সরকার গঠনের তিন সপ্তাহের মাথায় নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে দেশের ৩৭ হাজার নারীকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নে বহুল আলোচিত ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কর্মসূচির কার্যক্রম গত মঙ্গলবার উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নিঃসন্দেহে অল্প সময়ের মধ্যে সরকারের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। আগামী ৫ বছরে ৪ কোটি নারীকে এই ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে।
বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পরিধি গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে। তবে এই উদ্যোগগুলোর কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করে লক্ষ্যভিত্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সঠিকভাবে পৌঁছানোর ওপর। নারীপ্রধান পরিবারগুলোর জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করার সরকারি উদ্যোগ সেই দিক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
প্রথম ধাপে প্রায় ৩৭ হাজার নারীপ্রধান পরিবারকে এই কার্ড দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে তারা মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাবেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে চার কোটি পরিবারকে এই সুবিধার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যদি পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়, তবে এটি দেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
বাংলাদেশে এখনও বহু পরিবার রয়েছে যেখানে নারীরা সংসারের প্রধান দায়িত্ব পালন করেন। স্বামীহারা, পরিত্যক্তা বা কর্মক্ষম পুরুষ সদস্যহীন পরিবারগুলোতে নারীদের সংগ্রাম আরও কঠিন। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার সীমাবদ্ধতার কারণে এসব পরিবার প্রায়ই দারিদ্র্যের চক্রে আটকে থাকে। তাই সরাসরি নারীর হাতে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
তবে শুধু কার্ড বিতরণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উপকারভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। অতীতে অনেক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম কিংবা প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ পড়ার অভিযোগ উঠেছে। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির ক্ষেত্রেও এমন ঝুঁকি এড়াতে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এখানে অনিয়ম বা পক্ষপাতিত্ব করার সুযোগ নেই। স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধতার জায়গায় সরকার অটল থাকবে বলে আমরা মনে করি।
একই সঙ্গে এই সহায়তাকে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করাও জরুরি। নারীদের জন্য প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা সুযোগের সঙ্গে যদি এই কর্মসূচি সমন্বয় করা যায়, তাহলে তা আরও কার্যকর হবে। অর্থাৎ নগদ সহায়তার পাশাপাশি নারীর দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোই প্রকৃত ক্ষমতায়নের পথ।
সরকার দায়িত্ব নিয়েই যেভাবেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে নজর দিয়েছেÑ তা নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। অতীতে নির্বাচনী ওয়াদা শুধু কথার কথা ছিল। কিন্তু এবারই তার ব্যতিক্রম দেখা গেল। আমরা আশা করি, সরকার বাকি প্রতিশ্রুতগুলোও বাস্তবায়নে মনোযোগ দেবে। বিশেষ করে এবারের নির্বাচনে বিএনপির ম্যানুফেস্টে প্রায় ৪৯টি প্রতিশ্রুতি ছিল। সেগুলোর সবগুলো বাস্তবায়িত হলে কাক্সিক্ষত সংস্কার যেমন আসবে তেমনি দেশ শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর দাঁড়াবে।
