রামিসা রহমান : রাজধানীর পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজার ও এর আশপাশের সড়কগুলো ভয়াবহ যানজটে স্থবির হয়ে পড়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানঘন এই এলাকায় প্রতিদিন সকাল হলেই যান চলাচল কার্যত অচল হয়ে যায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্কুলগামী শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনে। সেন্ট গ্রেগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা গভর্নমেন্ট মুসলিম হাই স্কুল, ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজ, ঢাকা সেন্ট্রাল গার্লস হাই স্কুল, কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ—এমন একাধিক বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘিরে থাকা সড়কগুলোতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনার অভাবে সৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী যানজট।
সকাল সাতটার পর থেকেই লক্ষ্মীবাজার, আরমানিটোলা ও সংযোগ সড়কগুলোতে বাস, প্রাইভেটকার, রিকশা ও ইজিবাইকের বিশৃঙ্খল চলাচলে যানজট চরম আকার ধারণ করে। সময়মতো বাচ্চাদের স্কুলে পৌঁছে দিতে অভিভাবকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকতে হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী নির্ধারিত সময়ে ক্লাসে পৌঁছাতে না পেরে মানসিক চাপে পড়ছে, যা তাদের পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
যানজটের পেছনে প্রধান কারণ রাস্তা দখল ও অবৈধ পার্কিং। দোকানপাটের পণ্য সড়কে ছড়িয়ে রাখা, ব্যক্তিগত গাড়ি ও ভ্যান এলোমেলোভাবে পার্কিংয়ের ফলে সড়কের কার্যকর প্রস্থ কমে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যত্রতত্র রাস্তা খনন। কাজ শেষ না করেই খোঁড়া অংশ ফেলে রাখায় সৃষ্টি হচ্ছে সংকীর্ণতা ও গর্ত। সড়কের পাশে ফেলে রাখা মাটি, বালু ও ময়লার স্তুপ যান চলাচলকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে।
সকালের দিকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে রাস্তার ওপর বসে পড়া কাঁচাবাজারের কারণে। বাজারের ভিড়, ভ্যান ও ক্রেতাদের চাপ সামলাতে না পেরে পুরো এলাকা অচল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রণহীন রিকশা ও ইজিবাইক চলাচল যানজটকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক চালক উল্টো পথে চলাচল করায় বিশৃঙ্খলা আরও বেড়ে যায়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই ব্যস্ত ও সংবেদনশীল এলাকায় কার্যত কোনো ট্রাফিক পুলিশের উপস্থিতি নেই। স্কুল চলাকালীন সময়েও গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কাউকে দেখা যায় না। ফলে আইন না মেনে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে, যার খেসারত দিচ্ছে সাধারণ মানুষ।
যানজটের পাশাপাশি বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে খোলা ম্যানহোল। লক্ষ্মীবাজার ও আশপাশের কয়েকটি স্থানে ম্যানহোলের ঢাকনা না থাকায় বিশেষ করে স্কুলগামী ছোট শিক্ষার্থীরা মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে রয়েছে। বৃষ্টি বা ভিড়ের মধ্যে এসব খোলা ম্যানহোল চোখে না পড়ায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অভিভাবকরা।
ঢাকা গভর্নমেন্ট মুসলিম হাই স্কুলের এক শিক্ষার্থী তুরিন সরকার শেয়ার বিজকে বলেন, প্রতিদিন স্কুলে আসার সময় আধা ঘণ্টার বেশি রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। গাড়ি চলেই না। অনেক সময় ক্লাস শুরু হয়ে গেলেও আমরা গেটে আটকে থাকি। ভিড় আর হর্নের শব্দে খুব অস্বস্তি লাগে।
ঢাকা সেন্ট্রাল গার্লস হাই স্কুলের আরেক শিক্ষার্থী সামিয়া জাহান শেয়ার বিজকে বলেন, রাস্তার ভিড়ে হাঁটতে গিয়ে ভয় লাগে। কয়েক জায়গায় ম্যানহোল খোলা, কেউ ঠিকমতো দেখে না। ইউনিফর্ম পরে বাজারের ভিড়ের মধ্য দিয়ে চলতে খুব কষ্ট হয়।
কবি নজরুল সরকারি কলেজের এক শিক্ষক শেয়ার বিজকে বলেছেন, শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন দেরিতে ক্লাসে পৌঁছাচ্ছে, এতে পড়াশোনার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে। সকালের প্রথম পিরিয়ডে উপস্থিতি কম থাকে, যা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি আরও বলেন, এটি শুধু যানজটের সমস্যা নয়, এটি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়। খোলা ম্যানহোল, অতিরিক্ত যানবাহন ও ট্রাফিক পুলিশের অনুপস্থিতি বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করছে।
সেন্ট গ্রেগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ এক অভিভাবক শেয়ার বিজকে বলেন, বাচ্চাকে স্কুলে নামিয়ে দিতে এসে প্রতিদিন দুশ্চিন্তায় থাকি। কখনো যানজটে আটকে থাকি, কখনো রাস্তার বিশৃঙ্খলায় ভয় লাগে। সন্তান নিরাপদে স্কুলে পৌঁছাবে কিনা—এই চিন্তাই বড়।
কবি নজরুল ইসলাম কলেজের এক অভিভাবক শেয়ার বিজ বলেন, ট্রাফিক পুলিশ না থাকায় কেউ নিয়ম মানে না। স্কুলের সামনে যদি অন্তত সকালবেলা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ থাকত, তাহলে এত ভোগান্তি হতো না।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অবিলম্বে সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাবে। অবৈধ দখল উচ্ছেদ, রাস্তা খননের কাজ দ্রুত শেষ করা, খোলা ম্যানহোল ঢেকে দেওয়া, কাঁচাবাজারের জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ এবং রিকশা-ইজিবাইক চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপের পাশাপাশি স্কুল সময়ের জন্য ট্রাফিক পুলিশের স্থায়ী ডিউটি নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
লক্ষ্মীবাজার শুধু একটি বাণিজ্যিক এলাকা নয়, এটি রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা কেন্দ্র। এই এলাকার সড়ক ব্যবস্থাপনার ভাঙন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা ও শিক্ষার ওপর সরাসরি আঘাত হানছে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপই এখন এলাকাবাসীর একমাত্র প্রত্যাশা।
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post