তামান্না ইসলাম: বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠনের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে যেমন আশা তৈরি হয়েছে, তেমনি কিছু উদ্বেগও দেখা দিয়েছে। গত কয়েক বছরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ নানা ধরনের চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে গেছে। মত প্রকাশের সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক সহিংসতা, বিরোধী মত দমনের অভিযোগ, গুম-গ্রেপ্তার নিয়ে আলোচনা, নির্বাচনকে ঘিরে বিতর্ক এসব বিষয় নিয়ে মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন অসন্তোষ ছিল। তাই জনগণের ভোটে নির্বাচিত নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। মানুষ চায় এমন একটি সরকার, যারা শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব কাজের মাধ্যমে দেশের পরিস্থিতির পরিবর্তন আনবে।
নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে শিক্ষা খাতকে আধুনিক ও সহজলভ্য করার দিকে। শিক্ষার্থীদের জন্য বার্ষিক পুনঃভর্তি ফি বাতিল করা একটি বড় সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা অভিভাবকদের আর্থিক চাপ কিছুটা কমিয়েছে। পাশাপাশি লটারির পরিবর্তে আধুনিক ভর্তি পরীক্ষা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করবে। আবার প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে ইউনিফর্ম বিতরণ করা হয়েছে, যা দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের শিক্ষা জীবন সহজ করে তুলেছে। বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ব্যাংক গ্যারান্টি সুবিধা চালু করা হয়েছে, যেখানে কোনো জামানত ছাড়াই সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে। একই সঙ্গে স্টুডেন্ট ভিসা সহজীকরণের মাধ্যমে বিদেশে ভাষা শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ আরও সহজ করা হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক পরিসরে সুযোগ পাওয়ার পথ কিছুটা প্রসারিত হয়েছে বলে ধারণা করা যায়। কৃষি খাতেও সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রান্তিক কৃষকদের সুবিধার জন্য সুদসহ ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ করা হয়েছে। এতে ছোট কৃষকদের আর্থিক চাপ কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে তারা ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তা সহজে পেতে পারেন। ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রেও সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ের সেবকদের জন্য বিশেষ সম্মানি ও উৎসব ভাতা চালু করা হয়েছে। এছাড়া জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড়দের জন্য ‘স্পোর্টস কার্ড’ ও ক্রীড়া ভাতা চালু করা হয়েছে, যা খেলোয়াড়দের আরও উৎসাহ দেবে। জ্বালানি ও পরিবেশ খাতেও সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর জন্য রুফটপ সোলার ও নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যোগ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও বেশি নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষার জন্য সারা দেশে বৃক্ষরোপণ ও খাল খননের মতো কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে। কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির উন্নয়নের জন্যও সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়েছে। নতুন নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে এবং আরও সরকারি চাকরি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। এসব পরিকল্পনা সফল হলে বেকারত্ব কিছুটা কমতে পারে। সামাজিক নিরাপত্তার জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও স্বাস্থ্য কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষ সহজে সরকারি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পাবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর হওয়ার কথা জানিয়েছে। চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পুলিশের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, নতুন সরকার শিক্ষা, কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, পরিবেশ, জ্বালানি, প্রশাসন ও রাজনৈতিক সংস্কারÑসব ক্ষেত্রেই একসঙ্গে একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। উদ্যোগগুলো দেশের উন্নয়নের জন্য একটি ইতিবাচক দিক নির্দেশ করে। কিছু উদ্যোগ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে, কিছু আবার চলমান এবং কিছু পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে।
তবে পর্যাপ্ত কি না, সেটা নির্ভর করে মানুষ কোন দিকটাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে তার ওপর। কারণ এখনো দ্রব্যমূল্য পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, বেকারত্ব কমেনি, আর সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন জীবনে অর্থনৈতিক চাপ অনুভব করছে। কিছু সরকারি উদ্যোগ থাকলেও তার ফল সর্বস্তরের মানুষের জীবনে সমানভাবে প্রতিফলিত হয়নি। আবার সমাজে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়ে গেছে, এবং কিছু ক্ষেত্রে ধর্ষণ ও সহিংসতার মতো অপরাধের যথাযথ ও দ্রুত বিচার নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। তাই সামগ্রিকভাবে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক সমাজ নিশ্চিত না হলে উন্নয়নকে পুরোপুরি পর্যাপ্ত বলা কঠিন।
তবে বাস্তবতা হলো, এত অল্প সময়ে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি, তাই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলোÑস্বচ্ছতা বজায় রেখে প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে রূপ দেওয়া।
শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট,
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
