Print Date & Time : 28 April 2026 Tuesday 2:06 pm

নতুন করে প্রাণ ফিরছে পাটশিল্পে

* লিজের মাধ্যমে বন্ধ পাটকল চালুর পরিকল্পনা সরকারের
* বাড়বে বিনিয়োগ, বৃদ্ধি পাবে রপ্তানি ও কর্মসংস্থান
এফ আই মাসউদ: দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো পুনরায় চালুর জোরালো উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে ১৪টি পাটকল লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। আরও ৬টি পাটকল লিজ দেওয়ার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সরকারের এ উদ্যোগে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পাটশিল্পে নতুন গতি সঞ্চারের আশা দেখা দিয়েছে।
জাতীয় সংসদে লিখিত প্রশ্নের জবাবে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানান, বর্তমানে লিজপ্রাপ্ত পাটকলগুলোতে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। এসব কারখানায় প্রতিদিন প্রায় ১২০ টন পাটপণ্য উৎপাদন হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীন নরসিংদী জেলার তিনটি পাটকলও এ উদ্যোগের আওতায় আনা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ জুট মিলস লিমিটেড ও ইউএমসি জুট মিলস লিমিটেড ইতোমধ্যে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় লিজ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ জুট মিলস লিমিটেডে প্রতিদিন প্রায় ৪০ টন পাটপণ্য উৎপাদন হচ্ছে এবং ইউএমসি জুট মিলস লিমিটেডে সোয়েটার উৎপাদন চলছে। এ দুটি কারখানায় বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ শ্রমিক কাজ করছেন। কো-অপারেটিভ জুট মিলস লিমিটেড লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম বলেছেন, বন্ধ পাটকলগুলো দ্রুত চালুর লক্ষ্যে টেন্ডার প্রক্রিয়া ও আগ্রহপত্র (ইওআই) আহ্বান সম্পন্ন হয়েছে। সরকার মূলত পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) অথবা বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে এসব মিল পরিচালনায় আগ্রহী।
তিনি বলেন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিল্পাঞ্চলগুলো আবার সচল করা হবে। এতে স্থানীয় অর্থনীতি চাঙা হবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, নরসিংদীর এসব পাটকল একসময় হাজার হাজার মানুষের জীবিকার উৎস ছিল। মিলগুলো চালু হলে স্থানীয়দের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রায় শতভাগ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
পাটশিল্পের উন্নয়নে সরকার গবেষণা ও বীজ উন্নয়নেও গুরুত্ব দিচ্ছে উল্লেখ করে শরীফুল আলম বলেন, সোনালি আঁশের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে উন্নতমানের দেশি পাটবীজ উৎপাদন, গবেষণা সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কাজ চলছে।
সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় পাট খাতকে উজ্জীবিত করতে স্বল্প ও মধ্য-মেয়াদি কার্যক্রম পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। স্বল্প মেয়াদি কর্মপরিকল্পনাতে পাট অধিদপ্তরের ১৫ প্রকার লাইসেন্স অনলাইন সেবাদান, পাট আইন সংশোধন, পাট খাতে বিশেষ প্রণোদনা, জুট পোর্টাল তৈরির মতো কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনায় ইন্ডাস্ট্রিজ-একাডেমি কলাবরেশন বৃদ্ধি, পৃথক টাস্কফোর্স গঠন, জুট ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্লাস্টার-পাট খাতের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা, গোল্ডেন ফাইবার অব বাংলাদেশ নামে ব্র্যান্ডিংয়ের মতো বিভিন্ন কার্যপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার।
এদিকে, বন্ধ পাটকল পুনরায় চালুসহ বিভিন্ন দাবিতে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পাট শ্রমিক দলের প্রতিনিধিরা। তারা পাটকল রাষ্ট্রীয়ভাবে চালু, শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ, উন্নত প্রযুক্তি সংযোজন এবং পলিথিনের কাঁচামাল আমদানি বন্ধের দাবি জানান।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রথম ৬ মাসে বিগত সময়ের চেয়ে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে। এ সময়ে রপ্তানি হয়েছে ৪১৮ দশমিক ৬৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে বেশি।
বাংলাদেশ বর্তমান বিশ্বে পাট উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে হলেও এই বৃদ্ধির হার স্থিতিশীল নয়। ২০১৬ সালে ১৭ দশমিক ৮৫ একর জমির আবাদ থেকে উৎপাদিত হয়েছিল ১৫ দশমিক ৪৯ লাখ মেট্রিক টন পাট। ২০২১ সালে জমির পরিমাণ বেড়ে ২৩ দশমিক ৭৯ লাখ একরে উন্নীত হয়। কিন্তু সেবার জমির পরিমাণ বাড়লেও পাটের উৎপাদন নেমে এসেছিল ১৪ দশমিক ০৯ লাখ মেট্রিক টনে। ২০২৫ সালে পাটের আবাদ হয় ১৬ দশমিক ৮২ একর। উৎপাদন ছিল ১৫ দশমিক ১৫ লাখ মেট্রিক টন। তবে উৎপাদন কমলেও এই এক দশকে পাটের গড় বাজারমূল্য বেড়েছে। ২০১৬ সালে প্রতি কেজি পাটের গড় বাজারমূল্য ছিল ৪০ দশমিক ৫৮ টাকা; ২০২৫ সালে সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ৭৮ দশমিক ৪৮ টাকায়। অর্থাৎ দাম দ্বিগুণ হয়েছে।
বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাঁচা পাট, পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে থাকে। বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশন ও পাট অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গত ২০২৪- ২০২৫ অর্থবছরে ১২টি দেশে কাঁচা পাট রপ্তানি হয়েছে। এই ১২টি দেশের মধ্যে রয়েছেÑ ভারত, পাকিস্তান, চীন, নেপাল, ব্রাজিল, যুক্তরাজ্য, ভিয়েতনাম, তিউনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, আইভরি কোস্ট, যুক্তরাষ্ট্র, থাইল্যান্ড। অনেক দেশেই বর্তমানে পাট রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে।
পাট অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অক্টোবরে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, চীন, ব্রাজিল, ইউকে, তিউনিশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে ৮০ হাজার ৭৪০ বেল কাঁচা পাট রপ্তানি হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কাঁচা পাট রপ্তানি হয় ২ দশমিক ২৯ টন, আয় হয় ১৭৮১.৭৬ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয় ৬.৪৩ লাখ টন ও আয় হয় ৮০৯৫.২০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএ) চেয়ারম্যান খন্দকার আলমগীর কবির বলেন, বিশ্বে পাটের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় আমরা রপ্তানি করতে পারছি না। পাটকলসহ অন্য কলকারখানাগুলো চালু করতে পারলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পাটের বাজারদরও বাড়বে। বর্তমানে এক মণ পাট উৎপাদনে কৃষকের খরচ ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকা। এই পাট তারা ৪ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করতে পারে। এ দাম আরও বাড়ালে কৃষকের পাট চাষে আগ্রহ বাড়বে।