Print Date & Time : 15 May 2026 Friday 2:24 pm

ন্যায্যমূল্য না পেয়ে হতাশ কৃষক

নীলফামারী প্রতিনিধি: ধান চাষে খ্যাত উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা নীলফামারীতে এবার বোরো ধানের বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। বাজারে ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় হতাশ কৃষক। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলায় বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮১ হাজার ৮৫৯ হেক্টর। এর মধ্যে অর্জিত জমির পরিমাণ ৮১ হাজার ৮৬০ হেক্টর। এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বোরোর চাষ বেশি হয়েছে। আর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৯০১ মেট্রিক টন। এ যাবৎ কর্তন করা হয়েছে হাইব্রিট ৫ হাজার ২৩৮ হেক্টর এবং উফশী ৪ হাজার ৬৫৩ হেক্টর (মোট জমির প্রায় ১২ থেকে ১৫ শতাংশ)।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাতাসে দোল খাচ্ছে ধানের সোনালি শিস। মাঠজুড়ে এখন কৃষক ধান কাটা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে। কেউ ধান কাটছে, আবার কেউ কাঁধে করে বাড়িতে নিয়ে মাড়াই করছে। তবে ধানের বাম্পার ফলনেও খুশি নেই কৃষক, কারণ বাজারে ধানের দাম না থাকায় বিপাকে পড়েছে কৃষক।
হাল, সার, সেচ, বীজ, কীটনাশক, মাড়াই ও বাড়তি মজুরিতে বেড়ে গেছে উৎপাদন খরচ। সেই অনুপাতে ধানের দাম না বাড়ায় লোকসানের মুখে পড়েছে কৃষক। ফলে অনেকেই ধানের পরিবর্তে সবজিসহ অন্যান্য লাভজনক ফসল চাষে আগ্রহী হচ্ছে তারা।
নীলফামারী পৌর শহরের নিউবাবু পাড়ার বর্গাচাষি নাজমুল হুদা জানান, প্রতিবেশীর কাছে দুই বিঘা জমি ১২ হাজার টাকায় চুক্তি নিয়ে হাইব্রিড ধানের চাষ করছি। এদিকে দুই বিঘায় খরচ হয়েছে ৩০ হাজার। এতে মোট খরচ ৪২ হাজার টাকা। বিঘায় ২৫-২৭ মণ ধানের আশা করছি। সেখানে ধান বিক্রি হবে ৬০০ টাকা মণ দরে ৩০ হাজার টাকা। নাজমুলের হিসাব অনুযায়ী, লোকসান হবে ১২ হাজার টাকা। তিনি বলেন, আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। তাহলে ধান লাগাব কেন?
জেলা শহরের টুপির মোড় এলাকার কৃষক গোলাম রব্বানী বলেন, ‘বিদ্যুতের দাম, সেচ, সার, কাটা, মাড়াই, কীটনাশক, মজুরিÑসব মিলিয়ে বিঘাপ্রতি খরচ ১৫-২০ হাজার টাকা। বারবার (বন্যা, খড়া) ধানে লোকসান হলে কৃষক একসময় বোরো চাষ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে। সরকারিভাবে ধান ক্রয়ের অনুরোধ করেন তিনি।’
জেলা সদরের পঞ্চপুকুর ইউনিয়নের উত্তরাশশী ফকির পাড়া গ্রামের কৃষক তোফাজ্জুল হোসেন (তোফা) বলেন, ‘দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে, সেভাবে কৃষকের উৎপাদিত ফসলের দাম বাড়ছে না। ফলে কৃষক অর্থাভাবে নাজেহাল হয়ে পড়েছে। এবার ওই জমিতে সেভেন জাতের আলু চাষ করেও লোকসান খেয়েছি, ধানেও যদি লোকসান হয়, তাহলে ছেলেমেয়ে নিয়ে পথে বসতে হবে।’
একই এলাকার চেংমারী গ্রামের কৃষক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘তিন বিঘা জমিতে ধান চাষে খরচ হয়েছে ৪৫-৫০ হাজার টাকা। আর ওই জমিতে ধান উৎপাদন হবে ৭০-৭৫ মণ। প্রতি মণ ৬০০ টাকা দরে দাম হয় ৪৫ হাজার টাকা। এখন ধান বিক্রি করে লোকসান হবে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। তাহলে বোরো চাষে লাভ কি? আগামীতে ধানের পরিবর্তে ভুট্টা চাষ করব।’
কৃষকরা বলছেন, ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ, ওষুধপত্র ও ধার দেনার (ঋণের) চাপ সামলাতে বাধ্য হয়েই (কাঁচা ধান) কম দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। কম দামে বিক্রি করলে উৎপাদন খরচই উঠবে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ধান ব্যবসায়ী বলেন, কৃষক তো মাঠে মারা যাচ্ছে, এর কারণ ৪২ কেজিতে এক মণ (বস্তায় ৮৪ কেজি) ধান কিনছেন পাইকারী ব্যবসায়ীরা। ওখানে মনে ঠকছেন দুই কেজি আর বস্তায় চার কেজি। আবার ধানের ন্যায্য মূল্যও পাচ্ছে না। এই ধানেই একশ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী ছয় মাস পরেই দ্বিগুণ দামে বিক্রি করবে। তাহলে কৃষকের কী হলো? তিনি বলেন, সার, হাল, বীজ, কীটনাশক, কাটা, পরিবহন ও মাড়াইসহ বিঘায় খরচ হয় ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। ফলে কৃষক শুধুই ঠকছে।
সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আতিক আহমেদ জানান, এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। তুলনামূলকভাবে উফশী-২৮, ২৯ জাতের ধানের আবাদ এবার বেশি হয়েছে। তবে বাজারে দরপতনের ফলে কৃষক কিছুটা হতাশ। আশা করি, কৃষিবান্ধব সরকার অবশ্যই কৃষকের সমস্যা সমাধানে কাজ করছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মনজুর রহমান বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় চলতি মৌসুমে জেলায় ৮১ হাজার ৮৬০ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সরকার ন্যায্য মূল্যে ধান ক্রয় করলে বাজারদর স্থিতিশীল হবে। তাহলে কৃষক ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।’