টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত মুহূর্ত এসে গেছে। কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর চোখ এখন একটাই ম্যাচে—ফাইনাল। ভারতের আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে শনিবার মুখোমুখি হচ্ছে স্বাগতিক ভারত ও নিউজিল্যান্ড। বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় শুরু হবে এই মহারণ।
এই ম্যাচকে ঘিরে উত্তেজনার পারদ এখন তুঙ্গে। একদিকে শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্নে উজ্জীবিত ভারত, অন্যদিকে প্রথমবারের মতো টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্যে মরিয়া নিউজিল্যান্ড। তাই ক্রিকেটভক্তদের মনে একটাই প্রশ্ন—শেষ হাসি হাসবে কে?
আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়াম বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিকেট স্টেডিয়ামগুলোর একটি। প্রায় এক লাখের বেশি দর্শক একসঙ্গে বসে খেলা দেখতে পারেন এখানে। তবে এই মাঠ ভারতের জন্য সবসময় সুখস্মৃতি বয়ে আনেনি।
২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালেও এই মাঠেই অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল ভারতের। সেই হার এখনও অনেক ভারতীয় সমর্থকের মনে কাঁটার মতো বিঁধে আছে। শুধু তাই নয়, চলতি বিশ্বকাপেও এই মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে একটি ম্যাচ হেরেছে ভারত।
এই কারণেই অনেকেই মজা করে বলেন, আহমেদাবাদের মাঠটা যেন ভারতের জন্য একটু ‘অপয়া’। তবে ক্রিকেট তো অনিশ্চয়তার খেলা। তাই অতীতের ফলাফলকে পেছনে ফেলে এবার নতুন গল্প লিখতে চাইবে ভারতীয় দল।
সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটের ক্রিকেটে ভারত বরাবরই শক্তিশালী দল। টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে ভারত ইতোমধ্যে দুবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।
২০০৭ সালে প্রথম টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে মহেন্দ্র সিং ধোনির নেতৃত্বে ইতিহাস গড়ে ভারত। সেই জয়ই মূলত বিশ্ব ক্রিকেটে টি–টোয়েন্টির জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়।
এরপর দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০২৪ সালে আবার শিরোপা জেতে ভারত। অধিনায়ক রোহিত শর্মার নেতৃত্বে সেই টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে দলটি।
এবার যদি তারা আবার ট্রফি জিততে পারে, তাহলে পরপর দুইবার টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের বিরল কীর্তি গড়বে ভারত।
নিউজিল্যান্ড দলটি বরাবরই বিশ্ব ক্রিকেটে অত্যন্ত লড়াকু হিসেবে পরিচিত। বড় টুর্নামেন্টে তারা প্রায়ই ভালো খেললেও শেষ পর্যন্ত ট্রফি জেতা হয়ে ওঠে না।
টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসেও একই চিত্র দেখা যায়। কিউইরা এখনও পর্যন্ত এই টুর্নামেন্টে কখনও চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি। ২০২১ সালের টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তারা ফাইনালে উঠলেও শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে রানার্সআপ হয়।
তাই এবারের ফাইনাল তাদের জন্য অনেক বড় সুযোগ। যদি তারা ভারতকে হারাতে পারে, তাহলে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পাবে নিউজিল্যান্ড।
গত এক দশকে নিউজিল্যান্ড দলটি বড় টুর্নামেন্টে বেশ ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। ২০১৫ ও ২০১৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপেও তারা ফাইনালে উঠেছিল।
২০১৯ সালের ফাইনাল তো ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় ম্যাচগুলোর একটি। ইংল্যান্ডের সঙ্গে সেই ম্যাচে সমতা হওয়ায় সুপার ওভার হয়, তাতেও সমান রান। শেষ পর্যন্ত বাউন্ডারি কাউন্ট নিয়মে হেরে যায় নিউজিল্যান্ড।
টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও কিউইদের উপস্থিতি নিয়মিত। প্রথম আট আসরের মধ্যে চারবার সেমিফাইনাল এবং একবার ফাইনালে খেলেছে তারা। তাই অভিজ্ঞতার দিক থেকে দলটি মোটেও পিছিয়ে নেই।
এই বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল ম্যাচ দুটিও ছিল দারুণ উত্তেজনাপূর্ণ।
প্রথম সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে একপ্রকার উড়িয়ে দেয় নিউজিল্যান্ড। মাত্র ৯ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে জয় পায় তারা। সেই ম্যাচে ফিন অ্যালেন ঝড় তোলেন ব্যাট হাতে। টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্রুততম সেঞ্চুরিগুলোর একটি করেন তিনি।
তার বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার বোলাররা কার্যত অসহায় হয়ে পড়েছিল।
অন্যদিকে দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ভারত ও ইংল্যান্ডের ম্যাচটি ছিল রানবন্যার এক অনন্য উদাহরণ। ম্যাচটিতে দুই দল মিলে প্রায় ৫০০ রান করে এবং ৩৪টি ছক্কা দেখা যায়। শেষ পর্যন্ত মাত্র ৭ রানের নাটকীয় জয়ে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে ভারত।
ফাইনাল ম্যাচে কিছু খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স পুরো ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
নিউজিল্যান্ডের হয়ে সবচেয়ে বড় ভরসা ফিন অ্যালেন। তার আগ্রাসী ব্যাটিং শুরুতেই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। এছাড়া পেসার ম্যাট হেনরিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। নতুন বলে উইকেট নেওয়ার ক্ষমতা তার বড় শক্তি।
ভারতের হয়ে নজর থাকবে ইনফর্ম সঞ্জু স্যামসনের দিকে। পুরো টুর্নামেন্টেই তিনি ব্যাট হাতে ধারাবাহিক ছিলেন। আর বোলিংয়ে বড় ভরসা যাসপ্রীত বুমরাহ। তার নিখুঁত ইয়র্কার এবং ডেথ ওভারের বোলিং যেকোনো দলকে চাপে ফেলতে পারে।
আহমেদাবাদের স্টেডিয়ামে ফাইনাল মানেই বিশাল চাপ। প্রায় এক লাখ দর্শক গ্যালারিতে বসে চিৎকার করবে ভারতের পক্ষে।
এটা স্বাভাবিকভাবেই নিউজিল্যান্ডের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিপক্ষের মাঠে এমন পরিবেশে স্নায়ু ধরে রাখা সহজ নয়।
তবে নিউজিল্যান্ড দলটি বরাবরই শান্ত ও স্থির মানসিকতার জন্য পরিচিত। তাই তারা ভয় না পেয়ে নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারলে ম্যাচটা বেশ জমে উঠবে।
কাগজে-কলমে হয়তো ভারতকে কিছুটা এগিয়ে রাখা যায়। নিজেদের মাঠ, দর্শকদের সমর্থন এবং শক্তিশালী স্কোয়াড—সব মিলিয়ে তারা আত্মবিশ্বাসী।
তবে নিউজিল্যান্ডকে কখনও হালকাভাবে নেওয়া যায় না। বড় ম্যাচে চমক দেখানোর ইতিহাস তাদের আছে।
শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটের সৌন্দর্যটাই হলো অনিশ্চয়তা। একটা ভালো ইনিংস বা কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ উইকেট পুরো ম্যাচের চিত্র বদলে দিতে পারে।
তাই এখন অপেক্ষা শুধু সেই মুহূর্তের—যখন ফাইনাল শেষে বিজয়ী দলের হাতে উঠবে টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ঝকঝকে ট্রফি। কোটি ভক্ত তখন দেখবে, ইতিহাসের পাতায় নতুন করে লেখা হলো আরেকটি বিশ্বকাপের গল্প।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post