নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি : দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে দেশের পুঁজিবাজারে অবশেষে ফিরতে শুরু করেছে সুদিন। চলতি বছরের শুরু থেকেই দেশের বাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার ধারাবাহিক সংস্কারমূলক পদক্ষেপ এবং শেয়ারের দর আকর্ষণীয় পর্যায়ে থাকায় নতুন করে বিদেশিদের এই আগ্রহ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। এর ফলে শুধু বাজারের সার্বিক লেনদেনই বাড়ছে না, বরং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মাঝেও নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দেশের পুঁজিবাজার নিয়ে বেশ সতর্ক বা নিষ্ক্রিয় ছিলেন। কিন্তু সেই মেঘ এখন কাটতে শুরু করেছে। চলতি বছর দেশের বাজার যেন ফিরে পাচ্ছে তার হারানো জৌলুস।
সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে আমাদের পুঁজিবাজার। বাজারে ভালো মৌলভিত্তির শেয়ারের সরবরাহ এবং আস্থার সংকট দূর হওয়ায় বিদেশিরা এখন নতুন করে পুঁজি নিয়ে ফিরছেন, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যই একটি বড় ইতিবাচক বার্তা।
যদিও পুঁজিবাজার নিয়ে দেশীয় অনেক বিনিয়োগকারী হতাশ, তবে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর চলতি বছরে বাজারে আগ্রহ বাড়ছে বিদেশিদের।
জানা গেছে, টানা দুই বছর নিম্নমুখী থাকার পর চলতি বছরের শুরু থেকেই দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। আগে যেখানে তারা বেশি শেয়ার বিক্রি করতেন, এখন সেই প্রবণতা কমে গিয়ে কেনার দিকে ঝুঁকছেন। এতে বাজারে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ১৯৭ কোটি ৬২ লাখ টাকার শেয়ার কিনেছেন। একই সময়ে বিক্রি করেছেন ১৭৯ কোটি ৬১ লাখ টাকার শেয়ার। অর্থাৎ মাসজুড়ে তাদের নিট বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ১৮ কোটি টাকা।
এদিকে ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম ১৫ দিনে বিদেশিদের শেয়ার লেনদেন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ সময়ে মোট লেনদেন দাঁড়িয়েছে ১৭৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৮ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম ১৫ দিনে এই পরিমাণ ছিল ১১৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।
তবে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের তথ্য বলছে, বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়লেও বিদেশি বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কিছুটা কমেছে। জানুয়ারির শুরুতে বিদেশিদের বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব ছিল ৪৩ হাজার ৫৪৯টি, যা ফেব্রুয়ারির ১৫ দিন শেষে কমে দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ১০১টিতে। অর্থাৎ এ সময়ে ৪৪৮টি বিও হিসাব কমেছে। অর্থাৎ অংশগ্রহণকারী বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কিছুটা কমলেও যারা বাজারে সক্রিয় রয়েছেন, তারা আগের তুলনায় বেশি বিনিয়োগ করছেন।
ডিএসইর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিদেশিরা মোট ২ হাজার ৯৫ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন। বিপরীতে কিনেছেন ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকার শেয়ার। ফলে বছর শেষে তাদের নিট বিনিয়োগ কমেছে ২৭০ কোটি টাকা। এর আগের বছর ২০২৪ সালেও নিট বিনিয়োগ ২৬১ কোটি টাকা কমেছিল।
তবে ২০২৩ সালে বিদেশিদের নিট বিনিয়োগ ইতিবাচক ছিল, যার পরিমাণ ছিল ৬৪ কোটি টাকা। গত আট বছরের মধ্যে সাত বছরই বিদেশি বিনিয়োগ ঋণাত্মক ছিল, যা থেকে চলতি বছরের এই ইতিবাচক প্রবণতা বাজারের জন্য আশাব্যঞ্জক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে গত এক দশকে অনেক কোম্পানি বড় আশা নিয়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছিল। কিন্তু ২০২৫ সালে দেখা যায়, এর মধ্যে অনেক কোম্পানির পারফরম্যান্স খুবই দুর্বল হয়ে গেছে বা সেগুলোর শেয়ারকে দুর্বল হিসেবে ধরা হচ্ছে। এই অবনতি বাজার পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হওয়া। ২০২৫ সালে একটিও আইপিও বাজারে আসেনি। তাই দুর্বল শেয়ার ধরে রাখা বিনিয়োগকারীদের সামনে তেমন কোনো বিকল্প ছিল না। ফলে তাদের বিনিয়োগ আটকে থাকে এবং নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ কমে যায়।
বছরজুড়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর তৎপরতা ছিল বেশি। মিউচুয়াল ফান্ড-সংক্রান্ত নতুন বিধিমালা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়, যা সম্পদ ব্যবস্থাপকরা ইতিবাচকভাবে দেখেছেন। তবে দীর্ঘ মেয়াদে ভালো প্রভাব ফেলতে পারে, এমন আরও কিছু পরিবর্তনের দাবি জানান তারা।
মার্জিন ঋণের নিয়ম পরিবর্তন করা হয়, লভ্যাংশ দেওয়ার পদ্ধতি সহজ করা হয় এবং বিও হিসাবের বার্ষিক ফি ৪৫০ টাকা থেকে কমিয়ে ১৫০ টাকা করা হয়।
এছাড়া বাজারে কারসাজির অভিযোগে কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়। এর মধ্যে সাবেক বিএসইসি চেয়ারম্যান শিবলী রুবায়াত উল ইসলাম এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি খাতবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানও ছিলেন।
তবে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আরও হতাশা দেখা দেয় যখন বাংলাদেশ ব্যাংক একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের শেয়ার শূন্য ঘোষণা করে।
আর তালিকাভুক্ত ৯টি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আটটিই বন্ধের পথে আছে। ফেসভ্যালুর হিসাবে এসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
কেবল আর্থিক টাকার ক্ষতিই হয়নি, বরং একীভূতকরণ ও প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্তে বিনিয়োগকারীদের আস্থা নড়বড়ে হয়ে গেছে।
বিনিয়োগকারীরা এত দিন ব্যাংক ও আর্থিক প্রকিষ্ঠানের অডিট রিপোর্ট ও ক্রেডিট রেটিংয়ের ওপর ভরসা করে বিনিয়োগ করতেন। বছরের পর বছর এসব প্রতিবেদনে কোনো অনিয়ম ধরা পড়েনি।
এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এম মাশরুর রিয়াজ শেয়ার বিজকে বলেন, বৈশ্বিক বাজারে প্রত্যাশিত রিটার্ন না পাওয়ায় হয়তো বিনিয়োগকারীরা এখন উদীয়মান বাজারগুলোর দিকে ঝুঁকছেন, যেখানে তুলনামূলকভাবে ভালো মূল্যায়ন ও সম্ভাবনাময় রিটার্নের সুযোগ রয়েছে। সে দৃষ্টিকোণ থেকে দেশের পুঁজিবাজার বিনিয়োগের জন্য বিদেশীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
এই অর্থনীতিবিদের মতে, এই আগ্রহকে টেকসই করতে হলে পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরও শক্তিশালী করতে হবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকর ভূমিকা, তথ্যপ্রকাশের স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধির উদ্যোগ জরুরি। এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ আরও বাড়বে এবং সামগ্রিক অর্থনীতি উপকৃত হবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো এম হেলাল আহম্মেদ খান শেয়ার বিজকে বলেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সাধারণত ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়। তারা আশা করেন, পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে এবং নীতি ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) আরও কার্যকরভাবে কাজ করবে বলে তারা মনে করেন। এর ফলে ইনসাইডার ট্রেডিং ও বাজার কারসাজি কমে গিয়ে বিনিয়োগের পরিবেশ আরও নিরাপদ ও আস্থাশীল হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি মনে করেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে এর নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে পুনর্গঠন করে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও দক্ষ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে পুরোনো অনিয়ম ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ হয়। সেইসঙ্গে শুধু পুঁজিবাজার নয়, দেশের সব আর্থিক সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালীকরণ করতে হবে। এর আগে যারা মার্কেটে কারসাজি করেছে বা বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নিতে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশিদের এই ইতিবাচক প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাজারে তারল্য পরিস্থিতি আরও উন্নত হতে পারে। এতে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও আস্থা ফিরে আসবে এবং তারা নতুন করে বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন।
