নূর হোসেন মামুন, চট্টগ্রাম : দূরবিন বা পাখির চোখে মাঝ আকাশ থেকে বন্দর নগরীর যে সৌন্দর্য ফুটে ওঠে, তা বিশাল বিশাল অট্টালিকা ঘিরেই। নগরের বড় বড় ভবন দেখলে উন্নয়নের চিত্রও বুঝা যায়। চট্টগ্রামের রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) আওতাধীন যেসব আবাসন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান কাজ করে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ফিনলে প্রপার্টি কর্তৃপক্ষ। বেশি কাজ করলেও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগেরও শেষ নেই।
গত পাঁচ বছরেই প্রতিষ্ঠানটির নির্মাণাধীন ভবনে নিরাপত্তাজনিত কারণে অন্তত ২০ থেকে ২২ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম মহানগর নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন। ঠিকাদার ইব্রাহিম ও জিএম অশোক চৌধুরীকে অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি তাদের। না হলে কঠোর অন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে সংগঠনটি।
প্রতিষ্ঠানটির নির্মাণাধীন ভবনগুলোতে কর্মরত বেশিরভাগ শ্রমিককেই দেওয়া হয় না নিরাপত্তা সামগ্রী। ফলে ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হয়। এত মৃত্যুর পরও উদাসীন ফিনলে প্রপার্টি কর্তৃপক্ষ, সবকিছুই ম্যানেজ করতে চান টাকা উড়িয়ে। গতবছরের ২৭ সেপ্টেম্বর বেলা সোয়া ১২টায় নগরের চকবাজারের প্যারেড ময়দানের পাশে তাদের নির্মাণাধীন বিল্ডিংয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান জুলাই যোদ্ধা জাহাঙ্গীর আলম (২৬)। তার মৃত্যুর চার মাস না পেরুতেই এবার নির্মাণাধীন ভবন থেকে রড পড়ে গুরুতর আহত হয়েছেন হাসান মির্জা (৫০) নামে এক পথচারী। এখন তিনি মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। তবে এসব ঘটনায় বিন্দুমাত্র অনুশোচনাও নেই ফিনলে প্রপার্টির। যেই আহত হোক, প্রতিষ্ঠানের একটি টিম বিষয়টি ম্যানেজ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তাদের দাবি আবাসন খাতে মানুষের মৃত্যু বা আহত হওয়ার বিষয়টি অস্বাভাবিক নয়।
এদিকে, এসব ঘটনায় উদ্বেগ বাড়লেও পেটের তাগিদে ঝুঁকি নিয়েই কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে শ্রমিকদের একাংশ। তারা জানান, এসব ঘটনার বিচার না হওয়ায় হত্যাকাণ্ড দিনদিন বাড়ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৪ জানুয়ারি বেলা ১২টায় নগরের মুরাদপুর এলাকায় ফিনলে প্রোপার্টিজ লিমিটেডের অধীনে নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলাকালে ওপর থেকে লোহার রড মাথায় পড়ে গুরুতর আহত হন হাসান মির্জা। পরে তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন স্থানীয়রা।
ওই ভবনের নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক শেয়ার বিজকে বলেন, নির্মাণ কাজ চলাকালে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জামাদি ব্যবহার না করায় এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। এমন ঘটনা এবারই প্রথম নয়, সামান্য কিছু টাকা খরচ করে তারা নিরাপত্তা বেস্টনিও তৈরি করে না। পাশাপাশি শ্রমিকদের দেওয়া হয় না কোনো নিরাপত্তা সামগ্রী। ফলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শ্রমিককে কাজ চালিয়ে যেতে হয়।
হাসপাতালে ভর্তি হাসান মির্জার স্বজনরা জানান, গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজে রোববার তিনি মুরাদপুর দিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু হঠাৎই তার মাথায় ওপর থেকে রড এসে পড়ে। ঘটনাস্থলেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। খবর পেয়ে আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট কেউ এগিয়ে না এলেও স্থানীয় ও পথচারীরা তাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করান। বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক। আমরা এর বিচার দাবি করছি।
এদিকে এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নগরের কোতোয়ালি থানায় একটি অভিযোগ করেন চট্টগ্রাম মহানগর নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নুর উদ্দিন সুমন। তিনি তার অভিযোগে বলেন, ফিনলে প্রোপার্টিজ লি. এর জিএম এবং ঠিকাদার ইব্রাহিম চট্টগ্রামসহ বিভিন্নস্থানে বেশ কয়েকটি নির্মাণ প্রজেক্ট নিয়ে কাজ শুরু করে। ওই প্রকল্পের কাজ করাকালে বেশ কয়েকজন শ্রমিক নিহত ও আহত হয়। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়াতে প্রচার হলে ফিনলে কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসে। তার অভিযোগ, এসব বিষয়ে বেশ কয়েকবার সতর্ক করার পরেও তারা প্রকল্পের নির্মাণ কাজ চলাকালে শ্রমিকদের কোনো প্রকার নিরাপত্তা সরঞ্জামাদির ব্যবস্থা না করে অবহেলা করছে। তাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও অবহেলার কারণে নির্মাণ শ্রমিকদের জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
চট্টগ্রাম মহানগর নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নুর উদ্দিন সুমন বলেন, নির্মাণ শ্রমিকদের নিরাপত্তা নেই। আমরা ফিনলে প্রপার্টিজের মালিকদের বারবার অবগত করি। এতবার করে বলার পরও তারা কোনো শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেনি। সেফটি নিরাপত্তা না দিয়ে তারা গত এক বছরে ২০-২২ জন শ্রমিক অকালে মেরে ফেলে। গত পাঁচ বছরে এই সেফটি ইস্যুতেই আমার হাত দিয়ে অন্তত ৫০টি লাশ চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাল থেকে বের করেছি।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ঠিকাদার ইব্রাহিম ও অশোক চৌধুরীকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে। না হলে চট্টগ্রাম শহরে কঠোর অন্দোলন গড়ে তুলব।
এদিকে, এই বিষয়ে জানতে ফিনলে প্রপার্টি কর্তৃপক্ষের জেনারেল ম্যানেজার অশোককে বেশ কয়েকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি। ঠিকাদার ইব্রাহিমও ফোন ধরেননি। তাই তার বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
এর আগে গত ২৭ সেপ্টেম্বর বেলা সোয়া ১২টায় নগরের চকবাজার থানাধীন প্যারেড ময়দানের পাশে ফিনলে প্রপার্টি কর্তৃপক্ষের নির্মাণাধীন ইদ্রিস বিল্ডিংয়ে বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট হয়ে মারা যান জুলাই যোদ্ধা মো. জাহাঙ্গীর আলম (২৬)। তিনি কুমিল্লার চান্দিনা এলাকার বাসিন্দা। তবে তিনি চট্টগ্রামের পাহাড়তলী থানার ঝাউতলার ডিজেল কলোনিতে থাকতেন।
নিহত জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তার স্বামী জাহাঙ্গীর আলম নিজের জীবন বাজি রেখে লড়েছিল। তবে কখনও কোনো ক্রেডিট নিতে চাননি। কিন্তু ফিনলে প্রপার্টি কর্তৃপক্ষের অসাবধানতার বলি হতে হয়েছে তাকে। পরিবারে তিনিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। তার মৃত্যুতে পরিবারটি এখন নিঃস্ব হয়ে গেছে।
সেদিন দুপুরে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটে আহত হওয়ার পর জাহাঙ্গিরকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এনেছিল মিজানুর রহমান নামে তার এক সহকর্মী। তিনি বলেন, আমরা নির্মাণাধীন ওই ভবনের নিচ তলায় ইলেক্ট্রিকের কাজ করছিলাম। খুবই সাবধানভাবে আমরা কাজ করছিলাম। কিন্তু আচমকা জাহাঙ্গির ভাই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে যান। বিষয়টি বুঝার সঙ্গে সঙ্গেই আমি তাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। পরে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এছাড়া ২০১৯ সালের ১২ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের ঝাউতলা খুলশী কলোনি এলাকায় আবাসন প্রতিষ্ঠান ফিনলে প্রপার্টির একটি নির্মাণাধীন ভবনে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মো. মনির (২৫) নামে এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়। মনির ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার শশীভূষণ থানার আলমগীর মাঝির ছেলে।
বাংলাদেশ নির্মাণ শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সহসভাপতি কবির হোসেন জানান, ফিনলে প্রপার্টির কোনো ভবনেই শ্রমিকদের নিরাপত্তায় পর্যাপ্ত পরিমাণে সরঞ্জাম দেওয়া হয় না। ঝুঁকি নিয়েই শ্রমিকদের কাজ করতে হয়। তিনি বলেন, জাহাঙ্গিরের মৃত্যু স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে, তাদের নিরাপত্তায় কর্তৃপক্ষের গাফিলতি রয়েছে।
ফিনলে প্রপার্টির জেনারেল ম্যানেজার (সেলস) আবদুল্লাহ আল ফারুক (জিয়াদ) শেয়ার বিজকে বলেন, সেফটি নিশ্চিত করে আমরা অবশ্যই কাজ করি। মুরাদপুরের সিরাজ সেন্টারে এই রডটা কিভাবে পড়লো তা বুঝতে পারছি না। ওপরে তখন কেউ কাজও করছিল না। আহত হয়েছে তা ঠিক আছে, কিন্তু আমরা সবকিছু দ্রুত দেখভাল করেছি। আমরা সবসময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করি, কিন্তু মাঝে মাঝে দুই একটা দুর্ঘটনা ঘটে। এটা নিয়ে আমরা খুবই অনুতপ্ত। আমাদের কর্তৃপক্ষও এ বিষয়ে সজাগ রয়েছে।
