নিজস্ব প্রতিবেদক : আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ঠিক আগ মুহূর্তে এসে নীতিসুদ হার অপরিবর্তিত রেখে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রধান নীতি সুদহার (রেপো) অপরিবর্তিত রাখা হলেও সরকারি ও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য বাড়ানো হয়েছে।
গতকাল সোমবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এই মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন। নতুন নীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বছরে দুবার মুদ্রানীতি ঘোষণা করে থাকে, যেখানে ঋণ প্রবাহ, মুদ্রা সরবরাহ, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সম্পদের প্রবৃদ্ধির রূপরেখা তুলে ধরা হয়।
গভর্নর বলেন, ব্যাংকগুলো যাতে অতিরিক্ত তারল্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা না রেখে বিনিয়োগে ব্যবহার করে, সেজন্য কিছু নীতিগত সমন্বয় আনা হয়েছে। স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এটি আরও কমানো হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি আগের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অর্জিত হয়নি। ডিসেম্বর পর্যন্ত এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ। তবে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে আগামী জুন পর্যন্ত বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারি খাতেও ঋণগ্রহণ নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়ে ভিন্ন চিত্র দেখিয়েছে। চলতি অর্থবছরে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য ২১ দশমিক ৬০ শতাংশ ধরা হয়েছে। যদিও গত অর্থবছরে লক্ষ্য ছিল ২০ দশমিক ৫০ শতাংশ, কিন্তু ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার ঋণ নিয়েছে ২৮ দশমিক ৯০ শতাংশ হারে।
মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি সাত শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যদিও বর্তমানে তা ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে অবস্থান করছে।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংক রেপো হার ৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ১০ শতাংশে নির্ধারণ করে। এই হারে ব্যাংকগুলো সরকারি সিকিউরিটিজ বন্ধক রেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে স্বল্পমেয়াদি ঋণ গ্রহণ করে।
নতুন মুদ্রানীতিতে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটির সুদহার ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তবে স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) হার ৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অর্থ জমা রাখলে এ সুদহার প্রযোজ্য হবে।
ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘ব্যাংক খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধন জরুরি। বিশ্বের অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো বাংলাদেশ ব্যাংকও বিভিন্ন ধরনের চাপের মধ্যে কাজ করে।’
তিনি বলেন, ‘আসন্ন নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে রাজনৈতিক দলগুলো আর্থিক খাত সংস্কারের বিষয়ে তাদের অঙ্গীকার রক্ষা করবে।’
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সব শর্ত বাংলাদেশ পূরণ করা হয়েছে বলে জানিয়ে গভর্নর বলেন, ‘চার বছরে আইএমএফ যে পরিমাণ ঋণ দেওয়ার কথা, তার চেয়েও বেশি ডলার কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভে আছে। আমরা অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে চাই না।’
চলতি অর্থবছরে বাজার থেকে প্রায় চার বিলিয়ন মার্কিন ডলার কেনা হয়েছে বলে উল্লেখ করে গভর্নর বলেন, গত এক বছরে কোনো ডলার রিজার্ভ থেকে বিক্রি করা হয়নি।
দেশ থেকে পাচার হওয়া টাকা উদ্ধারের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বলেন, এ ব্যাপারে রিকভারি-বেইজড কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের চুক্তি হয়েছে। ওই চুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংক খাত থেকে লুট হওয়া টাকা উদ্ধারে কাজ শুরু করেছেন। রিকভারি-বেইজড চুক্তি হচ্ছে, তারা যদি ১০০ টাকা উদ্ধার করতে পারে তাহলে ২০ টাকা তারা নেবে। বাকিটা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেবে। এ কাজে তাদের প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারে।
ইসলামী ব্যাংকের জব্দ ৮৩ শতাংশ শেয়ার বিক্রির প্রক্রিয়া চলছে জানিয়ে গভর্নর বলেন, ইসলামী ব্যাংক তাদের হাতে থাকা জব্দ শেয়ারগুলো বিক্রি করতে প্রস্তুতি নিয়েছে। এ নিয়ে তারা আদালতে গেছেন। গত বুধবার ব্যাংকটি আদালতে গেছে। তবে পুরোনো আদালত ভেঙে দেওয়ায় এটা শুনানি হয়নি, যে কারণে শেয়ার বিক্রির আদেশ পিছিয়ে যাচ্ছে। নতুন কোর্ট বসার পর এনিয়ে আদেশ দিবেন বলে আমরা আশাবাদী। শেয়ারগুলো কিনতে ক্রেতাও রেডি আছে। কোর্ট অনুমতি পেলেই জব্দ শেয়ারগুলো বিক্রি করা হবে।
ব্যাংকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধে গভর্নরের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে কি না জানতে চাইলে গভর্নর বলেন, ‘তেমন কিছুই করতে পারিনি, এটা ঠিক নয়। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে, তবে কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে পেরেছি।’
গভর্নর বলেন, ‘আগামীতে ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিতে হলে আগে ব্যাংকের সঙ্গে মেমোরেন্ডামের করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার সম্পদের পরিমাণ যাচাই-বাছাই করে সে যদি যোগ্য হয়, তাহলে তাদের ঋণ দেওয়া হবে।’
