Print Date & Time : 16 May 2026 Saturday 1:28 am

পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে পারে পর্যটন খাতে নতুন অর্থনৈতিক শক্তি

এম মহাসিন মিয়া: বাংলাদেশের নয়নাভিরাম পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়, এটি প্রকৃতির এক অনন্য বিস্ময়। পাহাড়, ঝর্ণা, নদী, লেক, বনভূমি, মেঘে ঢাকা উপত্যকা এবং বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছে। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান এই তিন পার্বত্য জেলা আজ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে এক আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।
বিশ্বের অনেক দেশ শুধু পর্যটন শিল্পের ওপর নির্ভর করেই তাদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে পারে একটি শক্তিশালী পর্যটন অর্থনীতির ভিত্তি। পরিকল্পিত উন্নয়ন, আধুনিক অবকাঠামো, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা গেলে এই অঞ্চল ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সত্যিই ব্যতিক্রমধর্মী। সাজেক ভ্যালির মেঘের রাজ্য, নীলগিরির পাহাড়ি দৃশ্য, কাপ্তাই লেকের শান্ত জলরাশি, আলুটিলা গুহা, দেবতাখুম, রিছাং ঝর্ণা, সোনাইছড়ি ট্রেইল কিংবা মানিকছড়ি ডিসি পার্কের মতো স্থানগুলো ইতোমধ্যে পর্যটকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। বছরের বিভিন্ন সময়ে দেশের নানা প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ এই অঞ্চল ভ্রমণে আসছেন। বিদেশি পর্যটকদের কাছেও পার্বত্য চট্টগ্রামের সৌন্দর্য দিন দিন পরিচিত হয়ে উঠছে।
তবে এই সম্ভাবনার পেছনে যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, সেটি হলো নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা। দীর্ঘ সময় ধরে পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অত্যন্ত আন্তরিকতা ও ত্যাগের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় টহল কার্যক্রম, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পর্যটকদের সহায়তা, জরুরি উদ্ধার অভিযান পরিচালনা এবং স্থানীয় জনগণের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে তারা আস্থা ও স্থিতিশীল পরিবেশ গড়ে তুলেছেন।
পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজই করেন না, বরং মানবিক সহায়তা, চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা কার্যক্রম এবং দুর্যোগ মোকাবিলায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ফলে স্থানীয় জনগণ ও পর্যটকদের মধ্যে একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা পর্যটন শিল্পের বিকাশে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
বর্তমানে দেশের পর্যটন খাত দ্রুত স¤‹্রসারিত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো সম্ভাবনাময় অঞ্চলে এখনো অনেক উন্নয়নমূলক কাজ প্রয়োজন। প্রথমত, যোগাযোগ ব্যবস্থার আরও উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। পাহাড়ি সড়কগুলো অনেক জায়গায় এখনো ঝুঁকিপূর্ণ ও সংকীর্ণ। বর্ষাকালে ভূমিধস, রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যায়। তাই আধুনিক ও টেকসই সড়ক নির্মাণ, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সাইনবোর্ড, পর্যটন নির্দেশিকা এবং জরুরি সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম থেকে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানের সঙ্গে দ্রুত ও নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে পর্যটকদের ভ্রমণ আরও সহজ হবে। একইসঙ্গে পর্যটন এলাকাগুলোতে উন্নত পার্কিং ব্যবস্থা, গণপরিবহন এবং পর্যটকবান্ধব পরিবহন সেবা চালু করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, আবাসন ও পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে জনপ্রিয় পর্যটন এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত মানসম্মত হোটেল, রিসোর্ট ও মোটেলের অভাব রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব রিসোর্ট, ইকো-কটেজ, ক্যা¤ি‹ং জোন এবং পর্যটন তথ্যকেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। পাহাড়ি প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্মিত আধুনিক আবাসন ব্যবস্থা বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইকো-ট্যুরিজম বর্তমানে অত্যন্ত জনপ্রিয়। পার্বত্য চট্টগ্রামেও পরিবেশ সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে ইকো-ট্যুরিজম ভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। পাহাড় কাটা, বন উজাড় বা পরিবেশের ক্ষতি না করে পর্যটন উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। প্রকৃতি রক্ষা করেই পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে হবে।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচারণা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একটি সুন্দর ভিডিও, ডকুমেন্টারি কিংবা পর্যটন প্রচারণা বিশ্বের লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। সরকারি উদ্যোগে আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলা, ভ্রমণবিষয়ক প্রদর্শনী, তথ্যচিত্র নির্মাণ এবং অনলাইন প্রচারণা কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে যদি ‘ঠরংরঃ ঐরষষ ঞৎধপঃং ইধহমষধফবংয’ ধরনের আন্তর্জাতিক প্রচারণা চালায়, তাহলে বিদেশি পর্যটকদের আগ্রহ বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। এ ছাড়াও ইউটিউব, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ট্রাভেল প্ল্যাটফর্মে পার্বত্য অঞ্চলের আকর্ষণীয় কনটেন্ট প্রচার করা প্রয়োজন।
চতুর্থত, স্থানীয় জনগণকে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে স¤‹ৃক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়ি অঞ্চলের তরুণ-তরুণীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ট্যুর গাইড, পর্যটন উদ্যোক্তা, হোমস্টে পরিচালনাকারী, হস্তশিল্প বিক্রেতা এবং পরিবেশ সংরক্ষণকর্মী হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে স্থানীয় জনগণের আয় বাড়বে এবং পর্যটন শিল্পের সুফল সরাসরি তাদের কাছে পৌঁছাবে।
এ ছাড়াও পার্বত্য এলাকায় পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। অনেক পর্যটন এলাকায় প্লাস্টিক বর্জ্য ও অপরিকল্পিত পর্যটন কার্যক্রম পরিবেশের ক্ষতি করছে। এজন্য কঠোর পরিবেশ নীতিমালা, পর্যাপ্ত ডাস্টবিন, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি।
ডিজিটাল সুবিধা নিশ্চিত করাও বর্তমান সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়ি অনেক এলাকায় এখনো মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সুবিধা দুর্বল। পর্যটকদের নিরাপত্তা, অনলাইন বুকিং, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং যোগাযোগের সুবিধার্থে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
পর্যটকদের জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল অ্যাপ বা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করা যেতে পারে, যেখানে পর্যটন কেন্দ্রের তথ্য, হোটেল বুকিং, গাইড সেবা, জরুরি যোগাযোগ নম্বর, আবহাওয়ার তথ্য এবং যাতায়াত নির্দেশনা থাকবে। এটি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভ্রমণকে আরও সহজ ও নিরাপদ করে তুলবে।
অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমের ক্ষেত্রেও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। ট্রেকিং, মাউন্টেন বাইকিং, জিপলাইন, কায়াকিং, রক ক্লাইম্বিং, ক্যা¤ি‹ং ও ট্রেইলভিত্তিক পর্যটন কার্যক্রম আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারে। তবে এসব কার্যক্রম পরিচালনায় আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। সরকার চাইলে পার্বত্য অঞ্চলে বিশেষ পর্যটন অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে পারে, যেখানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে, স্থানীয় ব্যবসা সম্প্রসারিত হবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে।
প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ভরপুর এই অঞ্চল একদিন শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো বিশ্বের পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠবে, এমন প্রত্যাশাই এখন সময়ের দাবি।

সাংবাদিক, লেখক ও আঞ্চলিক গবেষক,
পার্বত্য চট্টগ্রাম।