Print Date & Time : 30 April 2026 Thursday 4:12 am

টেকসই প্রতিবেদন ও নৈতিক এআই একীভূত করার ওপর গুরুত্ব সাফা সম্মেলনে

নিজস্ব প্রতিবেদক: নৈতিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও টেকসই প্রতিবেদন যখন ব্যবসায়িক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা এবং জনআস্থার কাঠামো নতুনভাবে নির্ধারণ করছে, তখন বৈশ্বিক হিসাব পেশা এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে—এমন মত দিয়েছেন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা।

রাজধানীর একটি হোটেলে দ্য ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) আয়োজিত সাউথ এশিয়ান ফেডারেশন অব অ্যাকাউন্ট্যান্টস (সাফা) আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এসব কথা বলেন বক্তারা। সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ছিল— ‘পরবর্তী প্রজন্মের পেশা: নৈতিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও টেকসই প্রতিবেদন একীভূতকরণ’।

সম্মেলনের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইসিএবি’র সাবেক সভাপতি ও রহমান রহমান হক, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস-এর সিনিয়র পার্টনার আদীব হোসেন খান। তিনি বলেন, “টেকসই প্রতিবেদন ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার আর দূরবর্তী কোনো ধারণা নয়। এটি ইতোমধ্যেই অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি, পরিমাপ ও প্রকাশের কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন এনেছে।”

সম্মেলনে আফগানিস্তান, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা থেকে আগত প্রতিনিধি, জাতীয় নেতৃত্ব, পেশাদার হিসাববিদ এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। তিনটি টেকনিক্যাল সেশন ও একটি সমাপনী সেশনে ভবিষ্যৎ হিসাব পেশা, এআই এবং টেকসই প্রতিবেদন নিয়ে গভীর আলোচনা হয়।

আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনের উদ্বোধন করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপার্সন এ এইচ এম আহসান এবং বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া। আয়োজকদের মতে, তাঁদের উপস্থিতি হিসাব ও আর্থিক খাতে পেশাগত উৎকর্ষ, নৈতিক মান এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারে সরকারের দৃঢ় সমর্থনের প্রতিফলন।

আইসিএবি সভাপতি এন কে এ মোবিন স্বাগত বক্তব্য দেন এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন কমিটির চেয়ারম্যান ও আইসিএবি’র সাবেক সভাপতি মুহাম্মদ ফরহাদ হোসেন বক্তব্য রাখেন।

এই সম্মেলনে প্রথমবারের মতো ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব অ্যাকাউন্ট্যান্টস (আইএফএসি)-এর সভাপতি জ্যঁ বুকো আইসিএবি’র আমন্ত্রণে ঢাকায় উপস্থিত হন। অতিথি বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন সাফার উপদেষ্টা আশফাক ইউসুফ তোলা।

আইএফএসি সভাপতি জ্যঁ বুকো বলেন, এই সম্মেলনের আলোচনা বৈশ্বিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি টেকসই প্রতিবেদন ও নৈতিক এআইয়ের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। তিনি আর্থিক প্রতিবেদনের স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “সততা ও জনস্বার্থকে কেন্দ্র করে এআই পরিচালনা করতে পারলে হিসাববিদরা অনিশ্চয়তাকে সুযোগে পরিণত করতে পারবেন এবং একটি আরও টেকসই ও সহনশীল অর্থনীতি গড়ে তুলতে অবদান রাখবেন।”

আইসিএবি সভাপতি এন কে এ মোবিন বলেন, “এটি পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযাত্রা। নৈতিক এআই ও টেকসই প্রতিবেদনের পথে এগিয়ে যেতে সততা, নিরপেক্ষতা ও জনসেবার চিরন্তন মূল্যবোধই আমাদের পথ দেখাবে।” তিনি জানান, বৈশ্বিক সর্বোত্তম মান বজায় রাখতে আইসিএবি বিভিন্ন পেশাগত কর্মসূচি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

টেকনিক্যাল অধিবেশনে বক্তারা বলেন, আধুনিক টেকসই প্রতিবেদন এখন মূলধন বণ্টন, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং বাজারের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। জলবায়ু ও সুশাসনসংক্রান্ত বিষয়গুলো এখন মূল আর্থিক আলোচনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। হিসাব পেশার পরিধি হিসাবরক্ষণ ছাড়িয়ে ঝুঁকি মডেলিং, মূল্যায়ন, নিরীক্ষা, অনুসন্ধান ও নীতিনির্ধারণ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।

আদীব হোসেন খান বলেন, “এআই স্বচ্ছতা ও ভবিষ্যদ্বাণীমূলক বিশ্লেষণ জোরদার করতে পারে, কিন্তু এর কোনো নৈতিক দায় নেই। এই দায় মানুষের ওপরই বর্তায়, তাই নৈতিক অনুশাসন অপরিহার্য।” তিনি জলবায়ু বিশ্লেষণ, সরবরাহ শৃঙ্খলে কার্বন নিরূপণ এবং রিয়েল-টাইম ইএসজি কর্মদক্ষতা পর্যবেক্ষণে এআইয়ের ব্যবহার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন। তবে অ্যালগরিদমিক পক্ষপাত, তথ্যের স্বচ্ছতার অভাব এবং দুর্বল নৈতিক কাঠামো জনআস্থাকে ক্ষুণ্ন করতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

তিনি বলেন, “নৈতিক এআইয়ের উদ্দেশ্য শুধু প্রতিবেদন স্বয়ংক্রিয় করা নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের মান উন্নত করা। উন্নত প্রযুক্তি দায়িত্ব কমায় না, বরং তা আরও বাড়িয়ে দেয়।”