মো. শাহিন আলম : বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দীর্ঘদিন ধরেই বহুমুখী সংকটের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ক্রেতা আদেশ কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার চাপে থাকা এই শিল্প এবার নতুন করে নীতিগত অনিশ্চয়তার ফাঁদে পড়েছে। সুতা আমদানিতে শুল্ক ও বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত শিল্পটিকে এমন এক মোড়ে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে সামান্য ভুল সিদ্ধান্ত পুরো রপ্তানি কাঠামোকেই নড়বড়ে করে দিতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক খাতের গুরুত্ব প্রশ্নাতীত। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে এই খাত থেকে, যেখানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত প্রায় চার কোটিরও বেশি মানুষ।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে প্রায় ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পোশাক রপ্তানি করেছে, যার প্রায় ৮০ শতাংশ গিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বাজারে। ফলে এই খাতে সামান্য অস্থিরতাও জাতীয় অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামাজিক ভারসাম্যের ওপর তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের উৎপাদন কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নিট পোশাকে দেশীয় সুতার ব্যবহার তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও ওভেন ও মিশ্র ফেব্রিক উৎপাদনে এখনো ব্যাপকভাবে আমদানিকৃত সুতার ওপর নির্ভরশীল।
বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্যমতে, দেশের পোশাক কারখানাগুলোর প্রায় ৮৫-৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই আমদানিকৃত সুতার প্রয়োজন হয়। ফলে সুতা আমদানিতে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেই উৎপাদন চক্রে সরাসরি প্রভাব পড়ে, ডেলিভারি সময় বাড়ে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থায় ফাটল ধরার আশঙ্কা তৈরি হয়।
এই সংকটের পেছনে নীতিগত সিদ্ধান্ত ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার জটিলতা বড় ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আমদানি নিয়ন্ত্রণমূলক নীতির কারণে সুতা আমদানিতে এলসি খোলা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সুতা আমদানিতে শুল্ক ও বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের উদ্যোগ। পোশাক প্রস্তুতকারকদের আশঙ্কা—এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আদেশ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এমনিতেই গত ছয় মাসে পোশাক খাতে ব্যবসা কমেছে প্রায় ১৪ শতাংশ।
অন্যদিকে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলোর বাস্তবতাও কম জটিল নয়। বস্ত্র উদ্যোক্তাদের দাবি অনুযায়ী, দেশের স্পিনিং মিলগুলো মোট চাহিদার ৮৫-৯০ শতাংশ সুতা সরবরাহে সক্ষম। কিন্তু উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ ও গ্যাস, উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর ভর্তুকিপ্রাপ্ত সুতার সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা তাদের টিকে থাকাকে কঠিন করে তুলেছে। ফলে একদিকে গার্মেন্ট কারখানাগুলো কাঁচামালের অনিশ্চয়তায় ভুগছে, অন্যদিকে স্পিনিং মিলগুলোও অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে, যা পুরো ভ্যালু চেইনকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব ইতোমধ্যে রপ্তানি আয়ের পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হচ্ছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) বাংলাদেশের সামগ্রিক রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ১৯ শতাংশ। শুধু ডিসেম্বর মাসেই এই পতন দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশে। নিট পোশাক, ওভেন পোশাক, পাটজাত পণ্য ও হোম টেক্সটাইলসহ প্রায় সব প্রধান খাতেই রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে শিল্পঝুঁকির স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও বাংলাদেশের জন্য অনুকূল নয়। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং ভোক্তাদের ব্যয় সংকোচনের ফলে বৈশ্বিক পোশাকবাজারে চাহিদা কমছে। তথ্যমতে, পাঁচ মাস ধরে বিশ্বের ২৬টি দেশে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের তুলনায় কমেছে। বিশেষ করে সুতা নিয়ে অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে এ খাতের আন্তর্জাতিক ইমেজ ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা রপ্তানি অর্ডার এবং ক্রেতাদের আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্ভাব্য বাণিজ্য দ্বন্দ্বও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। গার্ডিয়ান-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইইউ মার্কিন পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করছে, আর যুক্তরাষ্ট্রও ইউরোপীয় পণ্যের ওপর ১০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে।
এই বহুমাত্রিক সংকটে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে উঠেছে নীতিগত সমন্বয়ের অভাব। বাস্তবতা হলো, তৈরি পোশাক খাত ও বস্ত্র খাত আলাদা কোনো শিল্প নয়; বরং দুটোই একই ভ্যালু চেইনের অংশ। এক খাতকে সুরক্ষা দিতে গিয়ে অন্য খাতকে চাপের মুখে ফেললে দীর্ঘমেয়াদে উভয় খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অথচ, ভারত টেক্সটাইল খাতে প্রোডাকশন লিংকড ইনসেন্টিভ স্কিমের মাধ্যমে নগদ সহায়তা দিচ্ছে, ভিয়েতনাম জ্বালানি ভর্তুকি ও কর ছাড় বাড়িয়েছে, আর চীন সুদ সহায়তা ও লজিস্টিক সুবিধা দিয়ে রপ্তানিমুখী শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছে।
এই সংকটের সামাজিক দিকও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। অর্ডার কমলে প্রথম আঘাত আসে শ্রমিকদের আয় ও কর্মঘণ্টায়। তৈরি পোশাক খাতে অস্থিরতা মানেই নগর শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর ভোগক্ষমতা হ্রাস, দারিদ্র্যের চাপ বৃদ্ধি এবং সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সুতা আমদানিতে শুল্কারোপ ও বন্ড সুবিধা অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন, যাতে গার্মেন্ট কারখানাগুলো নিরবচ্ছিন্ন কাঁচামাল পেতে পারে এবং ডেলিভারি সময় বজায় থাকে। পাশাপাশি দেশীয় স্পিনিং মিলগুলোকে টিকিয়ে রাখতে নগদ সহায়তা, কর রেয়াত, স্বল্প সুদের ঋণ এবং গ্যাস-বিদ্যুতের স্থিতিশীল ও যৌক্তিক মূল্যে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে স্থানীয় সুতা উৎপাদন বাড়ে এবং বিদেশি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমে। এছাড়া রপ্তানিমুখী পোশাক খাতের কাঁচামাল সরবরাহ কোনো অবস্থাতেই বাধাগ্রস্ত করা যাবে না এবং যেকোনো সুরক্ষামূলক নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নীতিমালা অনুসরণ করা জরুরি, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের আস্থা স্থির থাকে এবং শিল্পের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হয়।
বাংলাদেশ এখন এলডিসি উত্তরণের পথে। স্থানীয় মূল্য সংযোজন, উৎপাদন দক্ষতা ও সরবরাহ সক্ষমতার ওপর চাপ আরও বাড়বে। এই বাস্তবতায় টেক্সটাইল ও পোশাক খাতের মধ্যে দ্বন্দ্ব নয়, বরং সমন্বিত, তথ্যভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতিই হতে পারে একমাত্র টেকসই পথ। সময়োচিত সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে এই সংকটই ভবিষ্যৎ সংস্কারের সুযোগে পরিণত হতে পারে; অন্যথায় নীতিগত জটিলতা দেশের প্রধান রপ্তানি খাতকে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিতে ফেলবে।
শিক্ষার্থী, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রিন্ট করুন



Discussion about this post