এবিএম তৌফিক-উল ইসলাম: আজকের সমাজে মানুষের জীবন প্রায় পুরোপুরি পর্দার ভেতরে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভাইরাল ট্রেন্ড, অনলাইন আলোচনা এবং অসীম ডিজিটাল বিনোদনে ডুবে থাকে। এ সময়ে ধর্ম বা আধ্যাত্মিক গল্প খুব কমই জনপ্রিয়তা পায়। তবে মাঝে মাঝে এমন কিছু গল্প সামনে আসে, যা লাখো মানুষকে থমকে দিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। লিলি জে-র গল্প ঠিক তেমনই একটি বিরল উদাহরণ। একজন আধুনিক ও স্বাধীন পশ্চিমা নারী কীভাবে নাস্তিকতা থেকে ইসলামে এলেন এই প্রশ্নটি ঘিরে ইন্টারনেটে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। ইসলামে আসার আগে লিলি জের জীবন ছিল একেবারেই ভিন্ন। তিনি অনলাইনে লাইফস্টাইল কনটেন্ট, বিনোদন এবং সামাজিক মাধ্যমে পরিচিত ছিলেন। তার পরিবেশ অনেক পশ্চিমা তরুণীর মতোই ছিল স্বাধীনতা, ফ্যাশন, আধুনিক বিনোদন এবং অনলাইন খ্যাতির প্রতিফলন। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি অস্ট্রেলিয়ায় মিউজিক্যাল থিয়েটার ও পারফরম্যান্স-সংশ্লিষ্ট কাজে যুক্ত ছিলেন।
বাইরে থেকে তার জীবন সফল ও আনন্দময় মনে হলেও অনেকের ধারণা, ভেতরে ভেতরে তিনি এক ধরনের শূন্যতা অনুভব করছিলেন। বক্তব্যের মতে, সেই শূন্যতাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের শুরু ছিল।
লিলি জের গল্প এতটা আকর্ষণীয়, কারণ তিনি জš§গতভাবে মুসলিম ছিলেন না। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি নাস্তিক ছিলেন বলেও ধারণা করা হয়। তিনি কোনো ধর্মেই বিশ্বাস করতেন না। তবে ধীরে ধীরে তিনি ইসলাম নিয়ে গভীরভাবে গবেষণা শুরু করেন। অনলাইনে ইসলামের আলোচনা, মুসলিমদের জীবনধারা, কোরআনের শিক্ষা এবং বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের পরিস্থিতি তাকে আত্মবিশ্লেষণে বাধ্য করে।
কিছু সূত্র অনুযায়ী, গাজা ও ফিলিস্তিনের মানবিক পরিস্থিতি তার মনে গভীর প্রভাব ফেলে। ন্যায়বিচার, মানবতা, নৈতিকতা এবং ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে তার মনে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়।
অনেকেই মনে করেন, তার পরিবর্তনের পেছনে আরেকটি কারণ ছিল এক ধরনের মানসিক ও আত্মিক সংকট। আধুনিক পশ্চিমা সমাজে স্বাধীনতা, জনপ্রিয়তা ও বিনোদনের মধ্যেও তিনি জীবনের অর্থহীনতা অনুভব করছিলেন। তার আগের কনটেন্টেও জীবনের উদ্দেশ্য, সম্পর্ক, পরিচয় এবং মানসিক শান্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রকাশ পেত।
তার গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো পরিবর্তনের রহস্য। অনেকে মনে করেন, তিনি শুধু ধর্ম পরিবর্তন করেননি; বরং স্থিরতা, শৃঙ্খলা, অর্থ ও মানসিক শান্তির খোঁজে ছিলেন। ইসলাম তার কাছে এক ধরনের কাঠামো, নিয়মিত নামাজ, শালীনতা এবং আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে সেই শূন্যতা পূরণ করেছে বলে অনেকে মনে করেন।
কেউ কেউ এটিকে আধুনিক অতিরিক্ত ভোগবাদী ইনফ্লুয়েন্সার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একটি প্রতিক্রিয়া বলেও ব্যাখ্যা করেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল তার আগের ও পরের জীবনের বিশাল পার্থক্য। আগে তিনি ছিলেন আধুনিক ডিজিটাল সংস্কৃতির প্রতীক; পরে তিনি শালীনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং আধ্যাত্মিকতার কথা বলতে শুরু করেন। এই পরিবর্তন মানুষকে গভীরভাবে কৌতূহলী করে তোলে।
অনেক অনুসারীর মতে, মুসলিম সমাজে যে ভ্রাতৃত্ববোধ, শৃঙ্খলা এবং মানসিক সহায়তা তিনি দেখেছিলেন, সেটিও তার পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছিল। বহু নতুন মুসলিমই এমন এক ধরনের আবেগপূর্ণ সংযোগের কথা বলেন, যা তারা আগে কখনো অনুভব করেননি।
তার গল্পকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে তার অনুসন্ধানী মানসিকতা। তিনি হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত নেননি; বরং সময় নিয়ে বিভিন্ন ধর্ম, বিশ্বাস এবং ধারণা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেছেন। বর্তমান তরুণ প্রজšে§র কাছে এটি বিশেষভাবে আকর্ষণীয়, কারণ তারা অন্ধভাবে কিছু গ্রহণ না করে যুক্তি ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে চায়।
আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো তিনি ‘কনভার্ট’ না বলে ‘রিভার্ট’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। ইসলামে বিশ্বাস করা হয়, প্রত্যেক মানুষ জš§গতভাবে একত্ববাদের (এক আল্লাহর বিশ্বাস) দিকে ঝোঁকে, যাকে ফিতরা বলা হয়। তাই ইসলাম গ্রহণকে অনেক মুসলিম ‘ফিরে আসা’ হিসেবে দেখেন।
সামাজিক মাধ্যমে তার জনপ্রিয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। মানুষ শুধু একটি ধর্ম পরিবর্তনের গল্প দেখছিল না, বরং একটি সম্পূর্ণ পরিচয়ের পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করছিল। তার পোশাক, বক্তব্য, চিন্তাভাবনাÑসবকিছু বদলে গিয়েছিল।
বর্তমানে তিনি গাজা পরিস্থিতি নিয়ে মানবিক সচেতনতা, ফান্ডরেইজিং এবং ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কথা বলার জন্যও পরিচিত হয়েছেন। পাশাপাশি নতুন মুসলিমদের জন্য ইসলামি শিক্ষা, কোরআন আলোচনা, নারীর মর্যাদা এবং ব্যক্তিগত উন্নয়ন নিয়েও কাজ করছেন।
পডকাস্ট ও অনলাইন আলোচনায় তিনি প্রায়ই বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল জগতের ভেতর থেকেও মানুষ শেষ পর্যন্ত মানসিক শান্তি ও জীবনের অর্থ খোঁজে। সবশেষে লিলি জের গল্প শুধু ধর্মান্তরের গল্প নয়; এটি আধুনিক ডিজিটাল যুগে একজন মানুষের পরিচয়, উদ্দেশ্য এবং আত্মিক শান্তির খোঁজের গল্প। এটি দেখায়, প্রযুক্তি ও সামাজিক মাধ্যমের যুগেও মানুষ এখনো সত্য, শান্তি এবং অর্থপূর্ণ জীবনের সন্ধান করে চলেছে।
রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
