Print Date & Time : 13 May 2026 Wednesday 9:12 pm

প্রাথমিকভাবে ফ্যামিলি কার্ড  পাচ্ছে ৫০ লাখ পরিবার

নিজস্ব প্রতিবেদক : চলতি রমজান মাসেই পাইলট প্রকল্প হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করতে যাচ্ছে সরকার। প্রাথমিকভাবে ৫০ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে হতদরিদ্র এবং নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ইশতেহারের ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতির একটি ছিল এই ফ্যামিলি কার্ড। এই কার্ড নিয়ে প্রতিপক্ষ জামায়াত-এনসিপির ব্যাপক সমালোচনা শুনতে হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারের আর্থিক সুরক্ষায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বাস্তবায়নে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করেছে সরকার। এতে বলা হয়, দুই মন্ত্রী ও দুই প্রতিমন্ত্রীসহ ১৫ সদস্যের ‘ফ্যামিলি কার্ড প্রদান সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। দেশের ৮ বিভাগের ৮ উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ডের পাইলটিংয়ের লক্ষ্য করা হয়েছে। তবে কোন উপজেলায় পাইলটিং হবে তা এখনও নির্ধারণ হয়নি। প্রথম দিকে প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবার ফ্যামিলি কার্ড পাবে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে আরও সমন্বিত ও লক্ষ্যভিত্তিক করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের দ্বিতীয় কার্যদিবসে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। সচিবালয়ে কৃষমিন্ত্রী আমিন উর রশিদ বলেন, এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে ফ্যামিলি কার্ড হিসেবে নগদ টাকা দেওয়া হবে। ফ্যামিলি কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে হতদরিদ্র এবং নারীদের।

কবে থেকে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ শুরু হবে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু জানিয়েছেন, ঈদের আগেই সীমিত পরিসরে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে ফ্যামিলি কার্ড চালুর বিষয়টি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ ছিল। সরকার সে অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছে। কার্ডটি কীভাবে বিতরণ করা হবে, কারা অগ্রাধিকার পাবে এবং কোন পদ্ধতিতে সুবিধা দেওয়া হবে-এসব বিষয় নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। ‘ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে-এ সিদ্ধান্ত আজ চূড়ান্ত হয়েছে’-জানান আবদুল আউয়াল মিন্টু।

কত পরিবার এ কার্ড পাবে-এ প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, এটি মূলত সার্বজনীন ধারণা থেকে নেওয়া উদ্যোগ। প্রাথমিকভাবে কোনো কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে না। তবে বাস্তবায়নের সুবিধার্থে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি হতদরিদ্র পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে পর্যায়ক্রমে দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে এই সুবিধার আওতায় আনার সুপারিশ করবে।

সরকারি সূত্র জানায়, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ভর্তুকিমূল্যে সরবরাহ, খাদ্য সহায়তা এবং নির্দিষ্ট সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা সমন্বিতভাবে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং নিম্নআয়ের মানুষের ভোগান্তি কমাতেই এ উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে চাল, ডাল, তেল, চিনি ও ছোলার মতো পণ্য নির্ধারিত মূল্যে সরবরাহের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।

এছাড়া বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ভিজিএফ ও টিসিবির কার্যক্রমের সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড সমন্বয় করা যায় কি নাÑ সে বিষয়েও আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিজিটাল ডেটাবেজের মাধ্যমে পরিবারভিত্তিক তথ্য সংরক্ষণ করে একটি একক প্ল্যাটফর্মে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে একই পরিবার একাধিক উৎস থেকে দ্বৈত সুবিধা না পায় এবং প্রকৃত উপকারভোগীরা সঠিকভাবে চিহ্নিত হয়।

এ রমজানেই কার্যক্রম শুরু হবে কি না-এ প্রশ্নে আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী চান ঈদের আগেই অন্তত পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে এটি শুরু করতে। আমরা সে লক্ষ্যেই কাজ করছি।’ তিনি আরও জানান, বাস্তবায়ন কাঠামো বা মেকানিজম চূড়ান্ত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

প্রাথমিকভাবে কয়েকটি জেলা বা মহানগর এলাকায় সীমিত আকারে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করে এর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হবে। পাইলট প্রকল্পের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরবর্তীতে সারাদেশে ধাপে ধাপে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এদিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) নতুন সরকারের জন্য ১০টি বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যে একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে ফ্যামিলি কার্ডের কথা উল্লেখ করেছে। গ্রামীণ পাঁচ মিলিয়ন পরিবারকে মাসে দুই হাজার থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা সহায়তা দিয়ে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পাঁচ মিলিয়ন পরিবারকে এ সহায়তার আওতায় আনতে বছরে আনুমানিক ৯ হাজার ৬০০ কোটি থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে; যা জিডিপির

প্রায় ০.১৫ থেকে ০.২০ শতাংশের সমান। এই কর্মসূচি সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ উদ্যোগ ভবিষ্যতে সর্বজনীন মৌলিক আয় বাস্তবায়নের একটি সম্ভাব্য পথ তৈরি করতে পারে। তবে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হবে আর্থিক সীমাবদ্ধতা। এর পাশাপাশি উপকারভোগী নির্বাচনের প্রক্রিয়া হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রচলিত প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক পদ্ধতির পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক ‘প্রক্সি মিনস টেস্ট’ পদ্ধতি অনুসরণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু আন্তর্জাতিক সূচক রয়েছে, সেটা অনুসরণ করে এবং রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে যদি দেওয়া হয় তাহলে প্রকৃত বঞ্চিতরা সুবিধাভোগী হবে এবং নির্বাচনী ইশতিহার বাস্তবায়ন হবে।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ার পর ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। কারণ হিসাবে তিনি বলছেন, নির্বাচনের আগে দিলে একদিকে কার্ড নির্বাচনের ক্ষেত্রে দুর্নীতির আশঙ্কা বেশি থাকবে, অন্যদিকে কার্ড নির্ধারণের জন্য প্রকৃত ডেটার ঘাটতি থাকতে পারে। সে জন্য একটু সময় দিয়ে দিলে প্রকৃতভাবে যারা পাওয়ার যোগ্য তারা পাবেন।

অন্যদিকে ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের জিডিপি এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৫ অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল ৪৬২ বিলিয়ন ডলার। এই অবস্থান থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে হলে ডলার ভিত্তিতে গড়ে প্রায় ৯ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এ লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী হলেও এটি নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান উদ্যোগের তুলনায় বেশি আগ্রাসী।

অন্যদিকে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোও এই লক্ষ্য অর্জনের অন্যতম শর্ত। ২০২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২৬ সালের জন্য ৮ দশমিক ৩ শতাংশ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও তা অর্জন করা কঠিন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অগ্রগতি ধরলেও প্রতিবছর প্রায় ০ দশমিক ৯ শতাংশ পয়েন্ট করে উন্নতি প্রয়োজন, যাতে ২০৩১ সালে কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ১১ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তবে সংস্কারভিত্তিক পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে স্বল্পমেয়াদে জিডিপির অতিরিক্ত ২ শতাংশ সমপরিমাণ রাজস্ব অর্জন সম্ভব, যা ২০৩১ সালে কর-জিডিপি অনুপাতকে ১৩ দশমিক ৩ শতাংশে উন্নীত করতে সহায়ক হতে পারে। সামগ্রিকভাবে আগামী পাঁচ বছরে গড়ে প্রায় ১ দশমিক ২৫ শতাংশ পয়েন্ট হারে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর প্রয়োজন হবে।

সিপিডি বলছে, বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হলে এবং একই সঙ্গে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে চাইলে, এমন উচ্চ রাজস্ব প্রবৃদ্ধিও যথেষ্ট নাও হতে পারে। ফলে লক্ষ্য অর্জন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কার্যকর সংস্কার ও শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ওপরই নির্ভর করতে হবে।