একসময় দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস ছিল পাট ও পাটজাত পণ্য। ‘সোনালি আঁশ’ নামে পরিচিত এই তন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাট খাতের সেই গৌরব অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়লেও দেশের পাট খাত এখনও কাক্সিক্ষত বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও বহুমুখীকরণের অভাবে সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগাতে পারছে না। পাট খাতের বর্তমান অবস্থা, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে শেয়ার বিজের সঙ্গে কথা বলেছেন জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেডিপিসি) পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. জাহিদ হোসেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি
শেয়ার বিজ: দেশে পাটের বহুমুখী পণ্যের বর্তমান অবস্থা কী?
মো. জাহিদ হোসেন: বর্তমানে দেশে পাটের বহুমুখী পণ্যের সংখ্যা প্রায় ২৮২টির মধ্যে সীমাবদ্ধ। অথচ আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে এই সংখ্যা এক হাজার একশরও বেশি। কাঁচা পাট উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশ অনেক সময় প্রথম বা দ্বিতীয় অবস্থানে থাকে। কিন্তু মূল্য সংযোজিত পণ্য তৈরির ক্ষেত্রে আমরা এখনও অনেক পিছিয়ে আছি। বাংলাদেশ থেকে কাঁচা পাট আমদানি করে ভারত ও চীন সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করে উচ্চমূল্যের পণ্য হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করছে। ফলে প্রকৃত মূল্য সংযোজনের সুবিধা আমরা পাচ্ছি না। এ জায়গায় আমাদের বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে।
শেয়ার বিজ: জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টারের ভূমিকা কী?
মো. জাহিদ হোসেন: জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার বা জেডিপিসি ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও দীর্ঘ সময় এটি একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পায়নি। ফলে কাক্সিক্ষত কার্যক্রম বাস্তবায়নে নানা সীমাবদ্ধতা ছিল। তবে সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। ২০২৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে এটি একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে ‘জেডিবিসিপিএল’ নামে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করেছে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি এখন আরও কার্যকরভাবে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে। বর্তমানে আমরা প্রতিষ্ঠানটির পরিশোধিত মূলধন বৃদ্ধি, ট্রাস্ট বা এনডাউমেন্ট ফান্ড গঠন এবং দেশি-বিদেশি দাতাদের সহায়তা আনার উদ্যোগ নিয়েছি।
পাশাপাশি সরকারের সংশ্লিষ্ট সচিব ও মন্ত্রণালয় এই খাতের উন্নয়নে আন্তরিকভাবে কাজ করছেন।
শেয়ার বিজ: পাট খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা আপনি কীভাবে দেখছেন?
মো. জাহিদ হোসেন: কাঁচা পাট রপ্তানির যুগ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এখন সময় পাটকে ব্যবহার করে হাই-ভ্যালু, বহুমুখী এবং পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরি করে বিশ্ববাজারে পৌঁছে দেওয়ার। এতে যেমন দেশের রপ্তানি আয় বাড়বে, তেমনি শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ আসবে এবং কর্মসংস্থানও বৃদ্ধি পাবে। পাট খাতের পুনর্জাগরণ ঘটানোর জন্য এই পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পরিবেশবান্ধব পণ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। বিভিন্ন দেশ প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে বিকল্প উপকরণ খুঁজছে। এই বাস্তবতায় পাট একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় উপাদান হিসেবে সামনে এসেছে। পাট দিয়ে তৈরি ব্যাগ, শপিং ব্যাগ, টেবিলম্যাট, জুট কম্পোজিট, জিও-টেক্সটাইল, হোম ডেকরসহ নানা ধরনের পণ্যের চাহিদা আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত বাড়ছে। আমরা যদি সঠিকভাবে পণ্যের মান বজায় রেখে বাজার ধরতে পারি, তাহলে পাট বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাতে পরিণত হতে পারে।
শেয়ার বিজ: কাঁচাপাট রপ্তানির পরিবর্তে মূল্য সংযোজিত পণ্যে জোর দেওয়ার প্রয়োজন কেন?
মো. জাহিদ হোসেন: বিষয়টি খুবই পরিষ্কার। আমরা যদি কাঁচা পাট রপ্তানি করি, তাহলে আমরা কেবল কাঁচামালের দামটাই পাই। কিন্তু বিদেশে সেই পাট ব্যবহার করে যখন উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরি হয়, তখন সেই মূল্য সংযোজনের সুবিধা আমরা পাই না। ফলে দেশের শিল্পকারখানা, শ্রমিক ও উদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমি চাই, বাংলাদেশে উৎপাদিত পাট এখানেই প্রক্রিয়াজাত হোক। এখানেই নতুন শিল্প গড়ে উঠুক এবং এখানেই মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হোক। এতে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং যুবসমাজের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। তাই আমাদের কাঁচা পাট রপ্তানির পরিবর্তে বহুমুখী পণ্য রপ্তানির দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
শেয়ার বিজ: এ ক্ষেত্রে জেডিপিসির কী ধরনের উদ্যোগ রয়েছে?
মো. জাহিদ হোসেন: আমরা শুরু থেকেই ভ্যালু অ্যাডেড পণ্য উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। স্থানীয় কারিগরদের দক্ষতা বৃদ্ধি, নতুন ডিজাইন উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার বিষয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করছি। এ ছাড়া বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পাটপণ্যের ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে নতুন বাজার তৈরির চেষ্টা করছি। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছেÑ‘মেড ইন বাংলাদেশ প্রডিউস’ যেন আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে একটি বিশ্বস্ত ও আকর্ষণীয় ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
শেয়ার বিজ : পাট খাতের উন্নয়নে আপনার পরামর্শ কী ?
মো. জাহিদ হোসেন: পাট খাতের উন্নয়নে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দ্রুত অগ্রগতি প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে মূলধন বৃদ্ধি, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন।
বিশেষ করে ডিজাইনিং ও পণ্য উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে পাটের ব্যাগ, কিছু জুয়েলারি আইটেম এবং হোম ডেকরের মধ্যেই বৈচিত্র্য সীমিত। নতুন নকশা ও প্রযুক্তি যুক্ত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা অনেক বেশি বাড়বে।
