মো. ফখরুল ইসলাম : যে কোনো নামকরা ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিকাঠামো শুধু পুঁজি, প্রযুক্তি বা শ্রমের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। এর ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে আস্থা, সততা ও নৈতিকতার ওপর। যেমন মানবদেহ অক্সিজেন ছাড়া বাঁচতে পারে না, তেমনি ব্যবসাও নৈতিকতা ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। নৈতিকতা ব্যবসাকে শুধু সজীব রাখে না বরং এর সমৃদ্ধির পথও প্রশস্ত করে। তাই নৈতিকতা আজ ব্যবসায়িক সাফল্যের অন্যতম প্রধান শর্ত এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার অব্যর্থ উপাদান।
বাংলাদেশের বর্তমান বাণিজ্যিক বাস্তবতায় নৈতিকতার সংকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভেজাল, মজুতদারি, অকারণে মূল্যবৃদ্ধি, গোপন শর্ত, হিসাব জালিয়াতি—এসব অনিয়ম বাজারের স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। ব্যবসার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হলে শুধু ভোক্তাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না, বরং পুরো অর্থনীতি অস্থির হয়ে পড়ে। আস্থা কমে যায়, বিনিয়োগ হ্রাস পায় এবং ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা অসুস্থ হয়ে ওঠে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে সৎ ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়েন।
এর বিপরীতে নৈতিক ব্যবসা আস্থা তৈরি করে, যা বাজারের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। একটি দোকান বা প্রতিষ্ঠান যখন পরিমাপে সঠিক রাখে, দাম স্বচ্ছ রাখে, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এবং গ্রাহকের সমস্যায় দায়িত্বশীল ভূমিকা নেয়, তখন ক্রেতারা নিশ্চিন্তে সেই প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে। নৈতিকতার এ ধারাবাহিকতা একটি ব্র্যান্ডকে শক্তিশালী করে, বাজারে তার অবস্থান সুদৃঢ় করে এবং দীর্ঘমেয়াদি লাভ নিশ্চিত করে। এমনকি প্রতিযোগিতার কঠিন পরিস্থিতিতেও নৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকে, কারণ তাদের কাছে থাকে গ্রাহকের আস্থা।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নৈতিকতার মূল্য বহুগুণ বেশি। আজকের বিশ্ববাজারে ক্রেতারা চায় ‘এথিক্যাল বিজনেস’ যেখানে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত হয়, পরিবেশবান্ধব পণ্য উৎপাদন করা হয় এবং সাপ্লাই চেইন স্বচ্ছ থাকে। বাংলাদেশে পোশাক খাত বহুবার আন্তর্জাতিক নজরদারিতে পড়েছে নিরাপত্তা, শ্রমিক অধিকার ও মাননিয়ন্¿ণের কারণে। কিন্তু যেসব প্রতিষ্ঠান নৈতিক মানদণ্ড দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করেছে, তারা বিদেশি ক্রেতার আস্থা অর্জন করে নিয়মিত অর্ডার পেয়েছে। ফলে কর্মসংস্থান বেড়েছে, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দেশের অর্থনীতি লাভবান হয়েছে।
নৈতিকতা শুধু ব্যবসার ভেতরের সম্পর্কই রক্ষা করে না, বরং সমাজেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। যখন ব্যবসায়ীরা সঠিক মূল্য নেন, মান বজায় রাখেন এবং কর ফাঁকি না দিয়ে দায়িত্ব পালন করেন, তখন রাষ্ট্রের রাজস্ব বাড়ে, উন্নয়ন প্রকল্প এগোয় এবং অর্থনীতিতে একটি ন্যায়সংগত পরিবেশ তৈরি হয়। সমাজে ভোক্তাবান্ধব পরিবেশ গড়ে ওঠে, সৎ উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়ে এবং দুর্নীতি কমতে থাকে।
একটি টেকসই নৈতিক ব্যবসা গড়ে তুলতে তিন পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি—তা হচ্ছে ব্যবসায়ী নিজে, রাষ্ট্র এবং ভোক্তা। ব্যবসায়ীদের উচিত নৈতিক আচরণবিধি মেনে চলা, রাষ্ট্রের দায়িত্ব কঠোর নজরদারি, কার্যকর আইন প্রয়োগ ও বাজারকে ন্যায়সংগত রাখা। আর ভোক্তাদের উচিত সৎ ব্যবসাকে উৎসাহিত করা এবং অসাধু ব্যবসাকে বর্জন করা।
উদাহরণস্বরূপ, দেশে-বিদেশের অনেক ঐতিহ্যবাহী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কথা এখানে উল্লেখ করা যায়। তারা দেখিয়েছেন ব্যবসা-বাণিজ্যের মৌলিক শক্তি পুঁজি নয়, আস্থা। আর সেই আস্থার জন্ম হয় সততার ভিত্তিতে। ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ আছে, যেখানে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সাফল্যের মূল রহস্য ছিল সৎ লেনদেন ও বিশ্বাস অর্জনের ক্ষমতা। তাই স্বল্পমেয়াদি লাভের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা নির্মাণই সত্যিকার সমৃদ্ধির সোপান।
বাংলাদেশের বাজারে এখনও অনেকে সততার উদাহরণ হয়ে আছেন। পুরান ঢাকার এক মসলার ব্যবসায়ী যার দোকান তিন প্রজন্ম ধরে চলছে। তারা আজও পরিমাপে কম দেন না। তার দামও সবসময় স্বচ্ছ। প্রতিবেশী দোকানদাররা কখনও কখনও বাড়তি লাভের জন্য পরিমাপে কারসাজি করলেও তিনি সেই পথে যাননি। আশ্চর্যের বিষয়, প্রতিযোগিতার মাঝেও তার দোকানেই ভিড় সবচেয়ে বেশি। কারণ ক্রেতারা জানেন, এখান থেকে প্রতারণা ছাড়া পণ্য পাওয়া যাবে। তার ব্যবসা ছোট থেকে বড় হয়েছে একমাত্র সততার ভিত্তিতে। লাভ এসেছে ধীরে, কিন্তু স্থায়ীভাবে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এমন উদাহরণের অভাব নেই। জাপানের বেশ কয়েকটি পরিবারভিত্তিক প্রতিষ্ঠান শত বছরের বেশি সময় ধরে চলছে কেবল একটি নীতি ধরে রেখে—‘গ্রাহকের প্রতি দায়িত্বই ব্যবসার ভবিষ্যৎ।’ তারা কখনও নিম্নমানের পণ্য বাজারে ছাড়েনি, কখনও তথ্য গোপন করেনি, এমনকি ভুল হলে ক্ষতিও স্বীকার করেছে। এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে টিকে থাকা এ প্রতিষ্ঠানগুলো প্রমাণ করে, সততা শুধু নৈতিকতা নয়, এটি ব্যবসার সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ।
বাংলাদেশের রপ্তানি খাতেও সততা বড় সম্পদ। একটি পোশাক কারখানার কথা বলা যায়। যেখানে মালিক বিদেশি ক্রেতাকে কখনও ভুল তথ্য দেননি। সময়মতো ডেলিভারি দিতে ব্যর্থ হলে তিনি নিজের খরচে কার্গো পাঠিয়েছেন। এ সততার কারণে ক্রেতারা তাকে ‘ট্রাস্টেড সাপ্লায়ার’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছেন। আজ সেই কারখানা হাজারো শ্রমিকের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে এবং বছরে কোটি কোটি ডলার রপ্তানি করছে। এমন উদাহরণ দেখায়, ব্যবসার আস্থা একবার প্রতিষ্ঠিত হলে তার ফল বহু বছরের জন্য ছড়িয়ে পড়ে।
আমরা জানি, ব্যবসায় আস্থা কেনা যায় না, অর্জন করতে হয়। স্থিতিশীল সাফল্যের একমাত্র ভরসা হলো মানুষ, আর মানুষেরই সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা বিশ্বাসযোগ্যতা। সেই বিশ্বাস কখনও কেনা যায় না। এটা ধারাবাহিক সততা, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। তাই বলা হয় ব্যবসায় আস্থা হলো এমন একটি সম্পদ, যা বাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সবচেয়ে শক্তিশালী অস¿।
বাংলাদেশের বাণিজ্যিক বাস্তবতায় আস্থার সংকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নিত্যপণ্যের বাজারে অকারণে দাম বাড়ানো, পণ্যে ভেজাল মেশানো, পরিমাপে কম দেওয়া বা লুকানো শর্ত প্রয়োগ এসব অনিয়ম ভোক্তাদের আস্থা ধ্বংস করে। ফলে বাজারে কৃত্রিম অস্থিরতা তৈরি হয়, ব্যবসায়ী-ভোক্তার সম্পর্ক দুর্বল হয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অথচ কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এখনও আস্থার আদর্শ উদাহরণ হয়ে ওঠে। যাদের কাছে গ্রাহক বারবার ফিরে যায়। কারণ তারা জানে, এখানে প্রতারণা নেই, প্রতিশ্রুতির ব্যত্যয় নেই।
আস্থা অর্থ দিয়ে কেনা যায় না। কারণ, এটি মানুষের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়ানো। অর্থ দিয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে আস্থা তৈরি করা যায় না বরং অভিজ্ঞতার আলোকে গ্রাহক বুঝতে পারে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কতটা দায়িত্বশীল। আজকের ডিজিটাল যুগে আস্থার গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ইতিবাচক পর্যালোচনা যেমন ব্যবসাকে শীর্ষে তুলতে পারে, তেমনি একটি নেতিবাচক অভিজ্ঞতা মুহূর্তে হাজারো মানুষের কাছে ছড়িয়ে পড়ে। তাই আস্থার বিকল্প নেই।
রাষ্ট্রও আস্থা তৈরির পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ন্যায্য বাজার ব্যবস্থা, মান নিয়ন্¿ণ, কর ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং দুর্নীতি দমন এসব ব্যবসায় আস্থার ভিত্তি শক্ত করে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকেও নৈতিক আচরণবিধি বাস্তবায়নে সক্রিয় হতে হবে।
অতএব, বলা যায় আস্থা ব্যবসার জন্য অক্সিজেনস্বরূপ। এটি থাকলে ব্যবসা বেড়ে ওঠে, না থাকলে ব্যবসা থেমে যায়। আস্থা এমন এক বিনিয়োগ, যার ফল সুদসহ ফিরে আসে। আর প্রতারণা এমন এক ক্ষতি, যার ধাক্কা বহু বছর বহন করতে হয়। অর্থ দিয়ে আস্থা কেনা যায় না, কিন্তু আচরণ দিয়ে অর্জন করা যায়। তাই সমৃদ্ধি অর্জনের প্রথম শর্ত হলো আস্থা গড়া ধীরে, ধৈর্য ও সততার সঙ্গে।
ব্যবসায় সততার বিপরীতে রয়েছে অনৈতিক প্রতিযোগিতা, ভেজাল, মুনাফাখোর মনোভাব ও কর ফাঁকি। এ ধরনের আচরণ বাজারে সাময়িক লাভ এনে দেয় ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে। ভোক্তা একবার আস্থা হারালে তাকে ফেরানো কঠিন। ফলে ব্যবসা টিকলেও তার বিকাশ থেমে যায়। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রকেও আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ন্যায্য বাজার, মান নিয়ন্¿ণ, প্রতারণা দমন এবং কর প্রশাসনের স্বচ্ছতা, এসব ব্যবসার আস্থা গড়ে তোলে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকেও নিজেদের সদস্যদের মধ্যে সৎ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।
সততা ও আস্থা এমন দুটি সম্পদ যা কেনা যায় না, কিন্তু অর্জন করা যায় নিয়মিত সৎ আচরণ, কথা ও কাজে ধারাবাহিকতার মাধ্যমে। যে ব্যবসায়ী আস্থা অর্জন করেন, তার ব্যর্থতার ভয় কমে যায় তার ব্র্যান্ড শক্তিশালী হয়, তার বাজার বিস্তৃত হয় এবং তার ব্যবসা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকে থাকে।
অতএব সমৃদ্ধির প্রকৃত সোপান হলো সততা ও আস্থা। এগুলো ধরে রাখতে পারলে পুঁজি বাড়ে, মানুষ বাড়ে, বাজার বাড়ে। আর এতে করে ব্যবসা হয়ে ওঠে স্থায়ী, শক্তিশালী এবং সম্মানজনক। আর নৈতিকতা শুধু ব্যবসায়ীদের ব্যক্তিগত গুণ নয়। এটি পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রাণশক্তি। নৈতিকতা থাকলে ব্যবসায় স্থায়িত্ব আসে, আস্থা বাড়ে, প্রতিযোগিতা সুস্থ হয় এবং ব্যবসা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে বিকশিত হয়। তাই নৈতিকতা ব্যবসা-বাণিজ্যের অক্সিজেনস্বরূপ। এটি ছাড়া ব্যবসা বাঁচে না। আর নৈতিকবিশ্বাস ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রকৃত সোপান। এটির ওপর দাঁড়িয়েই আসে প্রকৃত ব্যবসায়িক সমৃদ্ধি।
অতএব সমৃদ্ধির পথে এগোতে চাইলে নৈতিকতাকে শুধু মূল্যবোধ হিসেবে না ভেবে ব্যবসায়িক কৌশল এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ হিসেবে গ্রহণ করাই নতুন বাংলাদেশের এ সময়ের জরুরি প্রয়োজন।
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post