Print Date & Time : 30 April 2026 Thursday 5:08 am

পুঁজিবাজারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আস্থা ফেরাতে হবে

দেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন ধরেই মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সূচকের পতন, লেনদেন কমে যাওয়া এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা বাজারকে আরও সংকটময় করে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের কয়েকটি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান। খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড, জিবিবি পাওয়ার লিমিটেড ও বারাকা পাওয়ার লিমিটেড-এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিরীক্ষকদের শঙ্কা মূলত গোটা খাতের দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও নীতিগত অনিশ্চয়তার দিকটিই তুলে ধরছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত মূলত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও নিরবচ্ছিন্ন চুক্তির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) শেষ হওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রেই নবায়ন-প্রক্রিয়া ঝুলে থাকছে। ফলে উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখতে হচ্ছে। খুলনা পাওয়ারের ক্ষেত্রে পিপিএ শেষ হওয়ার পর ‘নো-ইলেকট্রিসিটি নো-পেমেন্ট’ ভিত্তিতে চুক্তি হলেও বাস্তবে বিদ্যুৎ কেনা হয়নি। এতে কোম্পানির আয় বন্ধ হয়ে পড়েছে, যা টিকে থাকার সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। একই চিত্র জিবিবি পাওয়ার লিমিটেডের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। পিপিএ শেষ হওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে কোনো আয় না থাকা একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শেয়ারপ্রতি আয় কিছুটা ইতিবাচক হলেও তা প্রকৃত ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতার প্রতিফলন নয়। লভ্যাংশ না দেওয়া এবং শেয়ারের বাজারদরের ধারাবাহিক পতন বিনিয়োগকারীদের হতাশা আরও বাড়িয়েছে।

বারাকা পাওয়ারের ক্ষেত্রেও ঝুঁকির ধরন ভিন্ন হলেও গভীর। সহযোগী প্রতিষ্ঠানে বড় অঙ্কের ঋণ প্রদান, দুর্বল নথিপত্র এবং পিপিএ নবায়নের অনিশ্চয়তা কোম্পানিটির আর্থিক শক্তিকে দুর্বল করছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় মূল আয় বন্ধ থাকা এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানের লোকসান ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ সক্ষমতাকে সীমিত করছে। যদিও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কৌশলগত প্রস্তুতির কথা বলছে, তবু বাস্তব অগ্রগতি ছাড়া এসব আশ্বাস বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে যথেষ্ট নয়।

এই পরিস্থিতি কেবল কয়েকটি কোম্পানির সমস্যা নয়, বরং দেশের জ্বালানি নীতি ও পুঁজিবাজার ব্যবস্থাপনার একটি কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। বিদ্যুৎ খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে যদি দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা ও স্বচ্ছ নীতি না থাকে, তাহলে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে এবং বাজার আরও সংকুচিত হবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কাও অমূলক নয়Ñপর্যাপ্ত জ্বালানি ও স্থিতিশীল বিনিয়োগ না থাকলে অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব পড়বে বহুমাত্রিকভাবে।

অতএব সরকারের উচিত দ্রুত পিপিএ নবায়ন-প্রক্রিয়া স্পষ্ট করা, জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া। তা না হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের এই ঝুঁকি ধীরে ধীরে পুরো অর্থনীতির জন্যই বড় হুমকিতে পরিণত হতে পারে।