এফ আই মাসউদ : দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকার কথা বারবার জানানো হলেও বাস্তবে তেল সংগ্রহে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে চরম ভোগান্তি। তেল সংকটের শঙ্কায় আগাম টিকিট বিক্রি করছে না বাস কাউন্টারগুলো। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘলাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক চালক জ্বালানি পাচ্ছেন না। মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের চালকদের এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ঘুরতে হচ্ছে তেলের আশায়। কোথাও সীমিত পরিমাণে জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় পাম্প সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন মালিকরা। ফলে যাত্রী ও চালকদের দুর্ভোগ বাড়ছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পাম্পের সামনে এক থেকে দেড় কিলোমিটার পর্যন্ত গাড়ির সারি দেখা গেছে। কল্যাণপুর, কালশী, মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও বিজয়সরণি এলাকার বেশ কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে একই চিত্র দেখা যায়। কিছু পাম্পে ডিজেল বা অকটেন আলাদাভাবে বিক্রি করা হলেও অনেক জায়গায় জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ায় বিক্রি বন্ধ রাখতে হয়েছে। বিজয়সরণির মোড়ে একটি ফিলিং স্টেশনের সামনে ব্যক্তিগত গাড়ির সারি মহাখালী পর্যন্ত পৌঁছাতে দেখা গেছে। মোটরসাইকেলের লাইনও দীর্ঘ হয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ফটক পর্যন্ত চলে গেছে।
অনেক চালক জানিয়েছেন, কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও তারা প্রয়োজনীয় তেল পাচ্ছেন না। কেউ কেউ তিন থেকে চারটি পাম্প ঘুরেও জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছেন না।
ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালানো সিরাজুল ইসলাম বলেন, তেলের জন্য প্রতিদিন তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় নষ্ট হচ্ছে। তারপরও দুই লিটারের বেশি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে আয়ও কমে গেছে।
নিয়মিত রাইড শেয়ারিং করা মোটরসাইকেলচালক মেহেদী হাসান শেয়ার বিজকে বলেন, অনেক পাম্প বন্ধ রয়েছে, যার কারণে যেগুলো খোলা আছে, সেগুলোতে অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। অনেকেই বাড়ি যাওয়ার জন্য বাড়তি তেল নিচ্ছেন।
বনশ্রী ফিলিং স্টেশনে প্রাইভেটকারে তেল নেওয়ার জন্য দীর্ঘলাইনে দাঁড়িয়ে থাকা রুবেল আহমেদ বলেন, দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকেও এখনও তেল নিতে পারেনি। তিনি বলেন, প্রত্যেকে যদি প্রয়োজন অনুযায়ী তেল নেয়, তাহলে সংকট অনেকটাই কমে যাবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল নেওয়ার কারণে সংকট তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
পণ্য ও যাত্রী পরিবহনেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিভিন্ন পরিবহন চালকরা জানিয়েছেন, ডিজেল না পাওয়ায় অনেক সময় গাড়ি নির্ধারিত সময়ে চালানো যাচ্ছে না। কিছু পাম্পে ট্রাক ও বাসে তেল বিক্রির পরিমাণও সীমিত করা হয়েছে। এতে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি তেলের সম্ভাব্য সংকটের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ফিলিং স্টেশন থেকে তেল বিক্রিতে সীমা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। নির্দেশনা অনুযায়ী মোটরসাইকেলে দিনে সর্বোচ্চ দুই লিটার পেট্রোল বা অকটেন দেওয়া হচ্ছে। ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে ১০ লিটার, এসইউভি বা মাইক্রোবাসে ২০ থেকে ২৫ লিটার, পিকআপ বা লোকাল বাসে ৭০ থেকে ৮০ লিটার এবং দূরপাল্লার বাস ও ট্রাকে ২০০ থেকে ২২০ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ডিপো থেকে পাম্পগুলোকে তেল বরাদ্দেও রেশনিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে, যার ফলে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ কম জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সুযোগ নিয়ে অবৈধভাবে তেল মজুত করছেন-এমন অভিযোগও উঠেছে। সরকার বলছে, কৃত্রিম সংকট তৈরি ঠেকাতে কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে। জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত, বেশি দামে বিক্রি ও পাচার প্রতিরোধে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ফিলিং স্টেশনগুলোতে পুলিশি টহল বাড়ানো হয়েছে।
জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বিপিসি কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে মনিটরিং ও কন্ট্রোল সেল গঠন করেছে। চট্টগ্রামে বিপিসির কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল স্থাপন করা হয়েছে এবং ঢাকা, বগুড়া, খুলনা, সিলেট ও বরিশালে আঞ্চলিক কন্ট্রোল সেল কাজ শুরু করেছে। এসব সেল প্রতিদিন ডিপোগুলোর জ্বালানি মজুত, সরবরাহ ও বিক্রির তথ্য সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে পাঠাবে।
বিপিসির পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তেল ডিপোগুলোর নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা, খুলনার দৌলতপুর, সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী, নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ও ফতুল্লা, দিনাজপুরের পার্বতীপুর এবং বরিশালের ডিপোগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে চিহ্নিত করে সেগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সরকার বলছে, বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব মোকাবিলায় অতিরিক্ত জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এপ্রিল মাসের জন্য প্রায় তিন লাখ টন ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ থেকে তেল সংগ্রহ করা হবে।
ভারত থেকেও জ্বালানি আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভারতের নুমালিগড় থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে বছরে এক লাখ ৮০ হাজার টন জ্বালানি আমদানির চুক্তি রয়েছে বাংলাদেশের। বর্তমানে সেই সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা চলছে। পাশাপাশি নৌপথে ভারত থেকে অতিরিক্ত তেল আনার পরিকল্পনাও রয়েছে। এছাড়া ব্রুনাইসহ অন্যান্য দেশ থেকেও ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, বাজারে গুজব এবং হঠাৎ চাহিদা বৃদ্ধির কারণে সাময়িকভাবে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনিক নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে সক্রিয় রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্রই তুলে ধরছে। রাজধানী থেকে জেলা শহরÑ সবখানেই তেলের জন্য দীর্ঘলাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের। কোথাও কয়েক ঘণ্টা দাঁড়িয়েও সীমিত জ্বালানি মিলছে, আবার কোথাও পাম্পে তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় বিক্রি বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষ, পরিবহন খাত এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বাড়ছে।
সরকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও তেল সংগ্রহে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ এখনো কাটেনি। বরং রেশনিং ব্যবস্থা চালুর পর অনেকের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করা না গেলে দেশের পরিবহন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরও বড় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মহাখালী বাস টার্মিনালের বিভিন্ন পরিবহন কোম্পানির কাউন্টার সূত্রে জানা গেছে, চলমান জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক বাসের চলাচল সীমিত করা হয়েছে এবং ঈদের আগাম টিকিট বিক্রিও স্থগিত রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যাত্রার সময় তেল না পাওয়া গেলে যাত্রীদের সঙ্গে বিরূপ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারেÑ এই আশঙ্কায় নতুন করে টিকিট বিক্রি করতে তারা অনীহা দেখাচ্ছেন।
বিলাস, একতা, এনা ও এসআর ট্রাভেলসসহ কয়েকটি পরিবহন কোম্পানির কর্মকর্তারা জানান, কিছু বাসের আগাম টিকিট ইতোমধ্যে বিক্রি হয়ে গেলেও বর্তমান পরিস্থিতির কারণে নতুন করে টিকিট ছাড়া হচ্ছে না। অনেক যাত্রী টিকিটের জন্য এলেও তেলের অনিশ্চয়তার কারণে তাদের ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, একটি বাস চালাতে বিভিন্ন পাম্প থেকে অল্প অল্প করে তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে, এতে সময় ও ভোগান্তি দুটোই বাড়ছে। তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অনেক পরিবহন কোম্পানি ঈদের টিকিট বিক্রি স্থগিত রেখেছে।
দেশে ভোজ্যতেল বা জ্বালানি তেলÑ কোনোটিরই সংকট নেই, বরং পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
গতকাল সোমবার সচিবালয়ে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মন্ত্রী বলেন, দেশে মাসে গড়ে দুই লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা থাকলেও রমজানে তা কিছুটা বেড়ে যায়। তবে সরকারি হিসাব অনুযায়ী পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমদানিকারক ও রিফাইনারি মালিকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বাজারে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। আমাদের পরিস্থিতি পর্যালোচনার মূল উদ্দেশ্য ছিল সরবরাহ নিশ্চিত করা। আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে বাজারে কোনো ঘাটতি নেই।
ভোক্তাদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, কোথাও কোথাও আতঙ্কিত হয়ে বেশি বেশি কেনার প্রবণতার কারণে সাময়িকভাবে কিছু দোকানে মজুত শেষ হয়ে যেতে পারে। নিজের একটি অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, রাজধানীর একটি বাজারে গিয়ে দেখেছি প্রধান সড়কের দোকানগুলোতে তেলের দাম নির্ধারিতই আছে। তবে বাজারের ভেতরের একটি দোকানে সীমিত তেল রেখে লিটারে দুই থেকে তিন টাকা বেশি নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল।
তিনি আরও বলেন, আতঙ্কিত হয়ে বেশি বেশি কেনার কোনো প্রয়োজন নেই। পণ্য পর্যাপ্ত আছে, তাই অযথা প্রতিযোগিতা করলে অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিতে পারে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, অলরেডি একটা জাহাজ নোঙ্গর নিয়েছে এবং আরেকটা নেওয়ার কথা। এই দুইটা জাহাজ থেকে তেল ডেলিভারি করার পরে মজুতটা আরও বাড়বে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, আমরা যাচ্ছে-তাই খরচ করব। আমরা রেশনিংটি চালিয়ে যাব- যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত। মানুষের মধ্যে বিরোধীরা আতঙ্ক ছড়িয়েছে, আমরা হয়তো এই যুদ্ধের কারণে বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দেব। আমি আশ্বস্ত করেছি, আপাতত আমরা বিদ্যুতের দাম বাড়াচ্ছি না। সুতরাং দাম বাড়বে বলে ভয়ে তেল মজুদ করবেন- এটা ঠিক হবে না।
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post