নিজস্ব প্রতিবেদক : দক্ষিণ আমেরিকার প্রভাবশালী বাণিজ্যিক জোট মারকোসুর বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে উরুগুয়ে একটি কার্যকর ‘গেটওয়ে’ বা প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করতে পারে বলে মনে করছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। লাতিন আমেরিকার বিশাল সম্ভাবনাময় বাজারে বাংলাদেশ এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় প্রবেশ করতে না পারলেও উরুগুয়ের মাধ্যমে সেই সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব বলে মত দেন সংগঠনটির নেতারা।
গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে নিযুক্ত উরুগুয়ের রাষ্ট্রদূত আলবার্তো গুয়ানি বিজিএমইএ কার্যালয় পরিদর্শন করলে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে বিজিএমইএ’র সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খানের নেতৃত্বে সংগঠনের পরিচালক শাহ রাঈদ চৌধুরী, পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম এবং পরিচালক শেখ হোসেন মোহাম্মদ মোস্তাফিজ অংশ নেন। এছাড়া বাংলাদেশে উরুগুয়ের অনারারি কনসাল মোস্তফা কামরুস সোবহান এবং বিজিএমইএ’র ভারপ্রাপ্ত সচিব মেজর (অব.) মো. সাইফুল ইসলাম সভায় উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনার শুরুতে বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সামগ্রিক চিত্র, রপ্তানি সক্ষমতা, টেকসই উৎপাদন এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হলেও লাতিন আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি এখনো সীমিত। এই অঞ্চলে প্রবেশ ও বাজার সম্প্রসারণের জন্য উরুগুয়ের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তিনি উরুগুয়েতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়াতে দেশটির সরকারের সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করেন।
বিজিএমইএ পরিচালক শাহ রাঈদ চৌধুরী বলেন, উরুগুয়ে ভৌগোলিক ও বাণিজ্যিকভাবে মারকোসুর অঞ্চলের একটি কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। উরুগুয়ের দক্ষ বন্দর, আধুনিক লজিস্টিক সুবিধা এবং উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা ব্যবহার করে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা সহজেই আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে ও উরুগুয়েসহ পুরো মারকোসুর অঞ্চলে পণ্য সরবরাহ করতে পারবেন। তিনি উরুগুয়েকে মারকোসুর বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন।
সভায় উরুগুয়ের রাষ্ট্রদূত আলবার্তো গুয়ানি বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানি বাড়ানোর ক্ষেত্রে আগ্রহ প্রকাশ করেন। পাশাপাশি তিনি উরুগুয়ের বিশ্বমানের ‘ট্রেসেবিলিটি’ যুক্ত মেরিনো উল বাংলাদেশে রপ্তানির প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, উরুগুয়ের উল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মান ও ট্রেসেবিলিটি সনদপ্রাপ্ত, যা বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে ব্যবহƒত হলে উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে সহায়ক হবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশে উরুগুয়ের অনারারি কনসাল মোস্তফা কামরুস সোবহান বলেন, উরুগুয়ের মেরিনো উল ব্যবহার করে বাংলাদেশি পোশাক প্রস্তুতকারীরা বিশ্ববাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে। এতে পণ্যের মান ও বৈচিত্র্য বাড়বে এবং নতুন বাজারে প্রবেশ সহজ হবে।
বিজিএমইএ পরিচালক শেখ হোসেন মোহাম্মদ মোস্তাফিজ বলেন, উরুগুয়ে থেকে উল আমদানির মাধ্যমে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে পণ্যে বৈচিত্র্য আসবে। এর ফলে শুধু লাতিন আমেরিকার বাজারেই নয়, বৈশ্বিক বাজারেও বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
সভায় বিশেষভাবে আলোচিত হয় এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের সামনে আসা বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার বিষয়টি। উভয় পক্ষই মত দেন, মারকোসুর ব্লকের সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) হলে বাংলাদেশ ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলো পারস্পরিকভাবে উপকৃত হবে। বিজিএমইএ পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম বলেন, উরুগুয়ে থেকে কাঁচামাল হিসেবে উল আমদানি এবং বিনিময়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশেষ অগ্রাধিকার এফটিএ-তে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে পোশাকশিল্পের জন্য তা অত্যন্ত লাভজনক হবে।
সভায় বিজিএমইএ পরিচালক শাহ রাঈদ চৌধুরী উরুগুয়েতে একটি শক্তিশালী বাণিজ্য প্রতিনিধিদল পাঠানোর প্রস্তাব দেন। এ প্রস্তাবে রাষ্ট্রদূত আলবার্তো গুয়ানি ইতিবাচক সাড়া দিয়ে জানান, উরুগুয়ের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি প্রতিনিধিদল পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে এবং সেই দলে বিজিএমইএর অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এ সময় বিজিএমইএ নেতারা ব্যবসায়ীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণের ওপরও জোর দেন।
বৈঠক শেষে উভয়পক্ষই দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সহযোগিতা জোরদারে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে দৃঢ? আগ্রহ প্রকাশ করে।
