Print Date & Time : 29 April 2026 Wednesday 9:47 am

পাঁচ লাখ টাকা থেকে মাসিক আট কোটি বেতনের সাম্রাজ্য

বিশেষ প্রতিনিধি : পজিটিভ বা ইতিবাচক দেশ কেমন হবে, তা নির্ভর করে সেখানকার মানুষের ওপর। একজন ভালো মানুষ বা ইতিবাচক মানুষ জানেন অনন্য মানুষ ও সাধারণ মানুষের পার্থক্য। একজন অনন্য মানুষ সাধারণের মতো শুধু নিজের কথাই ভাবেন না, ভাবেন চারপাশের সবার কথাÑদেশের কথা। তিনি কখনও অন্যের কাছে করুণা ভিক্ষা করেন না, আশ্রয় চান না, বরং নিজেই হাজার মানুষের আত্মিক আশ্রয়ে পরিণত হন। তিনি শুধু নিজের দুঃখকে জয় করেন না, লাখো মানুষকে দুঃখ-দুর্দশা জয়ের পথ দেখান। শুধু নিজে প্রাচুর্যের অধিকারী হয় না, অগণিত মানুষ তার সংস্পর্শে এসে প্রাচুর্যের সন্ধান পায়। তিনি কখনও শোষক হন না, হন নিপীড়িত ও শোষিতের বন্ধু, তাদের মুক্তির পথপ্রদর্শক। তিনি ব্যতিক্রম ও অনন্যতাকে নিঃসন্দেহে শ্রদ্ধা করেন আর সেই সঙ্গে বিশ্বাস করেন বিস্ময় সৃষ্টি করার শক্তির তার মাঝেই সুপ্ত রয়েছে। তাই সাধারণের মতো ব্যতিক্রম ও অনন্যতার দিকে বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে তাকিয়ে থাকেন না, সুপ্ত শক্তিকে জাগ্রত করে নিজেই হয়ে ওঠেন অনন্য। সে রকম মানুষ ও কাজ নিয়ে আয়োজন পজিটিভ বাংলাদেশ।
বিশেষ প্রতিবেদন
২০১৩ সাল। তরুণ ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ মনির হোসেন আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্ম ওডেস্ক ও ইল্যান্সে স্বতন্ত্রভাবে কাজ শুরু করলেন। সে সময় বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সিং ছিল নতুন ধারণা, বিদেশি ক্লায়েন্টদের কাছে বাংলাদেশি প্রযুক্তিবিদদের দক্ষতা প্রমাণ করা ছিল বিশাল চ্যালেঞ্জ। কিন্তু মনির হাল ছাড়লেন না। দিন-রাত পরিশ্রম করে প্রতিটি প্রজেক্টে সর্বোচ্চ মান বজায় রাখলেন। ধীরে ধীরে তার পোর্টফোলিও সমৃদ্ধ হলো, রেটিং বাড়ল, বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হলো।
কাজের চাপ যখন একার পক্ষে সামলানো অসম্ভব হয়ে উঠল, মনির বুঝলেনÑএবার দল গড়ার সময়। ২০১৭ সালে মাত্র পাঁচ লাখ টাকার পুঁজি এবং সাতজন কর্মী নিয়ে জš§ নিল বিডিকলিং আইটি। শুরুতে ওয়েব ডিজাইন, মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট, ভিজ্যুয়াল ডিজাইন, ডেটা এন্ট্রি ও ডিজিটাল মার্কেটিংÑএসব সেবা দিয়ে যাত্রা শুরু। তিনি বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশের তরুণদের মেধা বিশ্বমানের, শুধু দরকার সঠিক প্ল্যাটফর্ম, সুযোগ ও নেতৃত্ব।
এ প্রসঙ্গে মনির বলেন, ‘আমি দেখেছি আমাদের ছেলেমেয়েরা কতটা প্রতিভাবান। তারা যে কোনো দেশের ডেভেলপারদের সঙ্গে সমানে প্রতিযোগিতা করতে পারে। সমস্যা হলো সুযোগের অভাব, সঠিক পরিবেশের অভাব। আমি চেয়েছিলাম এমন একটা জায়গা তৈরি করতে যেখানে তারা নিজেদের সেরাটা দিতে পারবে। এ দর্শনই বিডিকলিংয়ের মূল ভিত্তি।’
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রথম আলোতে বিডিকলিং নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তখন কোম্পানিতে ছিল ৪০০ কর্মী, মাসিক আয় ছিল প্রায় আড়াই কোটি টাকা। মাত্র দুই বছরে যা ঘটেছে তা রূপকথার মতোÑকর্মী সংখ্যা বেড়েছে ৯০০ শতাংশ, বর্তমানে সেখানে কাজ করছে তিন হাজার ৬০০ জনেরও বেশি কর্মী। মাসিক রাজস্ব বেড়েছে প্রায় সাতগুণ। এই বিস্ময়কর প্রবৃদ্ধির পেছনে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম, কৌশলগত পরিকল্পনা ও বাজারের সঠিক বোঝাপড়া।
আজ বিডিকলিং আইটি বেটোপিয়া গ্রুপের অধীনে পরিচালিত হয়। গ্রুপে মোট বিনিয়োগ হয়েছে ৪৫ কোটি টাকা, যার মধ্যে ব্যাংক ঋণ মাত্র তিন কোটি টাকা, বাকি ৪২ কোটি নিজস্ব তহবিল থেকে। এই আত্মনির্ভরশীলতা মনিরের ব্যবসায়িক দর্শনের প্রতিফলনÑঋণের বোঝা কম রেখে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। গত অর্থবছরে বেটোপিয়া গ্রুপের সম্মিলিত বার্ষিক আয় ছিল ২০০ কোটি টাকা।
সবচেয়ে চমকপ্রদ হলো কর্মসংস্থানের চিত্র। প্রতি মাসে বেতন দেওয়া হয় প্রায় আট কোটি টাকা এবং সরকারি রাজস্বে অবদান ছিল আড়াই কোটি টাকা। এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়Ñএগুলো হাজার হাজার তরুণ পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, সন্তানদের শিক্ষা, মা-বাবার চিকিৎসা, স্বপ্ন পূরণের গল্প।
তবে শুধু ফ্রিল্যান্সিং সেবায় সীমাবদ্ধ থাকেননি মনির। তিনি বুঝেছিলেন, ফ্রিল্যান্সিং একক ব্যক্তির জন্য আয়ের উৎস হতে পারে, কিন্তু টেকসই কর্মসংস্থান তৈরি করে না। তাই বেটোপিয়া গ্রুপের অধীনে নতুন সেবা যুক্ত করেছেনÑকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড সলিউশন, নিজস্ব ডাটা সেন্টার। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, সাপ্লাই চেইন ও অবকাঠামো উন্নয়নেও বিনিয়োগ করেছেন।
মনিরের দূরদর্শী পরিকল্পনা: ‘বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্সিং বাজার ৬০ থেকে ৮০ বিলিয়ন ডলারের। অন্যদিকে এআই ও ক্লাউড বাজার ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছে। বেশির ভাগ স্থানীয় ও বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান এখন এআই রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সেবা বিক্রি করে আমরা বৈদেশিক মুদ্রা আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারি।’
বাংলাদেশে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আধুনিক ডেটা সেন্টার স্থাপন করেছে বেটোপিয়া গ্রুপ। এর মাধ্যমে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কম খরচে ক্লাউড সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে, বিদেশি সার্ভারের ওপর নির্ভরতা কমছে। তবে চ্যালেঞ্জও আছে। মনির বলেন, বাংলাদেশের আইটি ও এআই সেক্টরে কিছু মৌলিক সমস্যা রয়েছে। যদি এআই-সংশ্লিষ্ট হার্ডওয়্যার, বিশেষ করে জিপিইউ আমদানিতে শুল্ক কমানো হয়, বাংলাদেশি কোম্পানিগুলো বিশ্ববাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে।’
‘আমাদের কর্মীরা অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ, দক্ষ ও সৃজনশীল’Ñগর্বের সঙ্গে বলেন মনির। তার দৃঢ় বিশ্বাস, ফ্রিল্যান্সিং দিয়ে শুরু হলেও লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন স্থানীয় কোম্পানি গড়ে তোলা যা সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করবে। এতে দেশের ভেতরেই স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি হবে, মেধাপাচার রোধ হবে। ৫ লাখ টাকা থেকে শুরু করে মাসিক ৮ কোটি টাকা বেতন প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়াÑমোহাম্মদ মনির হোসেনের এই অবিশ্বাস্য যাত্রা প্রমাণ করে, বাংলাদেশের তরুণরা বিশ্বমানের প্রযুক্তি সেবা দিতে সক্ষম। দরকার শুধু সঠিক নেতৃত্ব, দৃঢ় সংকল্প আর স্বপ্ন দেখার সাহস। বিডিকলিং আইটি ও বেটোপিয়া গ্রুপ সেই স্বপ্নের জীবন্ত উদাহরণÑএটাই পজিটিভ বাংলাদেশের প্রেরণাদায়ক অধ্যায়।