আনোয়ার হোসাইন সোহেল : শরিয়াহ উইং চালু করবে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। প্রবাসীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সুদমুক্ত পৃথক এই উইং চালুর উদ্যোগ নিয়েছে মন্ত্রণালয়। বিদ্যমান ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় আট শতাংশ সুদে প্রবাসীরা এতদিন এক থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাচ্ছিলেন। তবে এই ইউন্ডো চালু হলে প্রবাসীদের দাবি কিছুটা হলেও পূরণ হবে বলে আশা প্রবাসী ও ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের।
গতকাল মঙ্গলবার সরকারের আইন বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা, যুব ক্রীড়া ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল তার ভেরিফাইড ফেসবুক পোস্টে জানান, প্রবাসী ভাইদের জন্য সুসংবাদ। প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক থেকে অচিরেই চালু হচ্ছে শরিয়াহভিত্তিক ঋণ প্রদানের কার্যক্রম। আজকে (মঙ্গলবার) ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, এ মাসের মধ্যে এই কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হবে। এই পদক্ষেপ নিতে আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছেন শায়খ আহমাদুল্লাহ ভাই। তাকে অনেক ধন্যবাদ।
উপদেষ্টার পোস্টের হুবহু কপি নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পোস্ট করেছেন জনপ্রিয় ইসলামী বক্তা ও আস সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের পরিচালক শায়খ আহমদ উল্লাহ।
পোস্টে শায়খ আহমদ উল্লাহ লিখেছেন, ‘প্রবাসীদের জন্য প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার দাবি তুলেছিলাম। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বিষয়টি বাস্তবায়নের চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছিলেন। আমরা আনন্দিত যে, তিনি যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন এবং এক মাসের মধ্যেই প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে শরিয়াহ উইং চালুর ঘোষণা দিয়েছেন। তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ। এতে প্রবাসীদের জন্য সুদমুক্ত ঋণের পথ কিছুটা হলেও সুগম হবে ইনশাআল্লাহ। অবশ্য আমরা প্রথমে শরিয়াহ উইং চালুর দাবি করলেও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন আয়োজিত প্রবাসীদের অনুষ্ঠান থেকে সর্বশেষ দাবি ছিল প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে প্রবাসীদের জন্য সম্পূর্ণ সুদ বা মুনাফামুক্ত ঋণ কার্যক্রম চালু করার। আশা করি, পরবর্তী ধাপে সে উদ্যোগ নেওয়া হবে। আপাতত শরিয়াহ উইং খোলার ঘোষণাটি দ্রুত বাস্তবায়নের অনুরোধ জানাচ্ছি সংশ্লিষ্টদের প্রতি। এমন উদ্যোগ গ্রহণ করায় উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ জানান শায়খ আহমদ উল্লাহ।’
এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) চানু গোপাল ঘোষ শেয়ার বিজকে বলেন, প্রতিবছর আমাদের দেশ থেকে প্রায় ১১ লাখ শ্রমিক বিদেশে যান। কিন্তু আমরা মাত্র ৫০ থেকে ৬০ হাজার আবেদনকারীকে ঋণ সহযোগিতা দিতে পারি। এর অন্যতম কারণ হলো অনেকেই আমাদের কাছে ঋণ নিতে আসেন, কিন্তু আট শতাংশ সুদের কথা শুনলেই তারা আর রাজি হন না। বিষয়টি আমরা অনুসন্ধান করেও জেনেছি, ঋণ নিতে আগ্রহীদের একটা বড় অংশ যান সৌদি আরব বা মধ্যপ্রাচ্যে। তাদের বক্তব্য হলো পবিত্র ভূমিতে যাব সুদে টাকা নিয়েÑএটা হবে না। দীর্ঘদিন ধরেই বিদেশ যেতে ইচ্ছুক এমন অনেক মানুষ আমাদের কাছে এসে সে কারণেই নিরাশ হয়ে ফিরে যান। তবে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার নির্দেশনা পেয়ে আমরা প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক শরিয়াহ উইং চালুর জন্য সব প্রস্তুতি ও সার্ভার রেডি করে রেখেছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন পেলে চলতি মাসেই এই উইং চালু হবে।
এই উইং চালু করতে কী পরিমাণ ফান্ড প্রয়োজন এবং এর যোগানদাতা কে হবেÑজানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের এমডি আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে আমরাই ফান্ডের জোগান দেব। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন পেলে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি), ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকসহ (আইডিবি) আন্তর্জাতিক দাতাগুলোর সঙ্গেও ফান্ড আনার বিষয়ে কথা বলব, যাতে প্রবাসীরা সুদমুক্তভাবে ঋণ পেতে পারেন। তবে প্রাথমিকভাবে শরিয়াহভিত্তিক প্রচলিত ইসলামি ব্যাংকগুলোর মুনাফার হার অনুসারেই নির্ধারণ করা হবে। আপাতত ফান্ডের আকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া বলা যাচ্ছে না বলেও জানান তিনি।
শরিয়াহ উইং চালু করা হলেও এত দিন প্রচলিত ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে যেসব চার্জ নেওয়া হতো, সেগুলো বলবৎ থাকবে বলেও জানান প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের এমডি।
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে এক লাখ টাকা ঋণের বিপরীতে ডকুমেন্টেশন ফি ৫০০ টাকা, প্রসেসিং ফি ৫০০ টাকা, ভ্যাট ১৫০ টাকা, ঋণ ঝুঁকি আচ্ছাদন চাঁদা ৯০০ টাকা, স্ট্যাম্প চার্জ ৪৬০ টাকা এবং ব্যাংক হিসাব খুলতে ৫০০ টাকা মিলিয়ে সর্বসাকুল্যে ৩০১০ টাকা খরচ করতে হয়। ২ লাখ টাকায় ৫০ হাজার ৬০ টাকা এবং ৩ লাখ টাকায় ৭ হাজার ১১০ টাকা। ঋণের মেয়াদকালে গ্রাহকের মৃত্যু হলে ঋণ স্থিতির ১০০ শতাংশ এবং ঋণ গ্রহণের ছয় মাসের মধ্যে দেশে ফেরত এলে ৫০ শতাংশ দায় স্কিমের তহবিল থেকে সমন্বয় করা হবে।
এদিকে ‘সিলেটি ফুয়া’ নামে একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘আপনার কথা আমি মানলামÑআপনি কি একটা কথা জানেন, প্রবাসীদের প্রবাসী ব্যাংক থেকে টাকা কী করে তুলতে হয়। একজন প্রবাসী ব্যাংকে টাকা তুলতে গেলে, ব্যাংক থেকে লোন তুলতে গেলে প্রথমে লাগবে সরকারি চাকরিজীবীর সিগনেচার, তারপরে লাগবে একজন দোকানদারের ট্রেড লাইসেন্স। দুটা জিনিস একজন প্রবাসী কোথায় পাবেÑআমাকে একটু জানাবেন; জানি আমার কমেন্ট দেখার মতো সময় আপনার নেই।’
ইমরান আহমেদ বাবুল নামে একজন জানিয়েছেন, ‘ভাই তিন লাখ টাকা আনতে গেলে তিন কোটি টাকার ঝামেলা করা লাগে। আর সুদমুক্ত ঋণ দেবে, এটা কল্পনায় মানায়, বাস্তবে ঘোড়ার ডিম পাব আমরা দিন শেষে।’
