ইমতিয়াজ আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ : মিল-মালিক, পাইকারি ব্যবসায়ী ও খুচরা বিক্রেতার সিন্ডিকেটে ৯৩ টাকা ৮০ পয়সার চিনি ভোক্তা পর্যায়ে এসে ১১০ টাকা থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রাচ্যের ডান্ডি নারায়ণগঞ্জসহ দেশের প্রধান তিনটি মোকামে দৈনিক ৫-৬ হাজার টনের বেশি চিনি বিক্রি হচ্ছে। রমজানে মোকামগুলোতে দৈনিক ১০ হাজার টন চিনি বিক্রি হয়। সে হিসাবে চিনি সিন্ডিকেট প্রতিদিন হাতিয়ে নিচ্ছে ৫-৬ কোটি টাকা।
নারায়ণগঞ্জের বৃহৎ মোকাম নিতাইগঞ্জের পাইকারি চিনি ব্যবসায়ীরা জানান, নারায়ণগঞ্জ মোকামে দৈনিক চিনি বিক্রি হয় ২০০ টন। রমজানে একটু বাড়ে। নারায়ণগঞ্জ মোকাম, মৌলভীবাজার ও খাতুনগঞ্জ মোকামে দৈনিক চিনি বিক্রি হয় কমপক্ষে ৪-৫ হাজার টন। চিনি উৎপাদনকারী মিল কর্তৃপক্ষ কমপক্ষে কেজিপ্রতি ৮-১০ টাকা লাভে চিনির মূল্য নির্ধারণ করে। তারা প্রতি কেজি চিনি উৎপাদনে ৮০ টাকা খরচ করলে বিক্রি করে ৯০ টাকা থেকে ৯৪ টাকা দরে।
মিল থেকে বিভিন্ন মোকামের পাইকাররা চিনি কিনে এনে কেজিপ্রতি ১০ থেকে ২০ পয়সা বাড়তি দামে বিক্রি করে। এরপর পাইকারদের কাছ থেকে নিয়ে খুচরা বিক্রেতারা কেজিপ্রতি ২ থেকে ৩ টাকা বাড়িয়ে ৯৩ টাকার চিনি বিক্রি করেন ৯৬ টাকায়। সেখান থেকে মহল্লা পর্যায়ে দোকানিরা বিক্রি করে ১১০ টাকা থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে। কেননা, মোকামের পাইকার ও সাধারণ বিক্রেতারা টনে টনে বা মণকে মণ চিনি বিক্রি করে প্রতিদিন। কিন্তু মহল্লার দোকানি ৫০ কেজির একবস্তা চিনি বিক্রি করতে এক সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। ৫০ কেজি চিনি খুচরা বিক্রিতে ১ কেজি চিনি ঘাটতি থাকে।
নিতাইগঞ্জের পাইকারি ব্যবসায়ী প্রভাত ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের প্রোপ্রাইটর নারায়ণচন্দ্র দাস, গোপীনাথ ভান্ডারের প্রোপ্রাইটর দিলীপ কুমার সাহা ও মনির স্টোরের প্রো. মনির হোসেন জানান, বাজারে চিনির কোনো ঘাটতি নেই। মিল-মালিকরা চিনি বিক্রি বন্ধ রেখেছে। এমনিতেও মিল-মালিকরা দুই তিন মাস অন্তর মাল বিক্রি করেন। আমরা মিলের বাইরে থেকে নিয়মিত চিনি কিনছি। স্বাভাবিকভাবেই মিল রেটের চেয়ে এক দুই টাকা বেশি দরে চিনি কিনতে হয়। আমরা সেখান থেকে চিনিটা এনে কেজিপ্রতি ১০ পয়সা লাভে বিক্রি করি।
তবুও ভোক্তা পর্যায়ে ৯৪ টাকার চিনি ১২০ টাকা কেজি দরে কিনতে হয় কেনো ? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনুসন্ধানে জানা যায়, মিলাররা টনকে টন চিনি বিক্রি করে। পাইকাররা মণ হিসেবে চিনি বিক্রি করেন। খুচরা বিক্রেরা কেজি বা তারও কম পরিমাণে মহল্লার দোকানে বসে চিনি বিক্রি করেন। ফলে ৫০ কেজির চিনির বস্তায় তার এক কেজি ঘাটতি যায়। ঘাটতির এই ১০০ টাকাটাও দোকানি চিনির দাম বাড়িয়ে উসুল করে নেন।
এতে মিলার, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতার চেইন বা সিন্ডিকেটের চক্করে পড়ে ৯৪ টাকা কেজি দরের চিনি ভোক্তার ঘরে পৌঁছায় ১২০ টাকা কেজি দরে। মিলার, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতা-এই তিন স্তরের হাতবদলে চিনির দাম বাড়ে কেজিপ্রতি ১৪-১৫ টাকা। এক কেজি চিনিতে এই সিন্ডিকেট প্রতিদিন হাতিয়ে নিচ্ছে ১৫ টাকা। ১ টনে হাতিয়ে নিচ্ছে ১০ হাজার টাকা। নারায়ণগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও খাতুনগঞ্জ-দেশের প্রধান তিনটি মোকামে প্রতিদিন চিনি বিক্রি হয় ৫-৬ হাজার টন। সেই হিসাবে চিনি সিন্ডিকেট প্রতিদিন গ্রাহকের কাছ থেকে অতিরিক্ত হাতিয়ে নিচ্ছে প্রায় ৬ কোটি টাকা।
নিতাইগঞ্জের কয়েকজন পাইকার জানান, এই মোকামে স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক প্রায় ২০০ টন চিনি বিক্রি হয়; রমজানে তা বাড়ে। তিন মোকাম মিলিয়ে স্বাভাবিক সময়ে ৪-৫ হাজার টন, আর রমজানে ১০ হাজার টনের কাছাকাছি বিক্রি হতে পারে। কেজিতে গড়ে ১৫ টাকা বাড়তি ধরা হলে ১ টনে অতিরিক্ত ১৫ হাজার টাকা। ৫ হাজার টনে তা দাঁড়ায় ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। যদিও ব্যবসায়ীরা বলেন, সবস্তরে সমান বাড়তি যোগ হয় না; গড়ে ১০-১২ টাকা ধরলে অতিরিক্ত লেনদেন ৫-৬ কোটি টাকার মতো। এই অঙ্কই ভোক্তাদের ক্ষোভের কেন্দ্রে। কারণ রোজার বাজারে চাহিদা বাড়ার আগেই দাম চড়তে শুরু করেছে।
খাত-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আসন্ন রমজান ঘিরে ব্যবসায়ীদের মধ্যে মজুদ-প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে দেশের বাজারে দাম বেড়েছে পণ্যটির। দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জে গতকাল খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়েক সপ্তাহ আগেও দেশে প্রতি মণ (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) চিনির দাম ছিল ৩ হাজার ২০০ টাকা, বর্তমানে তা মণপ্রতি ৩ হাজার ৪৪৪ টাকায় পৌঁছেছে।
সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, দেশের বাজারে বেশ কয়েক মাস ধরেই নিম্নমুখী ছিল চিনির দাম। এ কারণে বড় ব্যবসায়ী গ্রুপগুলো পণ্যটি মজুদ করছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে রমজানে চিনির বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কা আছে। চিনির দাম বাড়ছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ পাইকারি চিনি ডিলার সমিতির নেতা আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘শীতের কারণে চিনির চাহিদা কমে যাওয়ায় দামও কমে যায়। এছাড়া দেশের বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহও আছে। এ অবস্থায় রমজানকে কেন্দ্র করেই পণ্যটির দাম বাড়ছে। তাছাড়া সরকারি মিলগুলোর উৎপাদিত চিনি দিয়ে আভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখার ঘোষণা দেওয়া হলেও ডিলার পর্যায়ে সর্বশেষ এক টন হারে চিনি সরবরাহ করায় দাম না কমে উল্টো বাড়ছে।’
নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার কয়েকটি মহল্লার খুচরা বাজারের বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চিনির দাম ছিল ৯০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে, যা বাড়তে বাড়তে এখন ১০৫ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শুধু খোলা নয় প্যাকেটজাত চিনির দামই বাড়িয়েছেন সরবরাহকারীরা। অথচ বিশ্ববাজারে গত এক বছরের তুলনায় অপরিশোধিত চিনি বিক্রি হচ্ছে অন্তত ২৩ দশমিক ৯০ শতাংশ কমে। অর্থাৎ বিশ্ববাজারে কমলেও রোজা সামনে রেখে দেশে বেড়েছে পণ্যটির দাম। রোজায় ৩ লাখ টন চিনির চাহিদা রয়েছে। এই বাড়তি চাহিদাকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই ব্যবসায়ীরা এই দাম বাড়িয়ে দেন। এবারও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। এটি নিয়ে সমালোচনা এড়াতে ব্যবসায়ীরা আগেভাগেই দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন।
