রামিসা রহমান : বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর ও কার্যক্রমহীন কোম্পানিগুলোর উপস্থিতি বিনিয়োগকারীদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিশেষ করে ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) মার্কেটে তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানি বছরের পর বছর উৎপাদন বন্ধ রেখে কার্যত অস্তিত্বহীন অবস্থায় পড়েছিল। এসব কোম্পানির শেয়ার বাজারে থাকলেও বাস্তবে তাদের কার্যক্রম, আর্থিক প্রতিবেদন কিংবা ব্যবসায়িক সম্ভাবনা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ছিল নানা প্রশ্ন। এমন প্রেক্ষাপটে পুঁজিবাজারকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে ওটিসি মার্কেট থেকে অকার্যকর কোম্পানিগুলোকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে এবার ওটিসি মার্কেটে তালিকাভুক্ত দুটি প্রতিষ্ঠান-আরবি টেক্সটাইল লিমিটেড এবং বাংলাদেশ প্ল্যান্টেশন লিমিটেডকে তালিকাচ্যুত করার সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে বিএসইসি। কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে শেয়ার বাইব্যাক সম্পন্ন করে কোম্পানি দুটি পুঁজিবাজার থেকে বেরিয়ে যাবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ইতোমধ্যে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জকে (সিএসই) নির্দেশনা দিয়েছে কমিশন।
বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, কোম্পানি দুটির এক্সিট প্ল্যান ও সংশ্লিষ্ট আবেদন দীর্ঘ সময় ধরে পর্যালোচনার পর কমিশন এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। সম্প্রতি কমিশনের ইস্যুয়ার কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স ডিভিশন থেকে স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর কাছে একটি আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। এর মাধ্যমে কোম্পানি দুটি পুঁজিবাজার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আরবি টেক্সটাইল লিমিটেডের বিষয়ে বিএসইসির সিদ্ধান্তে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোম্পানির আবেদন এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পিএলসির সুপারিশের ভিত্তিতে বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। কোম্পানিটির মোট শেয়ারের মাত্র শূন্য দশমিক ৩২ শতাংশ শেয়ারের ধারণকারীদের কাছ থেকে অফার গ্রহণের চিঠি না পাওয়ায় কমিশনের ২০২০ সালের ২৮ ডিসেম্বর জারি করা ডাইরেকটিভের নির্দেশনা ১৬-এর অধীনে একই ডাইরেকটিভের নির্দেশনা ১০(৪) থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। এর ফলে কোম্পানির এক্সিট প্ল্যান সমাপ্তির বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বিএসইসির ইস্যুয়ার কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স ডিভিশন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ প্ল্যান্টেশন লিমিটেডের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিএসইসির সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, কোম্পানিটির ৭৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ শেয়ার একটি পক্ষ অফারের মাধ্যমে কিনে নিচ্ছে। সেই পক্ষ ছাড়া অন্য শেয়ারহোল্ডারদের অবশিষ্ট শেয়ার অধিগ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জ পরিচালিত ব্যাংকে পর্যাপ্ত অর্থ জমা রাখা হয়েছে। ফলে কমিশনের কাছে কোম্পানিটির এক্সিট প্ল্যান সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটির আবেদন এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পিএলসির সুপারিশের ভিত্তিতে কমিশনের ২০২০ সালের ২৮ ডিসেম্বর জারি করা ডাইরেকটিভের নির্দেশনা ১৬ এর অধীনে একই ডাইরেকটিভের নির্দেশনা ১০(৪) থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কোম্পানির এক্সিট প্ল্যান সমাপ্তির বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর কোম্পানিগুলোকে তালিকা থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। অনেক কোম্পানি বছরের পর বছর উৎপাদন বন্ধ রেখে শুধু নামমাত্র তালিকাভুক্ত অবস্থায় ছিল। এতে বাজারে এক ধরনের নেতিবাচক বার্তা তৈরি হচ্ছিল এবং বিনিয়োগকারীরা বিভ্রান্ত হচ্ছিলেন।
জানা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকা এবং কার্যত ব্যবসায়িক কার্যক্রম না থাকায় ওটিসি মার্কেট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ বিএসইসির কাছে আবেদন করেছিল আরবি টেক্সটাইল লিমিটেড এবং বাংলাদেশ প্ল্যান্টেশন লিমিটেড। ওই আবেদনের সঙ্গে একটি পুনর্মূল্যায়ন প্রতিবেদনও জমা দেয় কোম্পানি দুটি। এই প্রতিবেদনে কোম্পানিগুলোর সম্পদ, দায়, আর্থিক অবস্থা এবং শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়েছিল।
তবে ওই পুনর্মূল্যায়ন প্রতিবেদন সঠিক কি না, তা যাচাই করার জন্য বিএসইসি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে নিরীক্ষকের মাধ্যমে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দেয়। নিরীক্ষকদের যাচাই-বাছাই শেষে প্রতিবেদনগুলো গ্রহণযোগ্য বলে প্রতীয়মান হলে কমিশন কোম্পানি দুটি তালিকাচ্যুত করার সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, ওটিসি মার্কেট মূলত এমন কোম্পানির জন্য তৈরি করা হয়েছিল, যারা মূল বাজারের শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হয় বা কোনো কারণে মূল বোর্ড থেকে বাদ পড়ে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বাজার কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার লেনদেন প্রায় বন্ধ হয়ে যায় এবং বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার কোনো বাস্তব সুযোগ পাচ্ছিলেন না।
এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিএসইসি দেশের পুঁজিবাজারের অকার্যকর ওটিসি মার্কেট বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশনা দেয়। সদ্ধান্ত অনুযায়ী, ওটিসি মার্কেটে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে তিনটি সম্ভাব্য পথে পুনর্বিন্যাস করা হয়। যেসব কোম্পানির কার্যক্রম চালু আছে এবং নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে পারে তাদের স্মলক্যাপ প্ল্যাটফর্ম বা এসএমই বোর্ডে স্থানান্তর করা হয়। কিছু কোম্পানিকে অলটারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড (এটিবি) তে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে বিশেষ ব্যবস্থায় তাদের শেয়ার লেনদেনের সুযোগ রাখা হয়। আর যেসব কোম্পানির কার্যক্রম নেই বা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা নেই তাদের ধাপে ধাপে তালিকাচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই বর্তমানে আরবি টেক্সটাইল এবং বাংলাদেশ প্ল্যান্টেশন লিমিটেডকে তালিকা থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিএসইসির মুখপাত্র ও পরিচালক আবুল কালাম শেয়ার বিজকে বলেন, কোম্পানি দুটি দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রমহীন অবস্থায় ছিল এবং তাদের ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনাও সীমিত। তাই বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বিবেচনা করে এবং বাজারকে আরও কার্যকর করতে এক্সিট প্ল্যানের মাধ্যমে তালিকাচ্যুত করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কোম্পানি দুইটির আবেদন, পুনর্মূল্যায়ন প্রতিবেদন এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সুপারিশ পর্যালোচনা করেই কমিশন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন তালিকাচ্যুত হওয়ার ক্ষেত্রে আর কোনো বাধা নেই এবং প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলেই কোম্পানি দুটি পুঁজিবাজার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে যাবে।
পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, অকার্যকর কোম্পানি তালিকা থেকে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে বাজারের গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে এবং বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ও সক্রিয় কোম্পানির মধ্যে বিনিয়োগ করার সুযোগ পাবেন।
তবে কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, তালিকাচ্যুত করার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি কীভাবে কমানো যায় সে বিষয়েও নজর দেওয়া প্রয়োজন। কারণ অনেক সাধারণ বিনিয়োগকারী এসব কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করে দীর্ঘ সময় ধরে আটকে ছিলেন।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুঁজিবাজারের কাঠামোগত সংস্কারের অংশ হিসেবে এমন পদক্ষেপ অব্যাহত থাকলে বাজার আরও স্বচ্ছ ও গতিশীল হতে পারে। বিশেষ করে অকার্যকর কোম্পানিগুলো তালিকা থেকে বাদ পড়লে বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কিছুটা হলেও বাড়তে পারে।
বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা কয়েক শতাধিক হলেও এর মধ্যে অনেক কোম্পানির কার্যক্রম সীমিত বা অনিয়মিত। ফলে বাজারের প্রকৃত শক্তি ও সম্ভাবনা অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়। এই বাস্তবতায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্রিয় ভূমিকা বাজারকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করতে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে, কিছু বিনিয়োগকারী মনে করছেন, তালিকাচ্যুতির প্রক্রিয়া যেন স্বচ্ছ ও বিনিয়োগকারীবান্ধব হয় তা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আস্থাই সবচেয়ে বড় বিষয়। যদি বিনিয়োগকারীরা মনে করেন যে তাদের স্বার্থ সুরক্ষিত রয়েছে, তাহলে তারা বাজারে আরও বেশি করে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবেন।
