ধর্মের প্রতি ঝোঁক কমেনি, বরং বেড়েছে। তবে এই বেড়ে ওঠার ধরনটি সমাজতাত্ত্বিকভাবে কৌতূহলোদ্দীপক। আধুনিক মানুষ এখন প্রযুক্তির সুযোগ নিয়ে ধর্মের প্রচার করছে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ধর্মীয় বিতর্ক উসকে দিচ্ছে। এখানে আধুনিকতা ধর্মকে বিসর্জন দেয়নি, বরং ধর্ম আধুনিকতাকে নিজের বাহন হিসেবে ব্যবহার করছে। এই যে ধর্ম ও আধুনিকতার সহাবস্থান, তা অনেক সময় সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে যখন আধুনিক জীবনবোধের উদারতা ধর্মের রক্ষণশীল ব্যাখ্যার মুখোমুখি দাঁড়ায়।

এমিল ডুর্খেইম যখন ধর্মের সমাজতত্ত্ব নিয়ে লিখেছিলেন, তখন তিনি ধর্মকে দেখেছিলেন একটি ‘সামাজিক সংহতি’ বা ‘সোশ্যাল সলিডারিটি’র উৎস হিসেবে। ডুর্খেইমের মতে, ধর্ম মানুষকে একটি নির্দিষ্ট নৈতিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে যা সমাজের ঐক্য বজায় রাখে। ২০২৬ সালের বাংলাদেশে যেখানে সমাজকাঠামো দ্রুত ভেঙে একক পরিবারে পরিণত হচ্ছে, যেখানে মানুষের মধ্যে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা বাড়ছে, সেখানে ধর্ম অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের পরিচয় এবং ঐক্যের শেষ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠছে। কিন্তু বিশ্বায়নের এই যুগে যখন পশ্চিমা আধুনিকতা তার অমোঘ আকর্ষণ নিয়ে বাঙালির অন্দরমহলে হানা দেয়, তখন সেই সংহতিতে ফাটল ধরে। আধুনিকতা আমাদের শেখায় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, অর্থাৎ ‘আমিই সব’। অন্যদিকে ধর্ম ও আমাদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি আমাদের শেখায় ‘আমরা’ বা সামষ্টিকতা। এই ব্যক্তিবাদ বনাম সামষ্টিকতার লড়াইটিই হলো বর্তমান বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দু।

সংস্কৃতি একটি প্রবহমান নদীর মতো হলেও আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে তা এখন এক সংকীর্ণ খালের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি। একদিকে হাজার বছরের লোকজ ঐতিহ্য—নবান্ন, পহেলা বৈশাখ, বাউল গান আর লোকগাথা, অন্যদিকে আকাশ সংস্কৃতির অবারিত দ্বার দিয়ে আসা বৈশ্বিক পণ্যমুখী সংস্কৃতি। সমাজবিজ্ঞানী জর্জ রিটজার একে ‘ম্যাকডোনালাইজেশন’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। রিটজারের মতে, বিশ্বায়নের ফলে সারা বিশ্বের সংস্কৃতি আজ একই ছাঁচে ঢালাই হচ্ছে, যেখানে স্থানীয় স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশ যখন কোরিয়ান সংগীত বা পশ্চিমা জীবনধারার সঙ্গে নিজেদের মেলাচ্ছে, তখন তারা নিজেদের শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এই বিচ্ছিন্নতাবোধ বা ‘এলিয়েনেশন’ তাদের মধ্যে এক ধরণের শূন্যতা তৈরি করছে, যা তারা পূরণ করার চেষ্টা করছে হয় উগ্র আধুনিকতা দিয়ে, না হয় ধর্মের একপক্ষীয় ব্যাখ্যা দিয়ে। ফলে সংস্কৃতির যে উদার রূপটি একসময় বাঙালির পরিচয় ছিল, তা আজ কোণঠাসা।

এই টানাপোড়েনের আরেকটি বড় ক্ষেত্র হলো সমাজবিজ্ঞানী এরভিং গফম্যানের ‘ড্রামাটার্জি’ বা জীবনকে একটি রঙ্গমঞ্চ হিসেবে দেখার তত্ত্ব। গফম্যানের মতে, মানুষ সমাজের সামনে একটি নির্দিষ্ট মুখচ্ছবি বা ‘ফ্রন্ট স্টেজ’ বজায় রাখে। ২০২৬ সালের সোশ্যাল মিডিয়া চালিত এই সমাজে এই মুখচ্ছবি বজায় রাখার লড়াইটা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। একজন বাঙালি নাগরিক ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে অত্যন্ত আধুনিক ও প্রগতিশীল হিসেবে নিজেকে তুলে ধরছেন, কিন্তু পারিবারিক বা ব্যক্তিগত জীবনে তিনি হয়তো অত্যন্ত রক্ষণশীল ও প্রথাগত। এই যে দ্বৈত জীবনযাপন, তা মানুষের ভেতরে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব তৈরি করছে। ধর্মের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। মানুষ নিজের প্রোফাইলে ধর্মীয় উদ্ধৃতি দিচ্ছে, অথচ ব্যক্তিগত জীবনে সেই নৈতিকতার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে না। আধুনিকতা যখন কেবল লোকদেখানো আচারে পরিণত হয় এবং ধর্ম যখন কেবল পরিচয়ের রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন সংস্কৃতির যে অন্তঃসারশূন্যতা তৈরি হয়, তার ভার বহন করতে হচ্ছে পুরো সমাজকে।

 

জিগমুন্ট বাউমান তার ‘লিকুইড মডার্নিটি’ বা ‘তরল আধুনিকতা’ তত্ত্বে বলেছিলেন, আধুনিক যুগে কোনো কিছুই স্থায়ী নয়—সবকিছুই পরিবর্তনশীল এবং অস্থির। বাংলাদেশের বর্তমান সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা ঠিক এই তরল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মানুষের সম্পর্ক, কর্মসংস্থান, এমনকি ধর্মীয় বিশ্বাসও এখন আগের মতো অটল নেই। এই অস্থিরতা মানুষকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যখন সবকিছুই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তখন মানুষ তার আদি পরিচয় বা ধর্মের দিকে আরও বেশি ঝুঁকে পড়ে স্থায়িত্বের সন্ধানে। ফলে আধুনিকতা মানুষকে মুক্তি দেওয়ার কথা বললেও শেষ পর্যন্ত মানুষ এক ধরনের আধ্যাত্মিক সংকটে ভুগছে। এই সংকটের সমাধান হিসেবে ধর্মের উগ্র প্রকাশ অনেক সময় কাম্য মনে হয় অনেকের কাছে, যা আদতে সমাজতাত্ত্বিক বিচারে এক ধরনের পশ্চাৎমুখী পদক্ষেপ।

নারীর অবস্থান ও ক্ষমতায়নের প্রশ্নটি এই টানাপোড়েনে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। ২০২৬ সালের বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ অভাবনীয়ভাবে বেড়েছে, শিক্ষা থেকে শুরু করে রাজনীতি—সবখানেই নারী তার যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছে। এটি আধুনিকতার এক সফল ফল। কিন্তু সমাজতাত্ত্বিক বিচারে পিতৃতান্ত্রিক মনস্তত্ত্ব এখনো পুরোপুরি আধুনিক হতে পারেনি। কর্মজীবী নারী যখন ঘরে ফেরেন, তখন সমাজ তার কাছে প্রাচীন গৃহবধূর ভূমিকা প্রত্যাশা করে। এখানে আধুনিক কর্মজীবন আর প্রথাগত সামাজিক প্রত্যাশার মধ্যে যে সংঘাত, তা নারীর জন্য এক বিশাল মানসিক চাপ তৈরি করছে। ধর্ম ও সংস্কৃতির নাম করে অনেক সময় এই আধুনিকায়নকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত লিঙ্গীয় বৈষম্যকে আরও উসকে দেয়। আধুনিকতা ও নারী অধিকারের এই দ্বৈরথ ২০২৬ সালের বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সামাজিক সংকট।

বিশ্বায়ন ও আধুনিকতা আমাদের অনেক কিছু দিলেও বিনিময়ে কেড়ে নিয়েছে আমাদের সামাজিক প্রশান্তি ও নৈতিক স্থিতিশীলতা। কার্ল মার্ক্স যখন বলেছিলেন, ‘সবকিছুই বাষ্পীভূত হয়ে যায়’ (All that is solid melts into air), তখন তিনি পুঁজিবাদের প্রভাবে পুরোনো ব্যবস্থার বিলুপ্তির কথা বলেছিলেন। বর্তমান বাংলাদেশেও আমরা দেখছি আমাদের পুরোনো মূল্যবোধগুলো পুঁজিবাদের দাপটে ফিকে হয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি উৎসব আজ উৎসবে সীমাবদ্ধ নেই, তা পণ্যে পরিণত হয়েছে। সংস্কৃতি এখন কেবল বিজ্ঞাপনের মাধ্যম। এই পণ্যনির্ভর আধুনিকতা মানুষের নৈতিকতাকে শিথিল করে দিচ্ছে। অন্যদিকে ধর্ম অনেক সময় এই অবক্ষয় রোধে বর্ম হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করলেও রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত স্বার্থে ধর্মের অপব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ধর্মীয় বিশ্বাসের এই সংঘাত থেকে উত্তরণের পথটি সমাজবিজ্ঞানী ইয়ুর্গেন হাবারমাসের ‘কমিউনিকেটিভ অ্যাকশন’ বা সংলাপধর্মী কার্যক্রমের মধ্যে নিহিত থাকতে পারে। হাবারমাস মনে করতেন, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে যদি যৌক্তিক সংলাপ স্থাপিত হয়, তবে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। আমাদের বর্তমান সংকটের মূলে রয়েছে চরম অসহিষ্ণুতা। আধুনিকতার অনুসারীরা মনে করছেন ধর্মীয় বিশ্বাস মানেই পিছিয়ে পড়া, আবার ধর্মীয় ভাবধারার মানুষ মনে করছেন আধুনিকতা মানেই ধর্মের বিনাশ। এই দুই প্রান্তিক অবস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের সংস্কৃতি। আমাদের এমন একটি সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে দেশের উন্নতির জন্য, কিন্তু নৈতিক ভিত্তি হবে আমাদের ঐতিহ্য ও ধর্মের মানবিক শিক্ষা। আধুনিকতা মানেই পশ্চিমি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং আধুনিকতা হলো নিজের সত্তাকে সমুন্নত রেখে বিশ্ব নাগরিক হওয়া।

২০২৬ সালের বাংলাদেশ কেবল একটি উন্নয়নশীল দেশ নয়, এটি একটি রূপান্তরের পরীক্ষাগার। এখানে ধর্ম, সংস্কৃতি ও আধুনিকতা প্রতিনিয়ত একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে নতুন এক সামাজিক রূপ তৈরি করছে। এই রূপটি কি শেষ পর্যন্ত একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ হবে, নাকি এটি আরও বড় কোনো সংকটের জন্ম দেবে, তা নির্ভর করছে আমাদের নেতৃত্বের দূরদর্শিতা এবং নাগরিক সচেতনতার ওপর। সমাজতাত্ত্বিক বিচারে এই টানাপোড়েন অনিবার্য, কিন্তু এই সংঘাত যেন সামাজিক বিচ্ছেদে রূপ না নেয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। আধুনিকতার চাকচিক্য যেন আমাদের আধ্যাত্মিক সম্পদকে গ্রাস না করে এবং ধর্মের কঠোরতা যেন মানুষের সৃজনশীলতাকে গলা টিপে না ধরে—এই ভারসাম্যই হবে আমাদের আগামী দিনের পাথেয়।

পরিশেষে বলা যায়, ধর্ম আমাদের দেয় নৈতিক কাঠামো, সংস্কৃতি দেয় আত্মার পরিচয় আর আধুনিকতা দেয় এগিয়ে যাওয়ার পথ। এই তিনের মধ্যে কোনো একটিকে বাদ দিয়ে আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজ কল্পনা করতে পারি না। ২০২৬ সালের এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রয়োজন একটি সমন্বিত জীবনদর্শন, যেখানে বিজ্ঞানের যুক্তি থাকবে, ধর্মের শাশ্বত নৈতিকতা থাকবে এবং বাঙালির প্রাণের সংস্কৃতি থাকবে। যখন আমরা বুঝতে পারব যে আইফোন হাতে নিয়ে রোবটিক্স চর্চা করার পাশাপাশি লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরে নবান্ন পালন করা কিংবা মসজিদে গিয়ে প্রার্থনা করা পরস্পরবিরোধী কোনো কাজ নয়, বরং এটাই আমাদের সমৃদ্ধ জীবনের বহিঃপ্রকাশ—সেদিন এই টানাপোড়েনের অবসান ঘটবে। আধুনিকতা হোক আমাদের প্রগতির সোপান, ধর্ম হোক আমাদের আলোর পথ এবং সংস্কৃতি হোক আমাদের হূদয়ের স্পন্দন। তবেই বাংলাদেশ তার রূপান্তরের এই জটিল পথ সফলভাবে অতিক্রম করতে পারবে।

 

গবেষক ও উন্নয়নকর্মী