নূর হোসেন মামুন, চট্টগ্রাম : চ্যালেঞ্জ কম ছিল না। একদিকে পটপরিবর্তনের পর নতুন করে ব্যবসায়ীদের ঘুরে দাঁড়ানোর আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ২০ শতাংশের বাড়তি শুল্ক আরোপ। পরিবহন ধর্মঘট, শুল্ক কর্মকর্তাদের কর্মবিরতি, ট্যারিফ বাড়ানো নিয়ে নানা জটিলতা, প্রশাসনিক জটিলতাসহ কি গেল না বন্দরের ওপর দিয়ে। কিন্তু তারপরও এই শক্ত ঝড় দৃঢ় নেতৃত্বের কারণে সবকিছু মোকাবিলা করে সাফল্যের নিশানা রাখতে সক্ষম হয়েছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম। চলতি বছরের ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্দরে ৩৩ লাখের বেশি কনটেইনার এবং ১৩ লাখ ৩৯ হাজার মেট্রিক টন কার্গো পণ্য হ্যান্ডলিং করা হয়েছে। একই সময়ে বন্দরে ভিড়েছে চার হাজার ৩০০টিরও বেশি জাহাজ, যা আগের যে কোনো বছরের তুলনায় সর্বোচ্চ।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ ক্যালেন্ডার ইয়ারে কনটেইনার, বাল্ক কার্গো ও জাহাজ হ্যান্ডলিং-তিন ক্ষেত্রেই আগের বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরটি।
বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক বলেন, এ বছর কার্গোর ক্ষেত্রে প্রায় ১৩ কোটি ২৭ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন বাল্ক পণ্য এবং ৩৩ লাখের বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং সম্পন্ন হয়েছে। অর্থবছর শেষে কনটেইনার হ্যান্ডলিং ৩৪ লাখে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। বছরের মাঝামাঝিতে কাস্টমসের শুল্ক কর্মকর্তাদের কর্মবিরতি ও পরিবহন ধর্মঘটে বন্দর কার্যক্রমে সাময়িক চাপ তৈরি হলেও দ্রুতই সেই সংকট কাটিয়ে ওঠে চট্টগ্রাম বন্দর। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেনি। ফলে বছরের শেষ প্রান্তে এসে বন্দরের কার্যক্রম পূর্ণগতিতে এগিয়ে যায়।
বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এই সাফল্যের অন্যতম কারণ। বন্দরের গেট ও পিয়ারসাইড অপারেশন অটোমেশনের আওতায় আনা হয়েছে এবং কাস্টমসের সঙ্গে সমন্বয় করে ইয়ার্ড ম্যানেজমেন্ট নতুনভাবে সাজানো হয়েছে। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণের ফলেই রেকর্ড পরিমাণ হ্যান্ডলিং সম্ভব হয়েছে।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালেও বন্দরের কার্যক্রম ছিল চমকপ্রদ। কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ৭.৪২ শতাংশ এবং মোট কার্গো থ্রপুটে ৩.১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়ে এ সময়ে। দুটোই বন্দরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। জুলাইয়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা, বন্যা, পরিবহন ধর্মঘট ও কাস্টমস কার্যক্রমে নানা বিঘ্ন সত্ত্বেও জাহাজের গড় অপেক্ষার কাল ক্ষেত্র বিশেষে কমে এসেছে মাত্র একদিনে। যা বন্দর ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতার উজ্জ্বল উদাহরণ।
এছাড়া, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর বিগত পাঁচ বছরের তুলনায় আর্থিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমধর্মী অগ্রগতি অর্জন করেছে। মোট রাজস্ব আয় ৮.২২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২২৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকায়, যা আগের বছরের চার হাজার ৮৩০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি। যদিও ব্যয় ৯.৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে দুই হাজার ৩১৪ কোটি ৮৬ রাখ টাকা, তারপরও বন্দর রাজস্ব উদ্ধৃতে ৭.২৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। এ অর্জন প্রতিষ্ঠানটির শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থপনা এবং রাজস্ব উৎপাদনের সক্ষমতাকে প্রতিফলিত করে।
জানা যায়, গত পাঁচ বছরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সরকারের রাজস্ব খাতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। এই সময়ে জাতীয় কোষাগারে মোট সাত হাজার ২০৩ কোটি ছয় লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে। যা ক্রমবর্ধমান হারে প্রতিবছর বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবহরে সর্বোচ্চ এক হাজার ৭৬৫ কোটি ২৬ লাখ টাকা প্রদান করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেদের সরকারের অন্যতম বৃহৎ রাজস্ব প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের পাশাপাশি দেশের ২১টি বেসরকারি অফডকেও বছর শেষ হওয়ার আগেই কনটেইনার ও বান্ধ কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। অফডকগুলোতে বছর শেষে রপ্তানিতে প্রায় ৬ দশমিক ৪ শতাংশ এবং আমদানিতে প্রায় ১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিকডার মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বিপ্লব জানান, পরিবহন ধর্মঘট ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের কর্মবিরতির মতো প্রতিবন্ধকতা থাকলেও আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম থেমে থাকেনি। দেশের উন্নয়ন প্রকল্প ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির কারণে রপ্তানির তুলনায় আমদানিতে প্রবৃদ্ধি বেশি হয়েছে। স্টেকহোল্ডারদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও দায়িত্বশীলতার ফলেই এই অগ্রগতি ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।
অন্যদিকে, প্রায় ৩৯ বছর পর চট্টগ্রাম বন্দরের ট্যারিফ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ব্যবহারকারীদের একটি অংশের মতে, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ভারত ও ভিয়েতনামের তুলনায় চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যয় তুলনামূলক বেশি।
বিজিএমইএর প্রথম সহ-সভাপতি সেলিম রহমান বলেন, মূল্য বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সেবার দৃশ্যমান উন্নয়ন প্রয়োজন।
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, এই প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বন্দরের নৌচ্যানেলে নিয়মিত ড্রেজিং এবং জেটিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন জরুরি। নাব্য সঙ্কট কাটিয়ে অন্তত ১০ মিটার গভীরতার জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা করতে না পারলে ভবিষ্যতে সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়বে।
শিপিং এজেন্টদের মতে, বন্দরের নিজস্ব অর্থনৈতিক সক্ষমতা থাকলেও যন্ত্রপাতি ক্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণে ধারাবাহিক বিনিয়োগ প্রয়োজন। যন্ত্রপাতির ঘাটতি দূর করা গেলে ২০২৬ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর আরও শক্ত অবস্থানে পৌঁছাতে পারবে।
দেশের মোট আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯৩ শতাংশই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সম্পন্ন হয়, যার বার্ষিক আর্থিক পরিমাণ দুই লাখ কোটি টাকারও বেশি। আন্তর্জাতিক শিপিং সাময়িকী লয়েড লিস্টের হিসেবে বিশ্বের ব্যস্ততম একশ বন্দরের তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান বর্তমানে ৬৮তম।
প্রিন্ট করুন






Discussion about this post