রামিসা রহমান : পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত আনুষঙ্গিক খাতের কোম্পানি তৌফিকা ফুডস অ্যান্ড লাভেলো আইসক্রিম পিএলসির বিরুদ্ধে ঋণের তথ্য গোপন ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে দেশের আইসক্রিম খাতের বাজার প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার। প্রতিবছর এই বাজার ৭ থেকে ৮ শতাংশ হারে বাড়ছে। বাজারটি মূলত দেশীয় কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের দখলে থাকলেও, তালিকাভুক্ত কোম্পানি লাভেলো আইসক্রিম সেই প্রতিযোগিতায় তেমন দৃশ্যমান অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। অথচ আর্থিক প্রতিবেদনে কোম্পানিটির যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সম্প্রতি ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) তদন্তে উঠে এসেছে, কোম্পানিটি ধারাবাহিকভাবে ব্যাংক ঋণের তথ্য গোপন করেছে এবং আর্থিক বিবরণীতে দায় কম দেখিয়ে মুনাফা ও সম্পদের অবস্থান বেশি দেখানোর চেষ্টা করেছে। বিষয়টি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম নয়, বরং পুঁজিবাজারে আর্থিক স্বচ্ছতা ও নিরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, লাভেলো আইসক্রিম ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সীমান্ত ব্যাংক লিমিটেড থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করলেও তা আর্থিক প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রকাশ করেনি। ২০২০ সালে ৯ দশমিক ২৫ কোটি টাকা, ২০২১ সালে ৩২ দশমিক ৫৫ কোটি টাকা, ২০২২ সালে ৫২ দশমিক ৩৫ কোটি টাকা, ২০২৩ সালে ৭৩ দশমিক ৪৬ কোটি টাকা এবং ২০২৪ সালে ৮১ দশমিক ০৯ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার তথ্য আংশিক বা পুরোপুরি গোপন রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তদন্তকারীরা বলছেন, এই ঋণের বিপরীতে দায় কম দেখানো হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংকে জমা রাখা অর্থ বা সংশ্লিষ্ট আর্থিক অবস্থানও কম দেখানো হয়েছে। এর ফলে কোম্পানির নেট অ্যাসেট ভ্যালু (এনএভি) এবং শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) কৃত্রিমভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীদের সামনে একটি শক্তিশালী আর্থিক অবস্থার চিত্র তুলে ধরা হলেও বাস্তব চিত্র ছিল ভিন্ন।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, এই অনিয়ম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং ধারাবাহিকভাবে কয়েক বছর ধরে একই পদ্ধতিতে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীরা বিভ্রান্ত হয়েছেন এবং কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থার সঙ্গে বাজারে প্রচারিত তথ্যের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক তৈরি হয়েছে।
তদন্তকারীরা বলেছেন, ২০২০ ও ২০২১ সালে লাভেলোর আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করেন ইসলাম কাজী শফিক ও কোম্পানি পার্টনার কাজী শফিকুল ইসলাম। বাকি তিন বছর আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করেছে কাজী জহির অ্যান্ড কোং-এর পার্টনার নজরুল হোসেন খান।
এই প্রেক্ষাপটে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) লাভেলো আইসক্রিম ও সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে আর্থিক প্রতিবেদন জালিয়াতির অভিযোগে প্রথম ফৌজদারি মামলা, যা পুঁজিবাজারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এতদিন আর্থিক অনিয়মের ক্ষেত্রে জরিমানা বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও ফৌজদারি মামলার নজির খুবই কম। ফলে এই পদক্ষেপ কার্যকর হলে এটি করপোরেট খাতে একটি শক্ত বার্তা দেবে।
বিশ্লেষকরা বলেন, এটি যদি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে কোনো কোম্পানি বা নিরীক্ষক এত সহজে আর্থিক তথ্য গোপন করার সাহস পাবে না।
তবে একই সঙ্গে তারা সতর্কতারও পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ এই ধরনের মামলায় সঠিক প্রমাণ সংগ্রহ, আইনি প্রক্রিয়া এবং বিচারিক স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ভুল পদক্ষেপ বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে লাভেলো আইসক্রিমকে ঘিরে আরেকটি বড় অভিযোগ হচ্ছে পুঁজিবাজারে কারসাজির আশঙ্কা। এ বিষয়ে ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ সিকিউরিটিস অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) আলাদা তদন্ত শুরু করেছে বলে জানা গেছে। বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যদি আর্থিক প্রতিবেদন জালিয়াতি ও শেয়ার কারসাজিÑদুই অভিযোগই প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি হবে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় করপোরেট কেলেঙ্কারিগুলোর একটি।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে, শুধু আর্থিক প্রতিবেদন দেখে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিনিয়োগকারীদের জন্য কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
একজন সাধারণ বিনিয়োগকারী বলেন, আমরা কোম্পানির রিপোর্ট দেখে বিনিয়োগ করি। যদি সেই রিপোর্টই সঠিক না হয়, তাহলে আমাদের নিরাপত্তা কোথায়?
এ বিষয়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিস অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমদ সিদ্দিকি বলেন, ম্যানেজমেন্ট অবশ্যই এর মধ্যে জড়িত ছিল। পাশাপাশি আমি বলব, অডিটের বড় ধরনের ত্রুটি ছিল। ব্যাংকে কত ঋণ আছে, এটি কোনো গোপন বিষয় নয়। এসব তথ্য ব্যাংক স্টেটমেন্টেই পাওয়া যায়। প্রতিবছর যদি দায় কম দেখানো হয়, তাহলে অডিটরদের ভূমিকা অবশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। শুধু কোম্পানি নয়, নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব নিয়েও বড় প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিস অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মুখপাত্র ও পরিচালক মো. আবুল কালাম শেয়ার বিজকে বলেন, লাভেলো আইসক্রিম কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে অনিয়ম ও ঋণ গোপনের অভিযোগ আমরা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছি। এ বিষয়ে কমিশন আলাদাভাবে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে তথ্য গোপন বা বিকৃত করা হয়েছে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সিকিউরিটিজ আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ আল-আমিন শেয়ার বিজকে বলেন, এই ঘটনা পুঁজিবাজারের জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত। যদি কোনো কোম্পানি ধারাবাহিকভাবে ঋণ গোপন করে এবং তা নিরীক্ষকদের চোখ এড়িয়ে যায় বা ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা হয়, তাহলে পুরো আর্থিক প্রতিবেদন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। শুধু সংশ্লিষ্ট কোম্পানি নয়, নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি, না হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও কমে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, বরং পুরো আর্থিক রিপোর্টিং ও নিরীক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার প্রয়োজন। নিরীক্ষকদের জবাবদিহিতা বাড়ানো, নিয়মিত তদারকি এবং প্রযুক্তিনির্ভর যাচাই প্রক্রিয়া চালু করা জরুরি।
ঋণের তথ্য গোপনের বিষয়ে জানতে তৌফিকা ফুডস অ্যান্ড লাভেলো আইসক্রিম কোম্পানির সচিব মো. মহিউদ্দিন সরদারকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তার মুঠোফোনে এসএমএস পাঠালেও তার কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে লাভেলো আইসক্রিমকে ঘিরে এ ঘটনা এখন শুধু একটি কোম্পানির অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি দেশের পুঁজিবাজার, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং নিরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কতটা কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে এবং এর মাধ্যমে বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে কি না।
প্রিন্ট করুন






Discussion about this post