প্রতিনিধি, রংপুর : রংপুরের পীরগাছায় অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হয়ে গত এক মাসে অন্তত শতাধিক গরু ও ছাগল মারা গেছে। হঠাৎ গবাদিপশুর মৃত্যুর এই ঘটনায় খামারি ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন হতে পীরগাছায় ভেটেরিনারি সার্জন না থাকা, সঠিক রোগ শনাক্ত না হওয়ায় চিকিৎসা ব্যবস্থা কার্যকর হচ্ছে না, ফলে পরিস্থিতি দিনদিন জটিল হয়ে উঠছে।
গবাদিপশুর মৃত্যুর কারণ শনাক্ত ও প্রতিরোধে গতকাল বৃহস্পতিবার রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরিচালক ডা. আব্দুল হাই সরকারকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা করেছে বলে নিশ্চিত করেছেন পীরগাছা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. একরামুল হক মন্ডল। কমিটির অন্যরা হলেন- জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবু ছাঈদ ও ডেপুটি চিফ ইপিডেমিওলজিস্ট ডা. রফিকুল আলম। তারা আক্রান্ত এলাকা পরিদর্শন ও নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছেন।
খামারিদের অভিযোগ, আক্রান্ত পশুগুলো সামান্য জ্বর, পাতলা পায়খানা ও ল্যাম্পি রোগের মতো উপসর্গে ভোগে। হঠাৎ শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে দ্রুত কমে যায়, এরপরই পশুগুলো মারা যাচ্ছে। রোগ সঠিকভাবে শনাক্ত না হওয়ায় তারা চরম বিপাকে পড়েছেন।
স্থানীয়রা জানান, এনথ্রাক্স ও ল্যাম্পি স্কিন রোগের প্রাদুর্ভাবও বেড়েছে। অনেক খামারি হাতুড়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন। কেউ কেউ অসুস্থ গরু-ছাগল কম দামে বিক্রি করছেন স্থানীয় কসাইদের কাছে। সম্প্রতি সদরের শটিপাড়া গ্রামের আমির উদ্দিনের ৩টি গরু ও খোকা মিয়ার ২টি গরু ও ৩টি ছাগল, শাহ আলম মিয়ার একটি গরু, শফিকুল ইসলামের ২টি ছাগল, মশিয়ার রহমানের একটি গরু এবং সরকারটারী গ্রামের খুরশিদ আলমের এক লাখ টাকার একটি গরু মারা গেছে।
শটিপাড়া গ্রামের আমির উদ্দিনের বলেন, ‘দুপুরে গরুর জ্বর ওঠে। হাতুড়ে ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা করালাম, সকালে দেখি গরু মরে গেছে। এভাবে আমার ৩টি গরু মারা গেল।’
খামারি মশিয়ার রহমান বলেন, ‘লাখ টাকার গরু চোখের সামনে মারা গেল, কোনোভাবে বাঁচাতে পারলাম না।’
তাম্বুলপুর এলাকার কৃষক ফজলুর রহমান বলেন, ‘হঠাৎ করেই আমার একটি গরু মারা গেছে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের কার্যক্রম নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে উপজেলাবাসীর মধ্যে। অভিযোগ রয়েছে, উপ-সহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ফজলুর রহমান, আবু আলী ও নজরুল ইসলাম নিয়মিত মাঠে না গিয়ে অফিসেই সময় কাটান। অফিসে বসে গল্পে মেতে থাকার এই প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
পীরগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. তানভীর হাসনাত রবিন বলেন, ‘চর্ম রোগে আক্রান্ত হয়ে অনেকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসছেন। তবে তা অ্যানথ্রাক্স বলে শনাক্ত হয়নি। এরপরেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।’
পীরগাছা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. একরামুল হক মন্ডল বলেন, ‘আমাদের সীমিত জনবল দিয়ে কাজ করতে হয়। তবে এখন থেকে দুটি টিম চিকিৎসা এবং দুটি টিম ভ্যাকসিন প্রয়োগে মাঠে কাজ করবে। আমরা ভ্যাকসিন ক্যাম্প চালু করেছি।’
রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরিচালক ডা. আব্দুল হাই সরকার বলেন, ‘আমরা পীরগাছার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেছি এবং কিছু নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ১৫ মে থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত কিছু অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত গরু জবাই হয়েছিল বলে জেনেছি। বর্তমানে সেই রোগ নেই। তবে যাতে নতুন করে রোগ না হয়, সেজন্য পীরগাছায় ৬০ হাজার গবাদিপশুকে ভ্যাকসিন দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

Discussion about this post