Print Date & Time : 1 May 2026 Friday 12:59 am

পাথর সংকটে বন্ধ বাঁশখালী বেড়িবাঁধ প্রকল্পের কাজ

রিয়াদুল ইসলাম, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম): যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ। আরব আমিরাত (দুবাই) থেকে পাথরবাহী লাইটার জাহাজ আসতে না পারায় পাথর সংকটে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে চলমান ৫০০ কোটি টাকার বেড়িবাঁধ প্রকল্পের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকট, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি ও স্থানীয় রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের উপর্যুপরি বাধার মুখে বেড়িবাঁধ প্রকল্পের কাজ স্থবির হয়ে পড়ায় আসন্ন বর্ষায় জলোচ্ছ্বাসের শঙ্কায় বাঁশখালী উপকূলবাসী।
সরেজমিন দেখা যায়, ‘বাঁশখালী উপকূলের ৫০০ কোটি টাকার বেড়িবাঁধ প্রকল্পের তিন ঠিকাদারের পাঁচটি নির্মাণ প্রকল্প সাইটের সবকটি সাইটে পাথর সংকটের কারণে সিসি ব্লক কাস্টিং কাজ বন্ধ রয়েছে। এসব নির্মাণ সাইটে দীর্ঘ অপেক্ষার পরও পাথর সংকটের সমাধান না হওয়ায় চলে গেছেন নির্মাণ শ্রমিকরা। অপরদিকে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং তেল সংকটের কারণে সিলেটি বালি ও বেতাগি বালির সংকট দেখা দিয়েছে। যার কারণে বাঁশখালীর সাধনপুর, খানখানাবাদ, বাহারছড়া ও ছনুয়ায় বেড়িবাঁধ প্রকল্পের পাঁচ প্রকল্প সাইটে ব্লক কাস্টিং কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
এ ছাড়া প্রকল্প এলাকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় সিন্ডিকেটের উপর্যুপরি বাধা-হুমকির মুখে স্থবির হয়ে পড়েছে বেড়িবাঁধের চলমান জিও ব্যাগ ডাম্পিং কাজ। যার কারণে বাঁশখালী উপকূলের বঙ্গোপসাগর ঘেঁষা ৩২ কিলোমিটার অরক্ষিত বেড়িবাঁধ সংলগ্ন এলাকায় আসন্ন বর্ষা মৌসুমে নতুন করে জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অপরদিকে এই প্রকল্পে পাথর সংকট সৃষ্টি, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি ও হুমকি-বাধার মুখে পড়ায় নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, ‘২০২৪ সালে মে মাসে বাঁশখালীর উপকূল রক্ষায় ৫০০ কোটি টাকার প্রকল্পটি একনেকে পাস হয়। এরপর দেশের বিশৃঙ্খলার সুযোগে নানা বাধা-বিপত্তির পর ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। এই প্রকল্পে বাঁশখালীর উপকূলবর্তী ছনুয়া, খানখানাবাদ ও বাহারছড়া অংশে ৬.৪ কিলোমিটার সমুদ্র উপকূলবর্তী বাঁধের ঢাল সংরক্ষণ, ভাঙন রোধ ও পুনরাকৃতীকরণ, অপরদিকে সাধনপুর অংশে সাঙ্গু নদীর ১.১ কিলোমিটার তীর রক্ষায় বাঁধ নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। এর মধ্যে ছনুয়া বাঁধের ঢাল সংরক্ষণ ও ভাঙন রোধে ৬টি প্যাকেজ ও সাধনপুরে নদীর তীর রক্ষা বাঁধে ১টি প্যাকেজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড (পিডিএল), খানখানাবাদে বাঁধের ঢাল সংরক্ষণ ও ভাঙন রোধে ৩টি প্যাকেজে যৌথভাবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পিডিএল ও ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং, একই এলাকায় ২টি প্যাকেজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জামিল ইকবাল, বাহারছড়ায় বাঁধের ঢাল সংরক্ষণ ভাঙন রোধে ১টি প্যাকেজ ও সাধনপুর সাঙ্গু নদীর তীর রক্ষায় ১টি প্যাকেজে কাজ করছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হাসান অ্যান্ড ব্রাদার্স।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জামিল ইকবালের প্রজেক্ট ম্যানেজার ইঞ্জিনিয়ার মো. আরিফ বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় পাথর সংকটের কারণে গত এক মাস ধরে সিসি ব্লক কাস্টিং কাজ বন্ধ রয়েছে। মধ্যেপ্রাচ্যের দুবাই ছাড়া অন্য দেশ থেকে পাথর আনতে গেলে দ্বিগুণ দাম দিতে হচ্ছে। বিকল্প উপায়ে পাথর সংগ্রহ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। জ্বালানি তেল সংকট ও নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। বালি সংগ্রহ ও জিওব্যাগ ডাম্পিংয়ের জন্য সাপ্লায়ার পাওয়া যাচ্ছে না। তবে দুই-একদিনের মধ্যে জিওটিউব ও জিওব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ শুরু করার চেষ্টা চলছে।’
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পিডিএলের প্রজেক্ট ম্যানেজার মিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘মার্চের শেষ দিকে সর্বশেষ পাথরের জাহাজ এসেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় আর পাথর আসেনি। আমরা মূলত দুবাইয়ের পাথরটা ব্যবহার করি। এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পাথর সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়েছে। গত ১৫ দিন ধরে খানখানাবাদ, ছনুয়া ও সাধনপুরের সাইটে পাথরের কারণে ব্লকের কাস্টিং কাজ বন্ধ রয়েছে। আমরা লোকাল ও ইন্ডিয়ান পাথর সংগ্রহের চেষ্টা করছি এখন। পাথর আসলে কাজ শুরু করা হবে। জ্বালানি তেল সংকট ও নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণে বেগ পেতে হচ্ছে আমাদের। এ ছাড়া প্রকল্প এলাকার বিভিন্ন সিন্ডিকেটের অনবরত হুমকি-বাধার মুখে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে যে দেশের কোথাও আমরা এমন বাধার সম্মুখীন হয়নি।’
ছনুয়া ইউনিয়নের (ভারপ্রাপ্ত) চেয়ারম্যান নুরুল আমিন ছানুবী বলেন, ‘আমাদের ছনুয়ায় বর্ষা মৌসুম শুরুর আগে বেড়িবাঁধ সংস্কার করা জরুরি। না হয় বর্ষায় জলোচ্ছ্বাসে ছনুয়া বিভিন্ন নিচু অংশ বঙ্গোপসাগরের নোনা পানিতে প্লাবিত হবে। পাথর ও তেল সংকটের কারণে কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়া আমাদের জন্য বড় দুঃসংবাদ। ছনুয়া ইউনিয়নবাসীর দাবিÑবর্ষা মৌসুমের আগে পুনরায় প্রকল্পের কাজ শুরু করে প্রাথমিকভাবে জরুরি ভিত্তিতে উপকূলবর্তী বেড়িবাঁধ কিছুটা হলেও সংস্কার করতে হবে।’
পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী অনুপম পাল বলেন, ‘ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় পাথর সংকটে প্রকল্পে সিসি ব্লক কাস্টিং বন্ধ রয়েছে। ঠিকাদাররা বিকল্প উপায়ে লোকাল ও ইন্ডিয়া থেকে পাথর সংগ্রহ করার চেষ্টা করছেন। এরপরও ঠিকাদারদের চিঠি দেওয়া হয়েছে, যাতে তাঁরা দ্রুত কাজ শুরু করেন। জ্বালানি সংকট ও দাম বৃদ্ধির কারণে নির্মাণ সামগ্রীর দাম বেড়েছে। যার কারণে ঠিকাদারদের বেগ পেতে হচ্ছে। এ ছাড়া প্রকল্প এলাকায় স্থানীয় কিছু সিন্ডিকেটের হুমকি-বাধার কারণে নির্দিষ্ট সময়ে ডাম্পিং ও কাস্টিং কাজ করতে পারছেন না ঠিকাদাররা। যার কারণে নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করার অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।’