মাজিদুল ইসলাম উজ্জ্বল : বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) মধ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পার্বত্য শান্তি চুক্তি ছিল দেশের ইতিহাসে এক মাইলফলক। প্রায় দুই দশক ধরে চলা সশস্ত্র বিদ্রোহ, পাহাড়ি-বাঙালি দ্বন্দ্ব ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটানোর প্রত্যাশায় এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল পাহাড়ে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবতার চিত্র একেবারেই ভিন্ন। প্রায় ২৮ বছর পেরিয়ে গেলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম এখনও অশান্ত, এখনও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দ্বন্দ্বে সাধারণ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে।
চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল সেনা প্রত্যাহার। এর আংশিক বাস্তবায়নও ঘটেছে, তবে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এখনও হয়নি এবং প্রকৃতপক্ষে হওয়াও সম্ভব নয়। পাহাড়ি এলাকায় বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে অনেকগুলো ছোট-বড় সশস্ত্র গোষ্ঠী, যাদের মধ্যে অন্তঃদ্বন্দ্ব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পার্বত্য অঞ্চলে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে প্রায় ৫০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের বেশির ভাগই পাহাড়ি। সেনাবাহিনী ও বিজিবির উপস্থিতি না থাকলে এ অঞ্চল অচিরেই ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে রূপ নেবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কেননা যখনই সেনা ক্যাম্প তুলে নেয়া হয়েছে, তখনই সেখানে নতুন করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক দিক থেকেও পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল অঞ্চল। এটি ভারতের ত্রিপুরা, মিজোরাম, মিয়ানমার ও চট্টগ্রামের সমতল ভূমির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এ কারণে এই অঞ্চল কেবল পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জন্য নয় বরং আন্তর্জাতিক সীমান্ত নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্র্রতিক বছরগুলোতে মাদক চোরাচালান ও অস্ত্র পাচারের প্রবণতা ভয়াবহভাবে বেড়েছে। ২০২৩ সালে কক্সবাজার-রাঙামাটি সীমান্ত দিয়ে শুধু ইয়াবা ট্যাবলেটের চালানই ধরা পড়েছে ২০ কোটি টাকার বেশি। এছাড়া প্রতিনিয়ত উদ্ধার হচ্ছে অবৈধ অস্ত্র, যা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মিয়ানমার ও ভারত থেকে প্রবেশ করছে। গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, কিছু পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠী এই পাচার চক্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত এবং তারা অস্ত্র ও মাদকের অর্থ দিয়ে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখছে। সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে আর তাতে গোটা দেশের জন্যই গুরুতর হুমকি তৈরি হবে।
শান্তি চুক্তির পর সরকার আশা করেছিল, পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ধারায় ফিরে আসবে। কিন্তু এখনও দেখা যাচ্ছে, অনেক গোষ্ঠী স্বায়ত্তশাসনের দাবি পুরোপুরি ছাড়েনি। প্রকাশ্যে কিংবা আড়ালে তারা পাহাড়কে ‘আলাদা সত্তা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। ইতিহাসে এমন অসংখ্য উদাহরণ আছে যেখানে স্বায়ত্তশাসনের দাবি শেষ পর্যন্ত একটি রাষ্ট্রকে মারাত্মক বিপর্যস্ত করে ফেলেছে। শ্রীলঙ্কায় তামিলদের স্বাধীন রাজ্যের দাবিই তিন দশকের ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ সৃষ্টি করেছিল, যেখানে সরকারি হিসাব অনুযায়ী এক লাখের বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। আফ্রিকার দক্ষিণ সুদানের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছেÑ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আলাদা রাষ্ট্র গঠিত হলেও আজও সেখানে গৃহযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও বিদেশি শক্তির প্রভাব শেষ হয়নি। বাংলাদেশের জন্যও এই অভিজ্ঞতা সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই চুক্তির শর্তে সেনা প্রত্যাহারের কথা বলা হলেও আজকের বাস্তবতার সঙ্গে এটা চরম সাংঘর্ষিক।
পরিসংখ্যান মতে, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে শুধু রাঙামাটি জেলায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাতে নিহত হয়েছে প্রায় ১৫০ জন। একই সময়ে অপহরণ, মুক্তিপণ, চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেছে কয়েকশ’। এ ধরনের অপরাধ প্রমাণ করে, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা আজও সম্ভব হয়নি। এই বাস্তবতায় শান্তি চুক্তিকে অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের বদলে আজ প্রয়োজন তার সংস্কার। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং পাহাড়ি জনগণের প্রকৃত শান্তি নিশ্চিত করাÑ এই দুইয়ের মধ্যে কোনো সংঘাত থাকা উচিত নয়। সেনাবাহিনীকে প্রত্যাহার করার বদলে আরও আধুনিক ও সুপরিকল্পিতভাবে সেখানে মোতায়েন করতে হবে, যাতে তারা শুধু নিরাপত্তাই নয়, বরং উন্নয়ন কার্যক্রমেও তারা ভূমিকা রাখতে পারে। চুক্তির আওতায় থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিরস্ত্রীকরণ কার্যকরভাবে নিশ্চিত করতে হবে এবং অস্ত্র জমা না দেয়া পর্যন্ত তাদের কোনো রাজনৈতিক সুবিধা দেয়া উচিত নয়। সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়াতে হবে, বিশেষ করে মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাহাড়ের নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও জনগণের ভবিষ্যৎকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শান্তি চুক্তিকে পুনর্বিবেচনা করার এটাই সঠিক সময়। যেন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
শিক্ষার্থী, আরবি ভাষা ও সাহিত্য
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
