লাবনী আক্তার শিমলা : প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, প্রকৃতির আকাশে মুক্তছন্দে নেচে চলে পাখি। পাখির আকাশে উড়তে দেখেই শিশুদের আকাশে উড়ার প্রবল ইচ্ছা জন্মায়। কিন্তু এই মুক্তছন্দে উড়ে চলা পাখির প্রতি আমাদের নেই সহানুভূতি। আমাদের মনে হতে পারে, পাখি আমাদের জন্য উপকারী কিছু নয়। অথচ পাখির পদচারণায় সমৃদ্ধ হয় দেশের অর্থনীতি, জনজীবন। পাখি শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এটি আমাদের কৃষি, স্বাস্থ্য, পর্যটন ও জলবায়ু স্থিতিশীলতার নীরব ভিত্তি। তাই যখন পাখি বিলুপ্ত হয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পরিবেশ, নগর, স্বাস্থ্য ও পরিবেশের স্বাভাবিক গতিময়তা।
পাখি পরিবেশের ‘বায়ো-ইন্ডিকেটর’ বা জৈব সূচক। তাদের প্রজাতির বৈচিত্র্য, সংখ্যা এবং আচরণ পরিবেশের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সরাসরি তথ্য দেয়। আন্তর্জাতিক সংস্থা Bird Life International এর মতে, বিশ্বব্যাপী পাখি প্রজাতির ৪৮% হ্রাস পাচ্ছে। গত কয়েক দশকে ঢাকায় পাখির প্রজাতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৭০০-এর বেশি পাখি প্রজাতির মধ্যে বহু পাখি এখন হুমকির মুখে। এর মধ্যে ১৭টি সমূহ বিপন্ন। এটি নগরের বায়ু ও শব্দ দূষণ, সবুজাঞ্চল হ্রাস এবং জলাশয় ভরাটের ভয়াবহতার প্রতি ইঙ্গিত করে।
শকুন পরিবেশের বর্জ্য খেয়ে পরিষ্কার করে। বাংলাদেশ বন বিভাগের তথ্য মতে, সুন্দরবনে শকুনের সংখ্যা ২০০৮ সালে ছিল ২৬৫টি, যা ২০২২ সালে নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১২১টিতে। এটি বাস্তুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক সংকেত। জলাভূমির পাখি, বিশেষ করে পরিযায়ী পাখি, আমাদের জলসম্পদের মান ও প্রাচুর্যের নির্দেশক। বাংলাদেশ বন বিভাগ ও আইইউসিএন-এর ২০২৩ সালের যৌথ জরিপ বলছে, সিলেটের টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রতি বছর ৭০-৮০ হাজার পরিযায়ী পাখি আসে। এই সংখ্যার স্থিতিশীলতা বা বৃদ্ধি হাওড়ের বাস্তুতন্ত্রের তুলনামূলক ভালো অবস্থা নির্দেশ করে। বিপরীতে, খাল-বিল ভরাট ও দূষণের কারণে ঢাকার আশপাশের জলাশয়গুলো থেকে জলচর পাখির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমেছে।
পাখি প্রাকৃতিক কীটনিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করে। বারি (বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট)-এর ২০২২ সালের গবেষণা বলছে, ধানক্ষেতে বাটান, বুলবুলি, ফিদ্দাসহ বিভিন্ন পাখি প্রতি হেক্টরে গড়ে ২০-৩০ কেজি ধান ক্ষতিকর পোকা (যেমন: গান্ধি পোকা, লেদাপোকা) থেকে রক্ষা করে, যা রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর কৃষকের নির্ভরতা ১৫-২০% কমাতে পারে। তারা প্রতি হেক্টরে গড়ে ২০-২৫ কেজি ধান বাঁচায় কীটপতঙ্গ থেকে, যা দেশের বার্ষিক চাল উৎপাদনে অতিরিক্ত ফলনে সাহায্য করে।
পাখির সহায়তায় কীটনাশকের খরচও কমানো সম্ভব। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ২০২১ সালের প্রতিবেদন অনুসারে, পাখি নির্ভর বালাই ব্যবস্থাপনা চালু করলে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার ২০-৩০% কমানো সম্ভব, যা কৃষকের উৎপাদন খরচ বছরে প্রতি হেক্টরে ৫,০০০-৭,০০০ টাকা কমাবে।
পাখি শুধু কীটনাশকের ভূমিকা পালন করে না, একইসঙ্গে ইঁদুর জাতীয় ক্ষতিকর প্রাণী থেকেও ফসল ও অন্যান্য দ্রব্যাদি রক্ষা করে। আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘Biological Control’ (২০২০) এ প্রকাশিত এক গবেষণা দেখায়, শিকারি পাখি (যেমন: চিল, শঙ্খচিল) ইঁদুরের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে, যা ধান ও গমের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্ষতি রোধ করে।
কৃষির এই মিত্রকে আমরাই হত্যা করে চলেছি জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগের মাধ্যমে। প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের ২০২২ সালের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, রাসায়নিক কীটনাশকের প্রভাবে দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে শস্যক্ষেত্রের পাখির সংখ্যা গত দশকে ৪০% হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে পোকামাকড়ের আক্রমণ বেড়ে যায়, যা ‘পেস্টিসাইড ট্রেড’ তৈরি করে এবং কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়।
পাখি-ভিত্তিক ইকোট্যুরিজম বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি সম্ভাবনাময় খাত। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের ২০২৩ সালের তথ্য মতে, শুধুমাত্র সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে পাখি দেখতে প্রতিবছর প্রায় ৫০,০০০ দেশি-বিদেশি পর্যটক ভ্রমণ করেন, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে সরাসরি প্রায় ২০ কোটি টাকা আয় সৃষ্টি করে হোটেল, বোটিং, গাইড ও স্থানীয় পণ্য বিক্রির মাধ্যমে। একইভাবে, খুলনার সুন্দরবনে শীত মৌসুমে পাখি পর্যবেক্ষকদের আনাগোনা বৃদ্ধি পায়।
এটি শুধু আয়ই তৈরি করে না, বরং সংরক্ষণের অর্থায়নেও সহায়তা করে। বন বিভাগের তথ্য অনুসারে, টাঙ্গুয়ার হাওর এলাকায় স্থানীয় সম্প্রদায়ের প্রায় ৫০০ জনকে গাইড ও বনরক্ষী হিসেবে প্রশিক্ষণ দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা বিকল্প জীবিকা সৃষ্টি করে। এর ফলে তারা পাখি সংরক্ষণে আগ্রহী ও তৎপর হয়।
পাখিরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রাথমিক সতর্কতা। তাদের অভিপ্রায়ণ প্যাটার্ন, প্রজনন সময় ও আবাসস্থলের পরিবর্তন বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মাপকাঠি। বিশ্বজুড়ে অনেক পরিযায়ী পাখির আগমন ও প্রস্থানের সময় পরিবর্তিত হচ্ছে, যা জলবায়ু ও আবহাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ইঙ্গিত। বাংলাদেশে, ‘বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব’-এর ৩০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ বলে, আগে যেসব পরিযায়ী পাখি নভেম্বরে আসত, তারা এখন ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে আসছে, আর যারা মার্চে ফিরে যেত, তারা এখন ফেব্রুয়ারিতেই চলে যাচ্ছে। এই শিফট স্থানীয় পাখির সঙ্গে খাদ্য ও বাসস্থানের প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করছে।
উপকূলীয় অঞ্চলে, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও ম্যানগ্রোভ বন উজাড়ের কারণে জলচর পাখির আবাস সংকুচিত হচ্ছে। IUCN Bangladesh-এর ২০২১ সালের লাল তালিকা অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিপন্ন পাখি প্রজাতির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১টি, যার বেশিরভাগই জলবায়ু পরিবর্তন ও আবাসস্থল হারানোর কারণে হুমকির মুখে।
প্রকৃতির সকল প্রাণী একটি খাদ্যজালের মাধ্যমে সংযুক্ত। পাখি এই জালের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তারা একদিকে যেমন ছোট পোকামাকড়- খেয়ে তাদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে, অন্যদিকে নিজেরা বড় প্রাণীর খাদ্য হয়। এই ভারসাম্য যখন ভেঙে যায়, তখন পুরো বাস্তুতন্ত্রটাই বিপর্যস্ত হয়। যেমন- মশা হাঁস কমে গেলে মশার বংশবৃদ্ধি বেড়ে যায়, ডেঙ্গু-ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি বাড়ে। পাখি সংরক্ষণ সে রকম সরাসরি জনস্বাস্থ্য রক্ষার সঙ্গে জড়িত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী, শকুনের মতো পাখি মৃত প্রাণী দ্রুত সরিয়ে রেবিস ও অ্যানথ্রাক্সের মতো রোগ ছড়ানো রোধ করে।
পাখি কি শুধুই প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার্থে সাহায্য করে? উত্তর হল, না। পাখি এমন একটি প্রাকৃতিক আশীর্বাদ যা আমাদের জীবনের অত্যন্ত অবহেলিত মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সাহায্য করে থাকে। সাইকোলজিক্যাল সায়েন্স জার্নালের গবেষণা (২০২১) প্রমাণ করে, পাখির ডাক ও উপস্থিতি মানসিক চাপ কমায় এবং উৎপাদনশীলতা ও কাজের উৎসাহ বাড়ায়। পাখির ডাক মানুষের মস্তিষ্কে অনৈচ্ছিক নির্দেশনা তৈরি করে এই শব্দ মস্তিষ্কের প্যারাসিম্প্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্র সক্রিয় করে, যা শিথিলতা বাড়ায়। বাংলাদেশের মতো দ্রুত নগরায়ন হওয়া দেশে, যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য সংকট বাড়ছে এবং কর্মদক্ষতা উন্নয়ন প্রয়োজন, সেখানে পাখি ও প্রকৃতির সংরক্ষণ একটি সাশ্রয়ী জনস্বাস্থ্য কৌশল হতে পারে।
গ্রামীণ অর্থনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে পাখি। অথচ কৃষকসহ অনেকের নেই ন্যূনতম সচেতনতা, নেই পাখির নিয়ে চিন্তভাবনা। অধিকাংশ কৃষক পাখির অর্থনৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত নন। এই অজ্ঞতার কারণে পাখি শিকার, ডিম সংগ্রহ, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার যা এই প্রাকৃতিক সহযোগীদের মেরে ফেলে।
পাখি শিকারের বাণিজ্য বহু পুরনো সময় থেকে চলে এসেছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির তথ্য (২০২২) মতে, প্রতিবছর ২৫,০০০-৩০,০০০ পাখি দেশে অবৈধ শিকারের শিকার হয়। এই শিকারের পেছনে মূল কারণ হল খাদ্যের অভাব বিশেষত প্রোটিনের চাহিদা পূরণ, বিক্রি করে অর্থ উপার্জন এবং বিনোদন লাভ।
পরিবেশ অধিদপ্তরের রিপোর্ট বলছে, দেশের ৪০% জলাভূমি ভরাট বা দূষণের শিকার, যা জলচর পাখির ৬০% প্রজাতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। পাখির বাসা ও প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস যেমন খাদ্যের উৎস (ছোট মাছ, পোকা) নিশ্চিহ্ন করা, বিশ্রাম ও অভিপ্রয়াণের বিরতিস্থল হারানো। এর প্রভাব শুধু পাখির ওপর নয়। এর ফলে জলাভূমি ভরাট হয়, বন্যার ঝুঁকি বাড়ে, কৃষির ক্ষতিসাধন করে। ফলে কৃষকের ক্ষতি হয় আর্থিক ও পরিশ্রমের দিক থেকে। এছাড়া পাখি হত্যা করা হলে প্রাকৃতিক জল শোধন ব্যবস্থা নষ্ট হয়। এতে পানির মান কমে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে।
দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য পাখি সংরক্ষণ এখন থেকেই জরুরি। এজন্য নিতে হবে জরুরি পদক্ষেপ। প্রথমত, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও মনিটরিং জোরদার করতে হবে। বাংলাদেশে পাখি সম্পর্কিত পদ্ধতিগত জরিপ ও ডাটাবেজ খুবই সীমিত। বার্ষিক পাখিশুমার নিয়মিতকরণ ও ডিজিটাল ম্যাপিং করা দরকার। দ্বিতীয়ত, এগ্রো-ইকোলজিকাল চর্চা উৎসাহিত করতে হবে। কৃষি নীতিতে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা ও জৈব কৃষিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে পাখি-বান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, ইকোট্যুরিজম নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। পাখির আবাসের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এমন পর্যটন রোধ করে টেকসই ইকোট্যুরিজম নীতিমালা কার্যকর করা জরুরি। চতুর্থত, নগর পরিকল্পনায় সবুজ করিডোর এর প্রকল্প তৈরি করতে হবে। শহরে পার্ক, জলাশয় ও বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পাখির অভয়াশ্রয় তৈরি করতে হবে। সর্বোপরি, সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। পাখি শিকার ও ডিম সংগ্রহ রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
প্রকৃতি জীবনের আধার, এই আধারকে আরও সুস্থ ও সুন্দর করে তুলে পাখি। তাই পাখির প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে। পাখির প্রজনন বৃদ্ধি ও এর বিলুপ্তি রক্ষায় আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। শিশু, বৃদ্ধ থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে পাখির প্রতি সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। পাখি বাঁচলে কৃষি বেঁচে থাকবে, বজায় থাকবে সুস্বাস্থ্য ও বাস্তুতন্ত্র।
শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post