প্রতিনিধি, পটুয়াখালী: পটুয়াখালীতে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সূর্যমুখী চাষ। ভোজ্যতেল উৎপাদনের পাশাপাশি পশুখাদ্য, পাখির খাদ্য, জৈবসার, প্রসাধনী উপাদান এবং সৌন্দর্য বর্ধনকারী ফুল হিসেবে সূর্যমুখীর বহুমুখী ব্যবহার বাড়ায় এই ফসলকে ঘিরে কৃষক ও সাধারণ মানুষের আগ্রহও বেড়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় সূর্যমুখী আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৩৩৩ হেক্টর। তবে কৃষকদের আগ্রহে সেই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ৩ হাজার ৫১২ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে।
কৃষি বিভাগ বলছে, সূর্যমুখীর বীজ থেকে উন্নতমানের ভোজ্যতেল উৎপাদন হয়। তেল নিষ্কাশনের পর খৈল গবাদি পশুর পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে ব্যবহƒত হয়। শুকনো কাণ্ড ও পাতা জৈবসার তৈরিতে কাজে লাগে। অনেক এলাকায় সূর্যমুখীর ফুল পর্যটন আকর্ষণ হিসেবেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার সাতানি গ্রামের কৃষক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ধানের তুলনায় সূর্যমুখীতে খরচ কম, রোগবালাইও কম। ফলন ভালো হলে লাভও বেশি। তেলের জন্য বাজারে চাহিদা আছে, আবার খৈলও বিক্রি করা যায়।’
বাউফল উপজেলার মদনপুরা গ্রামের কৃষক মেহেদি হাসান বলেন, ‘আগে শুধু ফুলের জন্য মানুষ সূর্যমুখী চিনত। এখন তেল, বীজ আর গবাদি পশুর খাদ্যÑসব মিলিয়ে এটা লাভজনক ফসল। আমরা চাই স্থানীয়ভাবে তেল প্রক্রিয়াজাত করার ব্যবস্থা বাড়ুক।’
এদিকে সূর্যমুখীর হলুদে মোড়া মাঠ দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। কৃষি ও প্রকৃতির মেলবন্ধনে এসব ক্ষেত এখন স্থানীয় পর্যটনেরও আকর্ষণ।
বরিশাল থেকে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী রাবেয়া খাতুন বলেন, ‘সূর্যমুখীর মাঠ খুবই দৃষ্টিনন্দন। ছবি তোলার পাশাপাশি জানতে পারলাম, এই ফুল শুধু সৌন্দর্যের নয়Ñএটা থেকে তেল, পশুখাদ্য ও আরও অনেক কিছু হয়। বিষয়টি সত্যিই চমৎকার।’
বাউফল পৌর শহরের দর্শনার্থী আল রাফি বলেন, ‘এ ধরনের ক্ষেত শুধু কৃষকের আয় বাড়ায় না, মানুষকে প্রকৃতির কাছেও টানে। যদি পরিকল্পিতভাবে প্রচার করা যায়, তাহলে এটি কৃষিভিত্তিক পর্যটনের বড় সম্ভাবনা হতে পারে।’
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সূর্যমুখীর বহুজাত ব্যবহার, স্বাস্থ্যসম্মত তেলের চাহিদা এবং তুলনামূলক কম খরচে আবাদ সম্ভব হওয়ায় আগামীতে এই ফসলের চাষ আরও বাড়বে। স্থানীয়ভাবে তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ সুবিধা বাড়ানো গেলে পটুয়াখালীতে সূর্যমুখী হতে পারে কৃষকের নতুন সম্ভাবনার নাম।
পটুয়াখালী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ ড. মো. আমানুল ইসলাম জানান, ‘চলতি মৌসুমে সূর্যমুখী আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৩৩৩ হেক্টর। আর আবাদ হয়েছে ৩৫১২ হেক্টর। লক্ষ্যমাত্রার চাইতে অনেক বেড়েছে আবাদ। এটি আমাদের জন্য খুবই ইতিবাচক দিক। কৃষকরা এখন সূর্যমুখীকে সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসল হিসেবে দেখছেন।’
তিনি বলেন, ‘এটি দিন দিন পপুলার হচ্ছে। মানুষের খাদ্যতালিকায় যুক্ত হচ্ছে। সূর্যমুখীর তেল স্বাস্থ্যসম্মত এবং পুষ্টিগুণসম্পন্ন হওয়ায় ভোক্তাদের মধ্যে এর চাহিদা বাড়ছে। একই সঙ্গে কৃষকরাও বুঝতে পারছেন, এটি শুধু একটি ফুল নয়Ñএটি একটি বহুমুখী ব্যবহারযোগ্য ফসল। বীজ থেকে উন্নতমানের ভোজ্যতেল পাওয়া যায়। তেল নিষ্কাশনের পর যে খৈল থাকে, তা গবাদিপশুর পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এছাড়া শুকনো কান্ড ও পাতা জৈবসার তৈরিতে কাজে লাগে।’
ড. আমানুল ইসলাম আরও বলেন, ‘উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক জমি রয়েছে যেখানে রবি মৌসুমে বিকল্প ফসল চাষের সুযোগ আছে। সেখানে সূর্যমুখী খুব ভালোভাবে মানিয়ে নিচ্ছে। তুলনামূলকভাবে এর উৎপাদন খরচ কম, রোগবালাইও কম হয় এবং সঠিক পরিচর্যা করলে কৃষক ভালো ফলন পান। এই কারণে দিন দিন কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে। পাশাপাশি সূর্যমুখীর দৃষ্টিনন্দন ফুল দেখতে মানুষ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসছেন, যা গ্রামীণ পর্যটনেরও একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।’
এদিকে পিরোজপুর সদর উপজেলার কলাখালী ইউনিয়নের কৈবর্তখালী গ্রাম এখন সূর্যমুখীর হাসিতে ভরপুর। যেখানে একসময় ছিল শুধু ধান ক্ষেত; সেখানে আজ জš§ নিয়েছে কৃষকের নতুন সম্ভাবনা। হলুদের সমারোহে সাজানো এ মাঠ যেন প্রকৃতির অনন্য ক্যানভাস। সূর্যমুখী চাষে কৃষকের নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাওয়ার পাশাপাশি গ্রামটির সৌন্দর্যও বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয় এবং জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে অসংখ্য দর্শনার্থী ভিড় করেন সূর্যমুখীর এই মাঠে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলার সাত উপজেলায় প্রায় ৯৮৪ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী আবাদ হয়েছে। এবার বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রতি হেক্টরে দুই থেকে আড়াই টন, যার বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা।
কৃষকেরা বলছেন, পর্যাপ্ত সরকারি প্রণোদনা ও কার্যকর সহায়তা, বিনা সুদে ঋণ পেলে এ সম্ভাবনাময় চাষে স্থানীয় কৃষকেরা আরও বেশি উদ্বুদ্ধ হবেন। এ ছাড়া সরকারের কৃষি কার্ড পেলে আরও বেশি চাষাবাদে আগ্রহী হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এ ছাড়া বিকাল হলেই গ্রামের সূর্যমুখী ক্ষেত পরিণত হয় দর্শনার্থীদের মিলনমেলায়। স্থানীয়দের মতে, ক্ষেতটি এখন এলাকার একটি ছোট পর্যটনকেন্দ ।

Print Date & Time : 24 April 2026 Friday 4:42 am
পটুয়াখালীতে জনপ্রিয় হচ্ছে সূর্যমুখী চাষ
শীর্ষ খবর ♦ প্রকাশ: