ইমতিয়াজ আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ : নদীবেষ্টিত শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জ। শীতলক্ষা, বুড়িগঙ্গা আর ধলেশ্বরীর ঘিরে থাকা এই শহরের ইতিহাস যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি দীর্ঘদিনের এক বড় সংকট-নিরাপদ ও পর্যাপ্ত পানিসরবরাহ। নগরায়ণ, শিল্পকারখানার বিস্তার, জনসংখ্যা বৃদ্ধি আর ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিনির্ভরতাÑসব মিলিয়ে এই সংকট দিনে দিনে প্রকট হয়েছে। সেই বাস্তবতায় নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য বড় এক আশার খবর এলো জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) থেকে।
দেশের অন্যতম প্রাচীন শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জে নিরাপদ পানি সরবরাহ, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং জলবায়ু সহনশীল নগর সেবা গড়ে তুলতে ‘নারায়ণগঞ্জ গ্রিন অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট আরবান ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (এনজিআরইউডিপি)’ হাতে নিয়েছে সরকার।
একনেকের সভায় ১ ডিসেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ‘নারায়ণগঞ্জ গ্রিন অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট আরবান ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প’ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬৯৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন। চলতি অর্থবছরে শুরু হয়ে ২০৩১ সালের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
সিটি করপোরেশন সূত্র বলছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নগর এলাকায় সুপেয় পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে ড্রেনেজ, সবুজায়ন ও নগরবাসীর জীবনমান উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। প্রকল্পটি টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিকসেবা প্রদানের জন্য নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতেও গুরুত্ব দিচ্ছে। এজন্য আধুনিক আইটি সরঞ্জাম সরবরাহসহ নগর পরিকল্পনা, পয়োনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হবে।
পানিসংকটের নগর বাস্তবতা : নারায়ণগঞ্জ শহরে দীর্ঘদিন ধরেই পানির সরবরাহ ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। অনেক এলাকায় দিনে কয়েক ঘণ্টার বেশি পানি পাওয়া যায় না। কোথাও আবার পানির চাপ এতটাই কম যে দোতলা বা তিনতলায় পানি ওঠে না। বর্ষা মৌসুমে ড্রেনেজ সমস্যার কারণে জলাবদ্ধতা, আর শুষ্ক মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় সংকট আরও বেড়ে যায়।
নগরের দেওভোগ, খানপুর, চাষাঢ়া, ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা নিয়মিত পানির রঙ, গন্ধ ও মান নিয়ে অভিযোগ করে আসছেন। অনেকেই বাধ্য হয়ে ব্যক্তিগত গভীর নলকূপ বা পানির মোটর বসিয়েছেন। এতে একদিকে খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপও বাড়ছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন ছিল একটি সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদি ও আধুনিক পানিসরবরাহ প্রকল্প। একনেকে অনুমোদিত নতুন প্রকল্পটি সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির আওতায় পানি সরবরাহ ব্যবস্থার প্রায় সব স্তরেই আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রথমত, গোদনাইল পানি শোধনাগার বর্ধিতকরণ ও পুনর্বাসন করা হবে। বর্তমানে এই শোধনাগারটি শহরের একটি বড় অংশে পানি সরবরাহের মূল ভরসা। বর্ধিতকরণের মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে এবং পরিশোধিত পানির মান আরও উন্নত হবে।
দ্বিতীয়ত, নগরের বিভিন্ন এলাকায় ২০ কিলোমিটার ট্রান্সমিশন লাইন এবং ২৮০ কিলোমিটার ডিস্ট্রিবিউশন লাইন স্থাপন করা হবে। এতে পুরোনো, ক্ষতিগ্রস্ত ও লিকেজপ্রবণ পাইপলাইনগুলো বদলে যাবে। পানির অপচয় কমবে এবং সরবরাহ হবে আরও নিরবচ্ছিন্ন।
তৃতীয়ত, পানির সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করতে নগরজুড়ে ১৪টি ডিস্ট্রিক্ট মিটারড এরিয়া (ডিএমএ) স্থাপন করা হবে। ডিএমএ পদ্ধতির মাধ্যমে কোন এলাকায় কত পানি যাচ্ছে, কোথায় অপচয় হচ্ছে, তা সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
চতুর্থত, নতুন করে ২০টি গভীর নলকূপ স্থাপন এবং বিদ্যমান ২০টি নলকূপ পুনর্বাসন করা হবে। তবে এই নলকূপগুলো হবে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব, যাতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে। এছাড়া উচ্চচাপের জেটার, ডাম্প ট্রাক ও পাওয়ার রডারসহ ড্রেন পরিষ্কারের আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা হবে, যা এনসিসির রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা আরও বাড়াবে।
পঞ্চমত, নগরের ৩৫ হাজার হোল্ডিংয়ে নতুন পানি সংযোগ ও স্মার্ট মিটার বসানো হবে। স্মার্ট মিটারের মাধ্যমে পানির ব্যবহার পরিমাপ হবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে। এতে একদিকে স্বচ্ছতা বাড়বে, অন্যদিকে রাজস্ব আদায়ও সহজ হবে। এ ছাড়া সামাজিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ২৭টি ওয়াটার এটিএম বুথ স্থাপন করা হবে, যেখানে স্বল্পমূল্যে বিশুদ্ধ পানি পাওয়া যাবে।
শুধু পানি নয়, ড্রেনেজ ও সবুজ নগর : এই প্রকল্পটি কেবল পানি সরবরাহেই সীমাবদ্ধ নয়। নগরকে ‘গ্রিন অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট’ বা সবুজ ও সহনশীল করে তুলতেই প্রকল্পের নামকরণ করা হয়েছে এমনভাবে। প্রকল্পের আওতায় ২৭ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ ও সংস্কার করা হবে। এতে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে চাষাঢ়া, মাসদাইর, শাসনগাঁও ও ফতুল্লার মতো এলাকাগুলোয় এর সুফল মিলতে পারে।
এ ছাড়া নগরের বিভিন্ন স্থানে পাঁচ হেক্টর ভূমিতে পার্ক, খেলার মাঠ ও উš§ুক্ত গণপরিসর নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ এই শহরে উš§ুক্ত সবুজ জায়গার সংকট দীর্ঘদিনের। নতুন পার্ক ও খেলার মাঠ নগরবাসীর মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নগরবাসীর জন্য টেকসই ও নিরাপদ পানি সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে ড্রেনেজ ও নগর পরিবেশের উন্নয়ন ঘটবে।
তিনি বলেন, পানি সরবরাহ একটি ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি সেবা। এই সেবাকে টেকসই করতে নাগরিকদের সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। এ সময় তিনি নগরবাসীর প্রতি নিয়মিত পানি বিল ও হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধের আহ্বান জানান।
একনেকে প্রকল্প অনুমোদনের খবরে নগরের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে আশার আলো দেখা গেছে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা থেকে কিছু শঙ্কাও রয়েছে। চাষাঢ়ার বাসিন্দা আব্দুস সালাম বলেন, ‘কাগজে-কলমে অনেক প্রকল্পই ভালো হয়, কিন্তু বাস্তবায়নের সময় যেন কাজের মান ঠিক থাকে। পাইপ বসিয়ে আবার রাস্তা কেটে ফেলা-এগুলো আমরা আর দেখতে চাই না। পাঠানতলির এক গৃহবধূ নাসরিন আক্তার বলেন, পানি যদি নিয়মিত পাই, তাহলে বিল দিতে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু পানি না পেয়ে বিল দিতে হলে সেটা কষ্টের।
নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সমন্বয় ও তদারকি। ঠিকাদারি কাজের মান, সময়মতো কাজ শেষ করা এবং নাগরিক দুর্ভোগ কমিয়ে কাজ সম্পন্ন করাÑএসব বিষয়ের ওপর জোর দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে নারায়ণগঞ্জের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এক নতুন যুগে প্রবেশ করবে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমবে, পানির অপচয় কমবে, আর নগরবাসী পাবে নিরাপদ ও মানসম্মত পানি।
একই সঙ্গে ড্রেনেজ উন্নয়ন ও সবুজায়নের মাধ্যমে শহরটি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় আরও সহনশীল হয়ে উঠবে। শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জের টেকসই উন্নয়নের পথে এটি হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। সব মিলিয়ে একনেকের এই অনুমোদন নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য শুধু একটি প্রকল্পের খবর নয়, বরং একটি সম্ভাবনার নাম, যেখানে পানি আর কেবল সংকটের গল্প হবে না, বরং নাগরিক অধিকারের অংশ হয়ে উঠবে।
এনজিআরইউডিপি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নারায়ণগঞ্জের মূল নগরসেবা আধুনিক হবে, নাগরিক সুবিধা উন্নত হবে এবং পরিকল্পিত নগরায়ণ ত্বরান্বিত হবে। কর্মকর্তারা আশা করছেন, প্রকল্প শেষ হলে নারায়ণগঞ্জ আরও বাসযোগ্য, জলবায়ু-সহনশীল এবং উন্নত জীবনমানসম্পন্ন শহরে রূপ নেবে।
নারায়ণগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ ও কদমরসুলÑএই তিনটি পৌরসভা একীভূত করে ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন গঠিত হয়েছিল। ২০১৯ সাল পর্যন্ত শহরটির পানিসরবরাহ ছিল ঢাকা ওয়াসার অধীনে। পরে শীতলক্ষ্যা নদীর পানি এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর ভিত্তি করে এনসিসি নিজস্ব ব্যবস্থা চালু করে। এনসিসি এরই মধ্যে ২০২০ সালে এডিবি-সমর্থিত সমীক্ষার মাধ্যমে একটি দীর্ঘমেয়াদি পানি সরবরাহ পরিকল্পনাও প্রণয়ন করেছে।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post