Print Date & Time : 13 January 2026 Tuesday 11:30 am

প্লাস্টিক বর্জ্যে গভীর সংকটে মাছের প্রজনন

 আরশী আক্তার সানী : বাংলাদেশসহ পুরো পৃথিবীতে নদী-সমুদ্র এখন এক গভীর সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, আর এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে প্লাস্টিক দূষণ। শিল্পবিপ্লবের পর থেকে মানুষ যত বেশি আধুনিক হয়েছে, ততই প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়েছে। আজ এমন কোনো দিন নেই যখন আমরা প্লাস্টিক ছাড়া কোনো কাজ করি। বাজার করতে গেলেই হাতে আসে প্লাস্টিক ব্যাগ, খাবার কিনলে পাওয়া যায় প্লাস্টিক মোড়ক, পানির তৃষ্ণা মেটাতে বোতল, এমনকি ঘরে রাখা অনেক জিনিসেও অগণিত প্লাস্টিক ব্যবহূত হয়।

মানুষের সুবিধার জন্য তৈরি এই বস্তুটি ধীরে ধীরে প্রকৃতির জন্য দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে নদীর জলজ প্রাণীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এই দীর্ঘস্থায়ী বর্জ্যের কারণে। যেসব নদী একসময় মাছের স্বর্গরাজ্য ছিল, আজ সেগুলোর তলদেশে জমছে স্তরে স্তরে প্লাস্টিক। নদীর স্বচ্ছ জল এখন কালচে, দুর্গন্ধযুক্ত এবং প্রাণশূন্য হয়ে পড়ছে। প্লাস্টিক বর্জ্য সরাসরি মাছের শরীরে ঢুকে মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি জটিল হলেও খুবই বাস্তব। মাছ সাধারণত জলের ভেতর ভাসমান ছোট ছোট বস্তু শনাক্ত করে খাবার সংগ্রহ করে। কিন্তু যখন খাবারের মতো দেখতে বিভিন্ন প্লাস্টিক কণা পানিতে ভাসে, তখন মাছ সেগুলোকে খাবার ভেবে গিলে ফেলে। একটি ছোট প্লাস্টিক কণাও মাছের পেটে গিয়ে জমে থাকলে তা ধীরে ধীরে আকার বাড়ায় এবং মাছের হজম প্রক্রিয়ায় অস্বাভাবিকতা সৃষ্টি করে। মাছ খাবার খেতে পারে না, দুর্বল হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত অপুষ্টিতে মারা যায়। এটি শুধু একটি মাছের সমস্যা নয় এর ফলে পুরো খাদ্যচক্রের ভারসাম্য নষ্ট হয়। বড় মাছ ছোট মাছ খায়, এবং সেই বড় মাছ আবার মানুষের খাদ্য হিসেবে টেবিলে আসে। ফলে প্লাস্টিকের বিষাক্ত প্রভাব ক্রমে মানুষের শরীরেও পৌঁছে যায়।

আরও ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, প্লাস্টিক যখন দীর্ঘদিন পানিতে থাকে, তখন তা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়। এই ক্ষুদ্র কণাগুলো এত ছোট যে মাছ তা চিনতেই পারে না। মাইক্রোপ্লাস্টিক মাছের রক্তে ও শরীরে প্রবেশ করে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়, প্রজননক্ষমতা নষ্ট করে দেয়, এমনকি পরবর্তী প্রজন্মের ওপরও জেনেটিক প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক-মিশ্রিত পানিতে থাকা মাছের ডিম ফোটার হার অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়। এর অর্থ হলো নদীর ভবিষ্যৎ মাছের সংখ্যা ভয়াবহভাবে হ্রাস পাচ্ছে এবং এর ক্ষতি পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। মানুষের অসচেতনতার পাশাপাশি অবকাঠামোগত দুর্বলতাও এই সমস্যার অন্যতম কারণ। শহরে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন নেই, অনেক বাজারে বর্জ্য আলাদা করে রাখার ব্যবস্থা নেই। মানুষ তাই স্বাভাবিকভাবেই রাস্তা বা ড্রেনে ফেলে দেয়, যা পরে নদীতে গিয়ে পড়ে। কিছু এলাকায় স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি এতটাই দুর্বল যে খালের পাশেই দেখা যায় প্লাস্টিকের পাহাড়। কারখানাগুলোও অনেক সময় পরিবেশ আইন মানে না। তারা বর্জ্য পানি এবং প্লাস্টিক বর্জ্য সরাসরি নদীতে ছেড়ে দেয়। এর ফলে নদীর পানি শুধু দূষিত হয় না; মাছের জন্য তা বিষাক্ত হয়ে ওঠে। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে নদী তার স্বাভাবিক জীবনশক্তি হারায়, এবং বহু মাছ বিলুপ্তির পথে হাঁটে। সমাধানের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন প্লাস্টিক উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করা। প্লাস্টিক ব্যবহার কমানোর জন্য সরকার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ জনগণ সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। বাজারে যদি পরিবেশবান্ধব ব্যাগ সহজলভ্য করা হয়, তাহলে মানুষ স্বভাবতই সেটির দিকে ঝুঁকবে। প্লাস্টিক ব্যাগের ব্যবহার ধীরে ধীরে বন্ধ করতে হলে কেবল নিষেধাজ্ঞা নয়, পাশাপাশি উন্নত বিকল্পও দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, কাগজের ব্যাগ, কাপড়ের ব্যাগ বা চার-পাঁচবার ব্যবহারযোগ্য মোড়ক জনপ্রিয় করতে প্রচারণা চালানো যেতে পারে। দোকানগুলোকে পরিবেশবান্ধব ব্যাগে পণ্য দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করলেও পরিস্থিতি অনেক বদলে যাবে।

বিদ্যমান বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক করতে হবে। একটি কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শুধু শহর নয় গ্রামেও প্রয়োজন। প্রতিটি ওয়ার্ডে প্লাস্টিক আলাদা করে সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য আলাদা করা, নদী-খালে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে কড়া শাস্তি, এবং নিয়মিত পরিষ্কার অভিযান এসব ব্যবস্থা গ্রহণ করলে নদী অনেকাংশে বাঁচতে পারে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার, পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপন, বর্জ্য সংগ্রহকারী শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা দেওয়া এসবই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনসচেতনতা। মানুষ যদি না বোঝে প্লাস্টিক কত বড় ক্ষতি করছে, তাহলে কোনো প্রচেষ্টা সফল হবে না। ঘরের মানুষ, শিশু, শিক্ষার্থী সবাইকে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে প্লাস্টিক দূষণের বিষয়টি আরও সরাসরি যুক্ত করা যেতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে নদী রক্ষায় কমিউনিটি গ্রুপ গঠন করা হলে মানুষ নিজেই নদী পরিষ্কার করার উদ্যোগ নেবে। অনেক দেশে দেখা যায়, নদীতে স্বেচ্ছাসেবী দল নিয়মিত পরিষ্কার অভিযান চালায়। বাংলাদেশেও এমন কার্যক্রম বাড়ানো যেতে পারে। প্লাস্টিক দূষণে নদী ও মাছের যে ক্ষতি হচ্ছে, তা শুধু আজকের সমস্যা নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেঁচে থাকার প্রশ্ন। মাছ শুধু খাদ্য নয় এটি পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নদী যদি দূষিত হয়ে পড়ে, মাছ যদি বিলুপ্ত হয়, তবে আমাদের খাদ্য ব্যবস্থা, অর্থনীতি, পরিবেশ সবই বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

তাই সময় এসেছে এই সমস্যাকে কেবল পরিবেশগত সংকট হিসেবে নয়, বরং জাতীয় সংকট হিসেবে বিবেচনা করার। আমাদের প্রতিটি মানুষের উচিত দায়িত্ব নিয়ে নিজের ভূমিকা পালন করা। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, সঠিক জায়গায় বর্জ্য ফেলা, সচেতনতা বৃদ্ধি এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলোই এক সময় বড় পরিবর্তনের জন্ম দেবে। যে নদী একসময় জীবনের উৎস ছিল, তাকে আবার প্রাণ ফিরে পেতে সাহায্য করতে হবে আমাদের নিজেদের টিকে থাকার স্বার্থেই।

 

গণযোগাযোগ সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা