Print Date & Time : 13 May 2026 Wednesday 4:20 am

পাহাড় ও পরিবেশ ধ্বংসে জড়িত সী-পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা

ওয়াহিদুর রহমান রুবেল, কক্সবাজার: বনবিভাগকে ম্যানেজ করে পাহাড় কেটে প্রবহমান নদীতে বাঁধ নির্মাণ করে পরিবেশ ও বন ধ্বংস এবং হোটেলের ব্যবহার্য বর্জ্য নদীতে ফেলার অভিযোগ উঠেছে ‘সী-পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা লিমিটেড’-এর বিরুদ্ধে। তাদের কর্মকাণ্ডে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বিভিন্ন রোগ সৃষ্টির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বাঁধ নির্মাণে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় কয়েক লাখ ঘনফুট পাহাড় কেটেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। উখিয়া জালিয়াপালং ইউনিয়নের মোহাম্মদ শফির বিল আলম মার্কেটের পূর্ব পাশে ছোট খালের মাথা নামক স্থানে ইনানী রেঞ্জের আওতাধীন বনভূমিতে পাহাড় কেটে এ বাঁধ নির্মাণ করেছে ‘সী-পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা লিমিটেড’।
পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ে মামলার প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। আর বনবিভাগও বাঁধ নির্মাণের কথা স্বীকার করেছে।
এদিকে বনভূমিতে অবৈধভাবে পাহাড় কেটে বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস এবং জনস্বার্থে ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হচ্ছেÑএমন দাবি করে ‘সী-পার্ল রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা লিমিটেডকে’ আইনি নোটিশ দিয়েছেন মো. সজিব (২২) নামের এক যুবক। কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী হুমায়ুন কবির চৌধুরী তার পক্ষে প্রতিষ্ঠানের জিএম এডি আইসা এবং ইঞ্জিনিয়ার মনোয়ার হোসেনকে এ নোটিশ দেন।
নোটিশে বলা হয়, ক্ষমতার অপব্যবহার করে হোটেল কর্তৃপক্ষ স্থানীয় বাসিন্দাদের এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি করে যাচ্ছে। বন্যপ্রাণী, গৃহপালিত পশু-পাখির ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। একই সঙ্গে ‘পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫’ ও ‘বন আইন ১৯২৭’ এবং সংবিধানের ১৮ক অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করে ইনানী বন-বিটের আওতাধীন ডাম্পার দিয়ে পাহাড় কেটে প্রবহমান নদীতে বিশাল মাটির বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। বাঁধ নির্মাণ করতে অন্তত তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার ট্রাক পাহাড়ের মাটি ব্যবহার করা হয়েছে। এতে বনভূমির প্রায় ৫০ লাখ টাকার ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। বাঁধের ফলে বর্ষা মৌসুমে ভূমিধস, জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যেখানে স্থানীয়দের বসতভিটা, কৃষিকাজ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর সরাসরি প্রভাব পড়বে।
নোটিশ প্রাপ্তির ১৫ দিনের মধ্যে অবৈধভাবে নির্মিত বাঁধ ও স্থাপনা অপসারণ এবং বনভূমি পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, পরিবেশ ও জনস্বার্থে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানে জন্য নোটিশে বলা হয়। অন্যথায় পরিবেশ আদালতসহ দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা দায়ের করার কথা বলা হয়।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নোটিশদাতা কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির চৌধুরী বলেন, লিগ্যাল নোটিশ দেওয়ার পর এখনো কোনো জবাব আমি পাইনি। তবে আমার মক্কেলের সঙ্গে হোটেল কর্তৃপক্ষের সমঝোতা হলেও হতে পারে।
হোটেলের জিএম এডি আইসা, নোটিশ দাতার সঙ্গে বিষয়টি সমাধান করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন। পাহাড় কাটার বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে না পারলেও বনবিভাগের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রকাশ্যে বনের অভ্যন্তরে পাহাড় কেটে বাঁধ নির্মাণ করলেও রহস্যজনক কারণে নীরব রয়েছে বনবিভাগ। অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে নীরব ভূমিকা পালন করেছে তারা।
জানতে চাইলে ইনানী রেঞ্জ কর্মকর্তা ফিরোজ আল আমিন বলেন, হোটেল কর্তৃপক্ষ তাদের নিজস্ব জমি দাবি করে এ বাঁধ দিয়েছে। তবে পানি চলাচল রোধে এ বাঁধ দিয়ে তারা অপরাধ করেছে। এতে বনের ক্ষতি হচ্ছে বা হতে পারে। তবে পাহাড় ও গাছ কাটার বিরুদ্ধে কেনো পদক্ষেপ নেওয়া হলো নাÑএমন প্রশ্নের উত্তর দেননি তিনি।
এদিকে হোটেলের বর্জ্য এবং স্টাফ-কোয়ার্টারের ব্যবহার্য বর্জ্য স্থানীয় মাতালির ছরায় (ছোটনদী) ফেলা হয়। বর্ষা মৌসুমে এ বর্জ্য গিয়ে পড়ে সাগরে। বর্জ্যরে দুর্গন্ধে চারদিকের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। এ নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযোগ করে কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। উল্টো পরিবেশ অধিদপ্তর ছাড়পত্র দেওয়া হয় প্রতিষ্ঠানটিকে। অভিযোগ উঠেছে কোম্পানির কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ আর্থিক সুবিধা নিয়ে ছাড়পত্র দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর।
স্থানীয় সমাজসেবক মো. তৈয়ব বলেন, হোটেলটি বাণিজ্যিকভাবে চালু হওয়ার পর থেকে হোটেলের সব বর্জ্য মাতালির ছরা দিয়ে সাগরে ফেলা হচ্ছে। স্থানীয়দের প্রতিবাদের পরও সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি। এতে দুর্গন্ধে বসবাস করা দায় হয়ে পড়ছে।
জানতে চাইলে কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, পাহাড় কাটা ও বনজ সম্পদ ধ্বংস করে পরিবেশের ক্ষতি করায় হোটেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ে প্রস্তবনা পাঠানো হয়েছে। সেখানে শুনানির পর জরিমানাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে বর্জ্য ফেলার বিষয়টি তিনি অবগত নন।